একটি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ পদে চাকরি করেন মো. মনিরুজ্জামান। স্ত্রী-সন্তান ও ছোট বোনসহ বসবাস করতেন রাজধানীর জিগাতলায়। হঠাৎ একদিন রাত দুইটার দিকে ছোট বোন বাথরুমে যাওয়ার সময় মশারিতে পা আটকে পড়ে যান। বেকায়দায় পড়ে একটি পা ভেঙে যায়। সেই গভীর রাতেই তাকে নিয়ে নেমে পড়লেন রাস্তায় হাসপাতালে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু পকেটে তখন নগদ অর্থ ছিল মাত্র হাজার খানেক টাকা। দ্রুত কিছু টাকা দরকার। এই গভীর রাতে কার কাছে কোথায় পাবেন টাকা। পকেটে ছিল ক্রেডিট কার্ড, তার ভরসাতেই ছুটলেন একটি বেসরকারি হাসপাতালে। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে ছোট বোনের ভাঙা পায়ের চিকিৎসা করে ঘরে ফেরেন। ঘটনাটি বেশ কয়েক বছর আগের। তবে জরুরি প্রয়োজনের সময় ক্রেডিট কার্ডের ওই তাৎক্ষণিক উপকারের কথা তিনি আজও ভোলেননি।
শুধু একজন মনিরুজ্জামানের নয়, হাজারো লোকের বিপদের বন্ধু হয়ে এখন জীবনের অংশ হয়ে গেছে ক্রেডিট কার্ড। আবার কারও কাছে ক্রেডিট কার্ড জীবনের জরুরি প্রয়োজনের অন্যতম সহায়ক। শপিং মলে কেনাকাটায়, সুপার শপে সাংসারিক পণ্য কিনতে বা অন্যান্য পণ্য কিনতেও বড় ভরসা এখন ক্রেডিট কার্ড। পাশাপাশি সংসারের প্রয়োজনে ফ্রিজ-এসির মতো দামি পণ্য কিনতে শোরুমে যাওয়ার পর দেখা গেল একটি মডেল পছন্দ হলো, দাম অনেক। অত টাকা পকেটে নেই। পছন্দের ফ্রিজ বা এসিটি হয়তো কেনা যাচ্ছে না। তখনও আপনাকে উদ্ধার করতে পারে ক্রেডিট কার্ড। এভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে অতি প্রয়োজনে পাশে থেকে জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে ক্রেডিট কার্ড।
একসময় ক্রেডিট কার্ড আভিজাত্যের প্রতীক ছিল বর্তমানে এটি জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। চলে এসেছে সাধারণের নাগালের মধ্যে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই কার্ড জনপ্রিয় করতে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও ছাড় দেওয়া হয়। ফলে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে চাকরিজীবী ও পেশাজীবীরা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছেন।
হঠাৎ জরুরি প্রয়োজনে টাকার প্রয়োজনে ক্রেডিট কার্ড বড় সমাধান হয়ে এসেছে। তা ছাড়া ইলেকট্রনিক, আসবাব, পোশাক, গাড়ি, ভোগ্যপণ্যসহ অনেক কিছু বর্তমানে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে কেনা যাচ্ছে। দামি পণ্যের ক্ষেত্রে কিস্তির সুবিধাও মিলছে। হাসপাতালে বিলও দেওয়া যাচ্ছে ক্রেডিট কার্ডে। পকেটে টাকা না থাকলেও সমস্যা নেই, একটি ক্রেডিট কার্ড থাকলেই খাওয়া-দাওয়া কিংবা বাস-ট্রেন-বিমানের টিকেট কেনাও সহজ হয়ে যায়।
ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের জন্য বার্ষিক একটা মাশুল দিতে হয় গ্রাহকদের। তবে কার্ড থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ খরচ করলে সেই মাশুল থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। অন্যদিকে কার্ডের ব্যবহার বাড়াতে অধিকাংশ ব্যাংকই নানা ধরনের মূল্যছাড় দেয়। ব্র্যান্ডের পোশাক, ইলেকট্রনিক, জুতা, হোটেল-রিসোর্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য বা সেবা কিনলেই ছাড় মিলছে।
প্রতি মাসে কার্ডের বিল জমা দেওয়াটা অনেকের কাছেই ঝামেলাপূর্ণ মনে হয়। অর্থ জমা দেওয়ার শেষের দিনগুলোতে ব্যাংকে প্রচুর ভিড় থাকে। তবে সময়ের ব্যবধানে এ কাজও সহজ হয়েছে। একাধিক ব্যাংকের কার্ডের বিল বর্তমানে মোবাইল আর্থিক সেবা বা এমএফএসের মাধ্যমে ঘরে বসেই জমা দেওয়া যাচ্ছে। আবার অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও কার্ডের বিল দেওয়া যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, একসময় মানুষ ক্রেডিট কার্ডের প্রতি কম আগ্রহী হলেও এখন এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে দেশের ৩৯টি ব্যাংক কার্ড সেবা দিচ্ছে। এসব ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২ লাখেরও বেশি। ঠিক চার বছর আগে ২০১৯ সালে এ কার্ডের সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ৪৯ হাজারটি। অর্থাৎ মাত্র চার বছরে ক্রেডিট কার্ড বেড়েছে ৮ লাখেরও বেশি বা ৬১ দশমিক ৪২ শতাংশ। একই সময়ে লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে।
ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়ছে : বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে দেশের ভেতর ক্রেডিট কার্ডে সর্বমোট লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি। সে তুলনায় জুলাই মাসে ছিল কিছুটা কম। অর্থাৎ ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ওপরে। এই পরিসংখ্যান থেকে ধরে নেওয়া যায়, ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে। তবে আশ্চর্যের বিষয়, গত আগস্ট মাসে ক্রেডিট কার্ডে যা লেনদেন হয়েছে তার বেশিরভাগ ছিল ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। এরপর রয়েছে খুচরা দোকানে। এ ছাড়াও পরিষেবা বিল, নগদ টাকা ওঠানো, ফার্মেসি, পোশাকের দোকান, পরিবহন খাতেও এই কার্ড ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো কোনো ফার্মেসি দোকানে নগদের চেয়ে ক্রেডিট কার্ডে বেশি বিক্রি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন শুধু যে দেশে হয়েছে তা নয়, বিদেশেও কম হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশিরা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ব্যয় করেছেন প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ওপরে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। তবে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ছাড়াও রয়েছে পোশাক কেনা, পরিবহন ব্যয়। এ ছাড়া বিদেশে ওষুধ কিনতে অনেকে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেছেন। তবে দেশে সবচেয়ে বেশি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার হচ্ছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। যার অংশ হচ্ছে ৪৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এ ছাড়া খুচরা দোকানে ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ, পরিষেবা বিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ, ওষুধের দোকানে ৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ, নগদ টাকা ওঠানো ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ, পোশাকের দোকানে ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ, সরকারি সেবায় শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশ।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও একটি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশিরা ক্রেডিট কার্ডে যত টাকা ব্যয় করেছেন তার প্রায় বেশিরভাগ হচ্ছে ভিসা কার্ডে। এর মধ্যে রয়েছে মাস্টার কার্ড, অ্যামেক্স কার্ড। এই দুই ধরনের কার্ড ইস্যু করে বাংলাদেশের হাতেগোনা কয়েকটি ব্যাংক। এর মধ্যে দি সিটি ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক। তবে এ পর্যন্ত যে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে বিদেশে লেনদেন হয়েছে তা বেশিরভাগ হচ্ছে ভিসা কার্ড। গত আগস্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই কার্ড ব্যবহার করে বিদেশে লেনদেন হয়েছে ৩০০ কোটি টাকার বেশি। এর পরই রয়েছে মাস্টার কার্ড। এই কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৬০ কোটি টাকা। অ্যামেক্স কার্ড ব্যবহার করে ব্যয় হয়েছে ৩২ কোটি টাকার ওপরে।
যেসব জায়গায় ব্যবহার করা যাবে না ক্রেডিট কার্ড : বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, অনলাইনে জুয়া খেলা, বৈদেশিক লেনদেন, ক্রিপ্টো কারেন্সি, লটারির টিকেট কেনা কিংবা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কেনাবেচায় ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা যাবে না। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরেকটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে উবারের বিল পরিশোধের সুযোগও বন্ধ করে দিয়েছে।
যেসব কাজ করা যাবে : সাধারণত অনলাইনে কেনাকাটা বা সরাসরি দোকানে গিয়ে ক্রয়ের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যায় ক্রেডিট কার্ড। ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকরা ঘরে বসেই ই-কমার্সের মাধ্যমে যে কোনো লাইফ স্টাইল পণ্য, সিনেমার টিকেট, খাবার, বাস রেলওয়ের টিকেট ক্রয়ের সুযোগ পান। বাংলাদেশে এখন বিভিন্ন ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকরা বিভিন্ন মার্চেন্ট আউটলেটে লাইফ স্টাইল, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ফার্নিচার, ইলেকট্রনিকস কেনাকাটায় নানা ছাড় পেয়ে থাকেন। সাথে তিন থেকে ২৪ মাস পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে শূন্য শতাংশ সুদ কিস্তিতে মূল পরিশোধের সুযোগ আছে। এক্ষেত্রে একজন গ্রাহক ১৫ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত কোনো সুদ ছাড়া অর্থ পরিশোধের সুযোগ পেয়ে থাকেন। ক্রেডিট কার্ড গ্রাহক কার্ড চেকের মাধ্যমে দরকারি সময়ে নগদ অর্থ ওঠাতে পারবেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অনলাইনে পণ্য বা সেবা ক্রয়, হোটেল বুকিং, বিদেশে শিক্ষা গ্রহণে বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণ এবং বিদেশে প্রশিক্ষণ/সেমিনার/ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ ফি দেওয়া যাবে।
যেসব সুবিধা পাওয়া যায় : দ্রুত লেনদেন (অন্যের কাছ থেকে টাকা ধার না করে কার্ড ব্যবহার করে হাতে থাকা অর্থের চেয়ে বেশি দামে পণ্য ক্রয়ের সুবিধা)। পুরস্কার পয়েন্ট (বিশেষ করে বিমান ভ্রমণের ক্ষেত্রে এটি খুবই আকর্ষণীয়, যে সুবিধা ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন করলে পাওয়া যায়)। নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। অধিকতর নিরাপদ (প্রচলিত ডেবিট কার্ডের চেয়ে ক্রেডিট কার্ডের সুরক্ষা অনেক বেশি)।
আছে কিছু অসুবিধাও : সবচেয়ে বড় অসুবিধা- খরচ বেড়ে যায় এবং ঋণের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি। হিডেন বা লুক্কায়িত ব্যয় বেড়ে যায়। এছাড়া ভুল কার্ডে ঋণের বোঝা বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এজন্য বেশ সতর্ক হতে হবে গ্রাহককে। একটু বেখেয়ালি হলেই পড়তে পারেন ঋণের ফাঁদে। ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার সবসময়ই একটি ঋণ নেওয়ার মাধ্যম। মনে রাখতে হবে, অর্থ খরচের ৪৫ দিনের মধ্যে সেটি পরিশোধ করতেই হবে। অন্যথায় ঋণের ওপর সুদ শুরু হবে, যা ঋণের পরিমাণ প্রতিদিন বাড়িয়ে দেবে। তাই কিছুটা ঝুঁকি থেকেই যায়। সুদের হার পরিশোধই ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের একমাত্র ব্যয় নয়। সময়মতো মাসিক বিল পরিশোধ না করলে গ্রাহককে জরিমানা গুনতে হতে পারে। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে নগদ অর্থ তুললে এর জন্য নির্দিষ্ট হারে ফি দিতে হতে পারে। সরাসরি বুথ থেকে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে নগদ অর্থ উত্তোলন করতে গেলে বাড়তি ফি এবং ওইদিন থেকেই (এক্ষেত্রে ৪৫ দিন সময় দেওয়া হয় না) সুদ গণনা শুরু হয়। এক্ষেত্রে চেক দিয়ে টাকা সঞ্চয় হিসেবে স্থানান্তর করে তারপর সেটি নগদায়ন করলে ৪৫ দিন সময় পাওয়া যাবে।
সময়ের আলো/আরএস/