কৃষিবিদ আতিকুর রহমান সানী সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) পিএইচডি গবেষক। গবেষণায় তরুণদের ভীতি দূর করে নিজের শক্তিমত্তা ও দুর্বলতা অনুযায়ী পরিকল্পনা সাজিয়ে রিসার্চ, পাবলিকেশন্স ও বিভিন্ন পারসোনাল ও প্রফেশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্টের সেরা সুযোগ কীভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত করা যায়, সেই চিন্তা থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন পাথফাইন্ডার রিসার্চ অ্যান্ড কনসালট্যান্সি সেন্টার। গবেষণায় অসামান্য কৃতিত্বের জন্য তিনি ‘এশিয়ার অসামান্য গবেষক পুরস্কার ২০২৩’সহ অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেন।
শুরুর গল্প : একজন আন্তর্জাতিক মানের গবেষক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আতিকুর রহমান সানী গবেষণা জীবন শুরু করেছিলেন ২০১৩ সালে। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক ড. মোস্তফা সামসুজ্জামান শাকিল ও ড. মাহমুদুল ইসলামের হাত ধরে গবেষণায় দক্ষতা বৃদ্ধি করতে থাকেন। তার লক্ষ্য ছিল গবেষণা আর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি নিজের স্বপ্নটা তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া, তারা যেন শুধু বিসিএসকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য মনে না করে, যার যার ফিল্ডে অবদান রাখতে পারেন। গবেষণা করতে গিয়ে ২০১৪ সালে ওয়ার্ল্ডফিশ বাংলাদেশ অ্যান্ড সাউথ এশিয়াতে অ্যাকোয়াফনিক্স ও মলা মাছ ধরার জালের ওপর গবেষণা প্রপোজাল জমা দিয়ে ইউএসএইড-এআইএন প্রজেক্টে কাজ করার সুযোগ পান। এখান থেকেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গবেষণার মাধ্যমে পরিচিতি পেতে থাকেন। ২০১৫ সালের জুনে প্রথম কনফারেন্স পেপার প্রকাশিত হয়। তারপর প্রথম বুক চ্যাপ্টার প্রকাশিত হয় মেমোরিয়াল ইউনিভার্সিটি অব নিউফাউন্ডল্যান্ড, সেন্ট জনস, কানাডার গ্লোবাল রিসার্চ নেটওয়ার্ক পার্টনারশিপ টিবিটিআই থেকে ২০১৬ সালে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে বিখ্যাত পাবলিশার্স ‘এলসেভিয়ার’-এর ‘ওশেন অ্যান্ড কোস্টাল ম্যানেজমেন্ট’ জার্নালে তার ইলিশের অভয়াশ্রম সংক্রান্ত গবেষণা প্রকাশ পেলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুনাম অর্জন : নভেম্বর ২০১৬ সালে থাইল্যান্ডের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এআইটি) অনুষ্ঠিত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত একটি কনফারেন্সে তার গবেষণা উপস্থাপন করার জন্য আমন্ত্রণ পান। তার উপস্থাপিত গবেষণাটি ব্যাপক সাড়া ফেলে যা পরবর্তীতে বিখ্যাত জার্নাল ‘স্প্রিঞ্জার’ থেকে প্রকাশিত বইয়ে বুক চ্যাপ্টার হিসেবে প্রকাশিত হয়। ২০১৭ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত এশিয়া প্যাসিফিক নেটওয়ার্ক ফর গ্লোবাল চেইঞ্জ রিসার্চ (এপিএন) কর্তৃক আয়োজিত কনফারেন্সে নদী দূষণের ওপর তার গবেষণা প্রকাশিত হয়। আস্তে আস্তে বিভিন্ন মিডিয়ায় তার কাজ নিয়ে রিপোর্ট হতে থাকে এবং তার গবেষণাতে আত্মনিয়োগ বাড়তে থাকে। সফলতার সঙ্গে ডিসেম্বর ২০১৭ সাল পর্যন্ত কাজ করেন ওয়ার্ল্ডফিশের ইকোফিশ প্রকল্পেও। এই সময়ে একে একে পাবলিশ হয় তার ১০টি গবেষণা।
তরুণ গবেষকদের সহায়তার জন্য পাথফাইন্ডার প্রতিষ্ঠা : গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গিয়ে দেখেন উচ্চশিক্ষা এবং কর্মজীবনে এমন অনেক দক্ষতা প্রয়োজন যেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই আমরা একাডেমিক জীবনে শিখে আসার সুযোগ পাই না। এ বিষয়গুলো গ্র্যাজুয়েট এবং প্রফেশনালদের একটা বড় অংশকে হতাশ করে দেয়। প্যাশন অনুসরণ করবে (গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা) নাকি গতানুগতিক চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে। কী করে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ নেবে তা বুঝতে পারে না, কোন স্কিলগুলো কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করবে তা খুঁজে বের করাটাও চ্যালেঞ্জিং মনে হয়। এ বিষয়গুলো আতিককে ভাবাতে থাকে, নিজের ভেতর থেকে তরুণ গবেষকদের উন্নয়নের জন্য কোনো উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে থাকেন আর এই ভাবনা থেকেই প্রতিষ্ঠা করেন পাথফাইন্ডার রিসার্চ অ্যান্ড কনসালট্যান্সি সেন্টার, যা এখন দেশের অন্যতম বৃহত্তম কনসালট্যান্সিভিত্তিক অনলাইন রিসার্চ অ্যান্ড লার্নিং প্ল্যাটফর্ম।
এক লড়াকু তরুণ : কোনো পুঁজি ছাড়াই নিজের একটি ভাঙা ল্যাপটপ সঙ্গে করে গবেষণাভিত্তিক কনসালট্যান্সি, কোচিং ও মেন্টরিং করা শুরু করেন। একসময় কোলাবরেটিভ গবেষণা প্রকল্প পরিচালনার সুযোগ পান দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ের সম্মানিত অধ্যাপকদের সঙ্গে। যেহেতু গবেষণা প্রকল্প একা পরিচালনা করা যায় না তার জন্য লোকবল প্রয়োজন, কিন্তু সেই পরিমাণ আয়ও হচ্ছিল না। এরই মধ্যে সিলেটের সুবিদবাজারের এক্সেল টাওয়ারের অফিস নেওয়ায় যাতায়াত ও পরিচালনা খরচ বাড়তে থাকে। একসময় অফিসে যাওয়া-আসার ভাড়াও দিতে পারেন না, মাসের পর মাস দুপুরের খাবার ছাড়া ও ৪০ টাকার সিএনজি ভাড়া পরিমাণ জায়গা পায়ে হেঁটে চলেছেন। এভাবে চলেও পরিচালনা খরচ চালাতে পারছিলেন না। তাই বাধ্য হয়ে বাসার প্লাস্টিকের ব্যাংকে নিজের স্ত্রীর তিল তিল করে জমানো টাকা শেষ হওয়ার পর এক মাসে নিজের বিয়েতে উপহার পাওয়া প্রাইজ বন্ডগুলো দিয়ে ব্যয় মেটান। টাকার অভাব, বিভিন্নজনের অনেক ভর্ৎসনা সহ্য করে হলেও সমাজের চাওয়ার কাছে নিজের লালিত স্বপ্নটিকে বিক্রি করতে পারেননি, মুখ বুজে চেষ্টা আর আমল করতে থাকেন। অবশেষে ২০১৯ সালের জুনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সূচনা প্রকল্পে যোগদান করেন, সেই সঙ্গে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষণাও শুরু করেন।
সফলতা : আতিকুর রহমান সানী জানান, এখন আল্লাহ দুহাত ভরে দিচ্ছেন। ইউএসএআইডি, ইউএসডিএ, ডিএফআইডি, ইইউ, এফএও এবং ব্যানবেইসের বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পে গবেষক হিসেবে প্রায় ১০ বছর কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। নিজের প্রতিষ্ঠিত পাথফাইন্ডার এখন প্রতিদিন গবেষক ও বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে অথবা নামমাত্র মূল্যে গবেষণা ও প্রয়োজনীয় স্কিল উন্নয়নে কাজ করছেন, যার ফেসবুক পেজ ও গ্রুপের ফলোয়ার লক্ষাধিক। এলসেভিয়ার, স্প্রিঞ্জার, টেলর অ্যান্ড ফ্রান্সিস, উইলি, ফ্রন্টিয়ার্স ও এমডিপিআইর জার্নালসহ বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন জার্নালে ৫০টিরও অধিক আর্টিকেল ও চ্যাপ্টার প্রকাশিত হয়েছে। আরও অনেক প্রকাশিত হওয়ার প্রহর গুনছে। এরই মধ্যে তার গুগল স্কলার সাইটেশন ৬০০ অতিক্রম করেছে এবং গুগল এইচ ইনডেক্স ১৯ এ উন্নীত হয়েছে। এরই মধ্যে গবেষণাক্ষেত্রে তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জার্নালে কো-এডিটর ইন চিফ ও এডিটরিয়াল বোর্ড মেম্বার হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। এ ছাড়াও সুইজারল্যান্ডের বিখ্যাত জার্নাল ‘ফ্রন্টিয়ারস ইন পাবলিক হেলথ’-এর ‘পাবলিক হেলথ অ্যান্ড নিউট্রেশন’ সেকশনে ১৬৯ জন এডিটর এর মধ্যে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি। পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিভিন্ন পুরস্কার তার স্বীকৃতির ভান্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। কোভিড গবেষণায় তার অসামান্য কৃতিত্বের জন্য টাইমস অব রিসার্চ ও ওয়ার্ল্ড রিসার্চ কাউন্সিলের পক্ষ থেকে তিনি ‘এশিয়ার অসামান্য গবেষক পুরস্কার ২০২৩’ লাভ করেন। এ ছাড়াও তিনি বাংলাদেশ, ভারত এবং থাইল্যান্ডে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং সিম্পোজিয়ামে গবেষণা উপস্থাপন করে একাধিকবার ‘সেরা উপস্থাপনা পুরস্কার বা বেস্ট প্রেজেন্টেশন অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন।
তরুণ গবেষকদের আশার আলো : অনেক তরুণ গবেষকদের স্বপ্ন পূরণের সাথী এখন আতিকুর রহমান সানী। তিনি এ পর্যন্ত ২২ জন স্নাতকোত্তর গবেষকের থিসিস মেন্টর হিসেবে কাজ করেছেন। তার রিসার্চ ফেলোরা ১০০ এর অধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে সুনামের সঙ্গে কাজ ও পড়াশোনা করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী পাথফাইন্ডারের অ্যালামনাই শরীফ আহমদ সাজ্জাদ জানান, ‘আমি গর্বিত এ রকম একজন মেন্টরের সঙ্গে কাজের সুযোগ পেয়েছি। আতিকুর রহমান সানী ভাই সম্পর্কে বলে শেষ করা যাবে না, আমি আজীবন কৃতজ্ঞ তার প্রতি। পাশে থেকে এভাবেই অনেক দূর যেতে চাই, ইনশাআল্লাহ।’ আরেক অ্যালামনাই আবির হাসান জানান, ‘পাথফাইন্ডারের ইভেন্টগুলো সাধারণত খুবই প্রাণবন্ত হয়। বিশেষ করে আতিকুর রহমান সানী ভাইয়ের লেকচারগুলো অসাধারণ।
অনলাইন, অফলাইন সব জায়গায়ই মানুষটা অসাধারণ। আমার মতো অনেকেই হয়তো মানুষটির কাছ থেকে চাকরি, গবেষণা, প্রেজেন্টেশন অথবা ইন্টারভিউ কোনো না কোনোভাবে উপকৃত হয়েছেন।’ খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক জাহিদ হোসেন পাভেল জানান, সানী ভাই নিজে ভালো করার সঙ্গে সঙ্গে নম্রতা, অনুগ্রহ এবং বিনয় দিয়ে অন্যদেরও স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কাজ করেন। তিনি সবসময়ই নিজের সাফল্য দলের সঙ্গে ভাগ করে নেন এবং আমার মনে হয় অন্যের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসাটা তার শীর্ষে ওঠার অন্যতম কারণ।
সময়ের আলো/জেডআই