প্রতিটি কাজে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল তথা ভরসা করা আবশ্যক। এটি মুমিনের বৈশিষ্ট্য ও ইবাদত। যারা আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে তাদের প্রতি তিনি খুশি হন।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা যখন কোনো কাজের সংকল্প করো তখন আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন’ (সুরা আলে ইমরান : ১৫৯)। আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজিদের বিভিন্ন আয়াতে মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, মুমিনরা আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘মুমিন তো তারা, যাদের অন্তরসমূহ কেঁপে ওঠে যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। আর যখন তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং যারা তাদের রবের ওপরই তাওয়াক্কুল করে’ (সুরা আনফাল : ২)। অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান’ (সুরা তালাক : ৩)। যে ব্যক্তি তাওয়াক্কুল করে তার যেকোনো কাজের সফলতার জন্য আল্লাহ তায়ালাই যথেষ্ট। আর আল্লাহ তায়ালা যার জন্য যথেষ্ট হন তার কি কোনো চিন্তা থাকতে পারে?
আল্লাহ তায়ালা তাওয়াক্কুল স্থাপনকারীর প্রতি খুশি হয়ে কিয়ামতের দিন তাকে বিনা হিসাবে জান্নাতে দেবেন। এ সম্পর্কে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘৭০ হাজার ব্যক্তি বিনা হিসাবে, বিনা শাস্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। ৭০ হাজার ব্যক্তি কারা এ সম্পর্কে সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলে, নবীজি (সা.) বলেন, ‘তারা হচ্ছে ওই সব ব্যক্তি, যারা নিষিদ্ধ ঝাড়-ফুঁক ও তন্ত্র-মন্ত্র করে না, কোনো কিছুকে শুভ-অশুভ লক্ষণ হিসেবে গ্রহণ করে না এবং যারা একমাত্র আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করে, তারাই বিনা হিসাবে বিনা শাস্তিতে আল্লাহর জান্নাতে যাবে।’ (বুখারি : ৫৭০৫)
ইসলাম সাধারণ বিষয়েও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে। আমরা যখন ঘর থেকে বের হব তখন নবীজি (সা.) আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করার তাগিদ দিয়েছেন। নবীজি (সা.) এই দোয়া পড়ে ঘর থেকে বের হতেন ‘বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ’, অর্থাৎ ‘আল্লাহ শুরু করলাম এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম’ (তিরমিজি : ৩৪২৬)। ঘর থেকে বের হওয়ার মতো সাধারণ বিষয়েও ইসলামের শিক্ষা হলো তাওয়াক্কুল করা। শুধু তা-ই নয়, দিন শেষে ঘরে ফিরে রাতে ঘুমের মতো নিরাপদ সময়েও তাওয়াক্কুল করার শিক্ষা ইসলাম দেয়।
তাওয়াক্কুল কাকে বলে : তাওয়াক্কুল আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো ভরসা করা, নির্ভর করা, সঁপে দেওয়া। ইসলামি পরিভাষায় তাওয়াক্কুল বলা হয়, ভালো ও কল্যাণকর বিষয় অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় উপায় উপকরণ অবলম্বন করে নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা করার পর ফলাফলের জন্য আল্লাহ তায়ালার ওপর তাওয়াক্কুল করা অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা ভাগ্যে যা লিখে রেখেছেন ফলাফল তা-ই হবে। এক্ষেত্রে একদল লোক বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যায়, প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ অবলম্বন না করে, পরিশ্রম না করে নিজেদের অপারগতাকেই তাওয়াক্কুল ভেবে বসে থাকে। অকর্মা ও অলস হয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকাকে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল বলে চালিয়ে দেয়। অথচ ইসলামে অলসতা ও অকর্মাকে প্রশ্রয় দেয় না। নবীজি (সা.) অলসতা ও অকর্মা হওয়া থেকে পানাহ চাইতেন। হাদিসে নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘দুর্বল মুমিনের চেয়ে সবল শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় ও উত্তম’ (মুসলিম : ২৬৬৪)। তাই নিয়ম হচ্ছে-যেকোনো বিষয়ে প্রথমত কাজের পরিকল্পনা করা। তারপর বাস্তবায়নের উপায় উপকরণ বের করা এবং আপ্রাণ চেষ্টা করা। সবশেষে ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা। অর্থাৎ প্রথমে চেষ্টা, তারপর তাওয়াক্কুল। অসুস্থ হলে প্রথমে ওষুধ সেবন, তারপর তাওয়াক্কুল। তবে তাওয়াক্কুল হবে ওষুধের ওপরে নয় বরং আল্লাহর ওপর। এটাই তাওয়াক্কুলের মূল কথা।
তাওয়াক্কুল সম্পর্কে ভুল ধারণা : কাজের ওপর তাওয়াক্কুলকে প্রাধান্য দেওয়া, অনেকে তাওয়াক্কুলের অর্থ না বোঝার দরুন কাজ-চেষ্টা না করেই আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে বসে থাকে। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো আগে চেষ্টা, পরে তাওয়াক্কুল। হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি নবীজি (সা.)-এর কাছে এসে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! উটের রশি বেঁধে তাওয়াক্কুল করব, নাকি রশি না বেঁধে তাওয়াক্কুল করব? উত্তরে নবীজি (সা.) বলেন, ‘আগে রশি বাঁধো, তারপর তাওয়াক্কুল করো’ (সহিহ ইবনে হিব্বান : ৭৩১)। আগে ভালোভাবে উট বাঁধতে হবে, তারপর তাওয়াক্কুল করতে হবে।
পাখিদের তাওয়াক্কুল : হজরত ওমর (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যদি সঠিকভাবে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতে তবে তিনি তোমাদেরকে রিজিক দান করতেন, যেভাবে তিনি পাখিদের রিজিক দান করেন। পাখিরা খালি পেটে সকালে বের হয় এবং পেটভর্তি হয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসে’ (তিরমিজি : ২৩৪৪)।
হাফেজ ইবনে রজব (রহ.) বলেন, ‘তাওয়াক্কুলের ক্ষেত্রে এ হাদিসটিই হলো মূল’ (জামেউল উলুম ওয়াল হেকাম : ৪৩৬৬)। আর তাওয়াক্কুলই হলো জীবিকা পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ করে দেবেন। এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিজিক দেবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট’ (সুরা তালাক : ২-৩)। তা হলে আমরা প্রথমে পরিকল্পনা করব, তারপর বাস্তবায়নের উপায় উপকরণ বের করে তা অর্জনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করব এবং সর্বশেষ আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করব। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সদাসর্বদা তার ওপর তাওয়াক্কুল করার তওফিক দান করুন।
সময়ের আলো/আরএস/