কিশোর কিশোরীদের জন্য ‘রিফ্লেক্টিভ টিনস’

মশিউর রহমান খুবি

শিক্ষা

মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। তবে যারা স্বপ্নকে অন্বেষণ করে এবং স্বপ্ন পূরণের জন্য দৃঢ় মানসিকতা নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে,

2023-08-22T05:24:23+00:00
2023-08-22T05:24:23+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬,
২ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
শিক্ষা
কিশোর কিশোরীদের জন্য ‘রিফ্লেক্টিভ টিনস’
মশিউর রহমান খুবি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০২৩, ৫:২৪ এএম   (ভিজিট : ২৭০)
মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। তবে যারা স্বপ্নকে অন্বেষণ করে এবং স্বপ্ন পূরণের জন্য দৃঢ় মানসিকতা নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে, তাদের জীবনেই স্বপ্ন পূরণ হয়। তবে কায়মনোবাক্যে উদ্ভূত এই স্বপ্ন পূরণে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রথম বাধা আসে মা-বাবার কাছ থেকে। এখনও অনেক মা-বাবা পড়াশোনা ও পেশা নিয়ে নিজেদের ইচ্ছাকে সন্তানদের ওপর চাপিয়ে দেন। মা-বাবার প্রত্যাশার চাপ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সন্তানদের সৃজনশীল সম্ভাবনার বিকাশে বাধা দেয়।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কিশোর-কিশোরীদের স্বপ্নের সঙ্গে তাদের একাডেমিক শিক্ষার বড় ব্যবধান রয়েছে। কিশোর-কিশোরীদের কেউ আঁকিবুঁকি করতে, কেউ লেখালেখি করতে, কেউ ছবি তুলতে বা কেউ নন-একাডেমিক বই পড়তে ভালোবাসে। কিন্তু তারা পুরোনো শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শেখার কাঠামোতে আটকা পড়ে আছে, যা তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে খুব কম বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে না। কিশোর-কিশোরীদের চিন্তাশক্তি ও তাদের সুপ্ত সৃজনশীলতাকে বিকশিত করতেই ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করে ‘রিফ্লেক্টিভ টিনস’। রিফ্লেক্টিভ টিনস আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অলাভজনক কিশোর-কিশোরীভিত্তিক সৃজনশীল প্ল্যাটফর্ম।

‘রিফ্লেক্টিভ টিনস’ এর যাত্রা শুরু হয় ২০১৩ সালে নবম শ্রেণি পড়ুয়া কিশোর ইউসুফ মুন্নার হাত ধরে। মহেশখালীর মাতারবাড়িতে জন্মগ্রহণ করা ইউসুফ মুন্না বাবার কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ছোটবেলা থেকেই নিজের ডায়েরিতে কবিতা ও প্রবন্ধ লিখতেন। সপ্তম শ্রেণিতে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে অধ্যয়নকালে প্রথমবারের মতো ইউসুফের স্থানীয় একটি পত্রিকার বিজ্ঞান পাতায় ‘জোনাকি পোকার দেহে আলো জ্বলে কেন? বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা’ অনুচ্ছেদ প্রকাশিত হলে স্কুলে রীতিমতো সুপারস্টার হয়ে যান তিনি। স্কুলের অন্য শিক্ষার্থীরাও তার মতো তাদের লেখা, অঙ্কন ও ছবি ছাপাতে ইউসুফকে অনুরোধ করেন। শিক্ষার্থীদের এই কৌতূহলী ও সৃজনশীল মনোভাব ইউসুফের আজকের অবস্থানের মূল অনুপ্রেরণা। ইউসুফ উপলব্ধি করেন প্রতিটি কিশোর-কিশোরীই তার স্বাতন্ত্র্যে অনন্য এবং তাদের প্রত্যেকের আলাদা সৃজনশীলতা রয়েছে। তিনি বুঝতে পারেন তারা তাদের সৃজনশীল কাজের এই গভীর প্রণয়কে পেশায় পরিণত করতে চায়, কিন্তু তাদের কাছে পথটা অজানা। তাদের এই সৃজনশীল মনোভাব আর সেটা বৃহৎ পরিসরে বহিঃপ্রকাশ করার অজানা পথের মধ্যবর্তী শূন্যস্থানকে পূর্ণ করতেই ইউসুফ প্রথম তৈরি করলেন একটি ওয়েব ম্যাগাজিন, যার নাম দেন ‘রিফ্লেক্টিভ টিনস’ বা সংক্ষেপে ‘আরটি’।

শুরুতে শুধু ওয়েব ম্যাগাজিন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে এটি একটি বড় সৃজনশীল প্ল্যাটফর্মে রূপ নেয়। কিশোর-কিশোরীদের সৃজনশীলতা বিকাশে একটি উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে আরটি-এর রূপকার ইউসুফ মুন্না প্রত্যেকটা কিশোর-কিশোরীর কাছে ব্যক্তিগতভাবে পৌঁছানোর উদ্যোগ নেন। ‘আরটি-টকস’ নামে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রোগ্রামে তারা ভিন্ন ভিন্ন শাখায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের নিয়ে সশরীরে লার্নিং সেশন ও অভিজ্ঞতা শেয়ারিং সেশনের আয়োজন করে। যেখানে চট্টগ্রামের তৎকালীন স্বনামধন্য লেখক, আর্টিস্ট, ফটোগ্রাফাররা আগ্রহী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতেন। ওয়েব ম্যাগাজিনের সীমাবদ্ধতা ছেড়ে পৃথক শাখায় আগ্রহী সমস্ত উচ্চাকাক্সক্ষী কিশোর-কিশোরীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা শুরু করল যেন তারা তাদের সৃজনশীলতাকে সমুন্নত রাখতে পারে এবং তাদের আত্ম-যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে।

কিশোর-কিশোরীদের সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশ এবং বিভিন্ন সৃষ্টিশীল কাজে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে বর্তমানে তাদের নিয়মিত ৪টি প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়। তাদের প্রোগ্রামগুলো হলো-ব্রিজেস নট বর্ডার্স, ব্রেইনারি, ক্রিয়েটরস কনভারজেনস, ক্লাসরুম সাইডওয়াক গেম প্রজেক্ট। এসব প্রজেক্টে দেশের কিশোর-কিশোরীরা বিদেশি কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে তাদের নিজস্ব সৃজনশীল অভিব্যক্তির মাধ্যমে নিজেদের ভালো লাগা শেয়ার করে এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে। এ রকম অন্তত ৮টি বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের কিশোর-কিশোরীদের সংযুক্ত করেছে আরটি। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সবার মধ্যে বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করা এবং তাদের সৃজনশীল কাজগুলোকে বড় পরিসরে তুলে ধরা। অন্য একটি প্রজেক্টে প্রান্তিক এলাকার কিশোর-কিশোরীদের সৃজনশীল দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করে আরটি ও এর সদস্যরা। এভাবে শহর, প্রান্তিকের কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের আগ্রহের ওপর ভিত্তি করে তাদের সৃজনশীল দক্ষতা উন্নয়নে, সেই সৃজনশীল দক্ষতাগুলো বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের কিশোর-কিশোরীদের কাছে তুলে ধরতে এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংস্কৃতির আদান-প্রদান করতে রিফ্লেক্টিভ টিনস ১০ বছরের অধিক সময় ধরে কাজ করে যাচ্ছে। রিফ্লেকটিভ টিনস বিগত ১০ বছর ধরে চট্টগ্রাম, খুলনা ও ঢাকাসহ বাংলাদেশের নানা প্রান্তের ৬ লাখের অধিক কিশোর-কিশোরীর চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশ এবং বিভিন্ন সৃষ্টিশীল কাজে সম্পৃক্ত করতে পেরেছে।

আরটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ইউসুফ মুন্না বর্তমানে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) উন্নয়ন অধ্যয়ন ডিসিপ্লিনে স্নাতক করছেন। ইউসুফ মুন্নার ‘রিফ্লেক্টিভ টিনস’-এর প্রথম সাফল্য ছিল ২০১৭ সালে প্রভাবশালী সামাজিক উদ্যোক্তাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক অশোকা ইয়াং চেঞ্জমেকারে অন্তর্ভুক্ত হওয়া।

একই বছরে নেপালে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল ইন্টারন্যাশনাল টিন কনফারেন্সেও আলোচক হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন ইউসুফ মুন্না। ভারতে অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল পার্টনারশিপ সামিট’ ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে ফিলিপিন্সে অনুষ্ঠিত অশোকা চেঞ্জমেকার এক্সচেঞ্জে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ইউসুফ প্রতিনিধিত্ব করেন। এরপর ২০২১ সালে কিশোরদের সৃজনশীলতার বিকাশে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানজনক ‘ডায়ানা অ্যাওয়ার্ডে’ ভূষিত হয়েছিলেন তিনি। 

এ ছাড়া দেশ গঠনে নিজ নিজ অবস্থান থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২১ সালে পেয়েছেন ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড।’ সর্বশেষ গত ১২ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘রিভেট’ বিভিন্ন দেশের ২০ জন উদ্ভাবনী সামাজিক উদ্যোক্তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, যেখানে জায়গা করে নিয়েছেন ইউসুফ মুন্না ও তার ‘রিফ্লেক্টিভ টিনস।’ এদিকে ডিজনি চ্যানেলের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘কে সি আন্ডারকভার’-এর জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও হলিউড তারকা ট্রিনিটি স্টোকসের সঙ্গে তার একটি সাক্ষাৎকারও নেওয়া হয়েছে, যেটি দ্রুতই প্রকাশিত হবে। ইউসুফ মুন্না বলেন, প্রত্যেকটি সমস্যাকে আমরা যেমন ‘সমস্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করি ঠিক তেমনি প্রত্যেকটি সমস্যার সমাধানও আছে, যেটা আমাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে। প্রত্যেকটি সমস্যা একেকটি শূন্যস্থান। এই শূন্যস্থানগুলোকে পূরণ করার পথ আমাদের আশপাশেই আছে, শুধু আমাদেরকে খুঁজতে হবে। আমাদের দেখার মতো সেই চোখটা থাকতে হবে।

তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘যেটা করতে চাও শুরু করে দাও, সমস্যাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারণ সমস্যার আরেকটি রূপ হচ্ছে সম্ভাবনা। ঠিক মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতো। শুধু মুদ্রার ওপিঠে যাওয়ার জন্য যে ইফোর্টটা দেওয়া প্রয়োজন সেটা দিতে হবে।’

সময়ের আলো/আরএস/ 




Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: