দান-সদকার বরকত ও উপকারিতা

মুফতি হিদায়াতুল্লাহ রাহমানী

ইসলামের আলো

পৃথিবীতে স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজন অর্থ-সম্পদ। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য টাকা-পয়সা অনিবার্য বিষয়।

2023-09-17T13:13:35+00:00
2023-09-17T13:13:35+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬,
৩ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
ইসলামের আলো
দান-সদকার বরকত ও উপকারিতা
মুফতি হিদায়াতুল্লাহ রাহমানী
প্রকাশ: রোববার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৩, ১:১৩ পিএম 
পৃথিবীতে স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজন অর্থ-সম্পদ। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য টাকা-পয়সা অনিবার্য বিষয়। তবে টাকা-পয়সা থাকলেই জীবন ধারণের সব উপকরণ সহজ হয় না। এর জন্য প্রয়োজন মহান রবের দয়া ও অনুগ্রহ। ধন-সম্পদ বিষয়ে কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘এসব পার্থিব জীবনের উপকরণ। আর আল্লাহর কাছে রয়েছে উত্তম আশ্রয়স্থল’ (সুরা আলে ইমরান : ১৬)। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইহকালীন জীবনে কাউকে খুুব সহজে আবার কাউকে মেহনত-মুজাহাদা ও সাধনার পর মোটা অঙ্কের টাকা-পয়সা, অর্থ-সম্পদের মালিক বানান। বিত্তশালী বান্দাদের প্রতি আল্লাহর হুকুম হলো, তোমরা তোমাদের প্রদত্ত বিত্ত-বৈভবের কৃতজ্ঞতা আদায় করো। শরিয়ত নির্ধারিত জাকাত আদায় করো। এর বাইরেও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান-সদকা করো। বর্ণিত হয়েছে, ‘আমি তোমাদের যে রিজিক (অর্থ-সম্পদ, ব্যাংক-ব্যালান্স) দিয়েছি, তা থেকে খরচ করো ওই দিন আসার আগেই, যেদিন বলবেÑহে রব! কেন আপনি আমাকে আরেকটু সময় অবকাশ দিলেন না, তা হলে আমি দান-সদকা করে নেককারদের অন্তর্ভুক্ত হতাম’ (সুরা মুনাফিকুন : ১০)? হাদিসে এসেছে, ‘সদকা বা দান দাতাদের কবর থেকে আজাবের তীব্রতা কমিয়ে দেয়। আর অবশ্যই মুমিন কেয়ামতের দিন তার দান-সদকার ছায়ায় ছায়া গ্রহণ করবে।’ (সিলসিলাতুস সহিহা : ৩৪৮৪)।

দান-সদকার যেমন রয়েছে পরকালীন সওয়াব-বিনিময় ও আল্লাহর সন্তুষ্টি; তেমনি ইহকালীন জীবনেও রয়েছে নানাবিধ বরকত ও উপকার। যেমনÑ১. সামাজিক জীবনে অর্থনৈতিক ভারসাম্য তৈরি হয়। যার কারণে সামাজিক স্থিতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২. মুমিনজীবনে মারাত্মক একটি ব্যাধি হলো অর্থের প্রতি অতি মোহ ও লোভ। দান-সদকার মাধ্যমে এই আত্মিক রোগ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম’ (সুরা তাগাবুন : ১৬)। ৩. দান-সদকার দ্বারা বিপদাপদ ও রোগ দূর হয়। আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, ‘সদকা খারাপ মৃত্যুকে দূরীভূত করে’ (জামে সগির : ৫১২৬)। এ ছাড়াও দান-সদকার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বিপদাপদ দূর করে দেন। হায়াতে বরকত দেন। দান-সদকা যারা গ্রহণ করেন তারা দাতার জন্য মুসিবত থেকে মুক্তি ও কল্যাণ লাভের দোয়া করেন। তাদের দোয়ার মাধ্যমেও আল্লাহ বিপদ দূর করে দিতে পারেন। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সদকার মাধ্যমে তোমাদের রোগীদের চিকিৎসা করো।’ (সহিহুল জামে : ৩৩৫৮)

দান-সদকার দ্বারা কল্যাণ ও বরকত লাভ হয়। সম্পদ বাড়ে। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের কল্যাণে খরচ করো’ (সুরা তাগাবুন : ১৬)। অর্থাৎ আল্লাহ প্রদত্ত অর্থ থেকে তোমরা আত্মীয়স্বজন, ফকির-মিসকিন, অভাবী, দুস্থ-অনাথদের ওপর খরচ করো। তা হলে দুনিয়া ও আখেরাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ হবে। বরকত হবে। অন্যথায় উভয় জগতে অর্থ তোমাদের জন্য অনিষ্টকর হবে (তাফসিরে ইবনে কাসির)। পবিত্র কুরআনে এসেছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ সুদ মিটিয়ে দেন। দান-সদকাকে বৃদ্ধি করেন’ (সুরা বাকারা : ২৭৬)। শুধু তাই নয়, দান-সদকাকে আল্লাহ ঋণ হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং প্রবৃদ্ধির ওয়াদা করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও, তবে তিনি তা তোমাদের জন্য বৃদ্ধি করে দেবেন এবং তোমাদের মাফ করে দেবেন। আল্লাহ অতিশয় গুণগ্রাহী ও সহিষ্ণু।’ (সুরা তাগাবুন : ১৭)।

মহান আল্লাহ অন্যত্র ইরশাদ করেছেন, ‘এমন কে আছে যে আল্লাহকে করজ দেবে, উত্তম করজ (আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করবে)? অতঃপর আল্লাহ তাকে দ্বিগুণ-বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেন। আল্লাহই বাড়িয়ে দেন এবং তিনিই কমিয়ে দেন। আর তোমরা তারই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে’ (সুরা বাকারা : ২৪৫)। সুরা বাকারার অন্য জায়গায় দান-সদকার প্রবৃদ্ধির উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘যারা তাদের ধন-সম্পদ আল্লাহর পথে খরচ করে তাদের (ব্যয়িত অর্থ-সম্পদের) দৃষ্টান্ত হলো, এমন শস্যদানার ন্যায়, যে দানা সাতটি শীষ উৎপন্ন করেছে। যে সাতটি শীষের প্রত্যেকটিতেই ১০০টি করে শস্য রয়েছে। আর এই বৃদ্ধি আল্লাহ যাকে ইচ্ছা প্রদান করেন (আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে ইখলাস অনুযায়ী আরও বাড়িয়ে দেন)। (সুরা বাকারা : ২৬১)।

তাফসিরে বয়ানুল কুরআনে আশরাফ আলী থানভি (রহ.) বলেন, নেক কাজ তিন প্রকারÑ১. লোক-দেখানো নেক কাজ। এ কাজের কোনো সওয়াব নেই। ২. সাধারণত নিষ্ঠার সঙ্গে কৃত নেক কাজ। এ কাজের সওয়াব দশগুণ। ৩. সমধিক নিষ্ঠার সঙ্গে (ইখলাসের স্তর অনুসারে) কৃত নেক কাজ। এ কাজের সওয়াব দশগুণ থেকে সাতশগুণ বা তার চেয়েও অধিক (বয়ানুল কুরআন)। সুতরাং দান-সদকার ক্ষেত্রেও আল্লাহ তায়ালা ইচ্ছা করলে ইহজগতে এবং পরকালীন সওয়াবে বেহিসাব প্রবৃদ্ধি ঘটাতে পারেন। যেমন হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘বান্দা যখন পবিত্র সম্পদ থেকে দান করে, আল্লাহ সেটিকে কবুল করেন এবং ডান হাতে তা গ্রহণ করেন এবং সেটাকে বাড়াতে থাকেন। যেরকম তোমাদের কেউ তার অশ^শাবক ও উটের বাচ্চাকে লালন-পালন করে। (শুধু তাই নয়) কোনো ব্যক্তি একটি লোকমা সদকা করলে, সেটা আল্লাহর কাছে বেড়ে উহুদ পর্বত সমান হয়ে যায়। তোমরা সদকা করো। (বুখারি : ১৪১০) 

দান-সদকার মাধ্যমে সামাজিক মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। দান করতে মহান আল্লাহ হুকুম করেছেন। নানাভাবে উৎসাহী করেছেন। অতএব তিনি অবশ্যই দান-সদকা ও দাতাকে পছন্দ করেন। ভালোবাসেন। আর হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, ফেরেশতাদের মধ্যে, আসমানবাসীদের মধ্যে এমনকি পৃথিবীবাসীর মধ্যেও তার ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করে দেন’ (বুখারি : ৩২০৯)। আমাদের সামাজিক কাঠামোতেও লক্ষণীয়, যারা সমাজের বিভিন্ন স্তরে ডোনেশন করেন, তাদের প্রতি কোমল মানসিকতা তৈরি হয়। মানুষ তাদের ভালোবাসে। সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে। তবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতীত সামাজিক মান-মর্যাদা বৃদ্ধিকে টার্গেট করে দান করা যাবে না। এমন দানবীরের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তির ধমক। বরং আল্লাহর জন্য দান করলে এমনিতেই মান-মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। মহান আল্লাহ সবাইকে একনিষ্ঠভাবে দান করার তওফিক দিন।

সময়ের আলো/আতা


Loading...
Loading...
ইসলামের আলো- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: