নির্বিচারে হামলা-অগ্নিসংযোগ

এসএম মিন্টু

রাজধানী

বিএনপি ও আওয়ামী লীগের পাল্টাপাল্টি সমাবেশে যাচ্ছিলেন দুই দলের নেতাকর্মীরা। সকাল থেকেই শান্তিপূর্ণভাবে লোকসমাগম শুরু হয় বিভিন্ন স্থানে। শনিবার হঠাৎ

2023-10-29T15:10:07+00:00
2023-10-29T19:26:39+00:00
 
  রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬,
২১ আষাঢ় ১৪৩৩
রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
রাজধানী
অ্যাম্বুলেন্স, বাস, ট্রাক, পিকআপ ও মোটরসাইকেলসহ ৩৫ গাড়িতে আগুন
নির্বিচারে হামলা-অগ্নিসংযোগ
এসএম মিন্টু
প্রকাশ: রোববার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৩, ৩:১০ পিএম  আপডেট: ২৯.১০.২০২৩ ৭:২৬ পিএম
নির্বিচারে হামলা-অগ্নিসংযোগ
বিএনপি ও আওয়ামী লীগের পাল্টাপাল্টি সমাবেশে যাচ্ছিলেন দুই দলের নেতাকর্মীরা। সকাল থেকেই শান্তিপূর্ণভাবে লোকসমাগম শুরু হয় বিভিন্ন স্থানে। শনিবার হঠাৎ দুপুর সোয়া ১টার দিকে কাকরাইল মসজিদ-সংলগ্ন এলাকার সামনে থেকে হুড়োহুড়ির শব্দ শোনা যায়। 

এরপরই হামলা-অগ্নিসংযোগ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু। মুহূর্তেই কাকরাইলের এই সংঘর্ষ পুরো পল্টন, আরামবাগ, ফকিরাপুলসহ আশপাশ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। গোটা এলাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। 

হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কারণে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ডিএমপি সূত্র জানায়, মূলত বেলা ১১টা ২০ মিনিট থেকে অগ্নিসংযোগ শুরু করে বিক্ষোভকারীরা। ডিএমপির হিসাবে শনিবার বেলা ১১টা ২০ মিনিট থেকে রাত ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত পুলিশের গাড়িসহ ৬৯টি যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় ৮টি পুলিশ বক্সেও আগুন দেয় বিক্ষুব্ধরা। 

হামলার এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা টার্গেট করে পুলিশ ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়। হামলার সময় ফকিরাপুলে সংঘবদ্ধভাবে এক পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে নৃশংসভাবে রক্তাক্ত করে। পরে সেখানে দায়িত্বরত সাংবাদিক ও পুলিশ সদস্যরা কনস্টেবল আমিরুল ইসলাম পারভেজকে অচেতন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বিক্ষোভকারীদের হামলায় দায়িত্বপালনরত শতাধিক পুলিশ সদস্য ও সাংবাদিক গুরুতর আহত হন। পুলিশের রাবার বুলেট ও টিয়ার শেলে বিএনপির শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন দলটির সিনিয়র নেতারা। আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতাল ও পঙ্গু হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সংঘর্ষের ঘটনায় শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সহস্রাধিক বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়।

সন্ধ্যায় আহত পুলিশ সদস্যদের দেখতে গিয়ে সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপি পরিকল্পনা করে এই হামলা চালিয়েছে। পুলিশ অনেক ধৈর্য্যরে পরিচয় দিয়েছে। যখন জানমালের ওপর হামলা চালিয়েছে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা, তখন পুলিশ তো আর বসে থাকতে পারে না। 

তিনি বলেন, পুলিশ সদস্য আমিরুল ইসলাম পারভেজকে যেভাবে নৃশংসভাবে কুপিয়ে, পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে তা আমাদের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে নিহত আমিরুল ইসলাম পারভেজ ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) বিভাগে দায়িত্বরত ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার দৌলতপুর থানার চরকাটরী গ্রামে। তার বাবার নাম সেকান্দার। 

অন্যদিকে সংঘর্ষের পর বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে হাজার হাজার নেতাকর্মীর তাণ্ডবে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এরপর দফায় দফায় হামলা, ভাংচুর অগ্নিসংযোগ চালায়। থেমে থেমে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা অলিগলিতে ঢুকে বিক্ষুব্ধভাবে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও আত্মরক্ষার্থে রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। এ সময় বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেটে আহত হন। আহতদের ঢাকা মেডিকেলসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। 

রাজধানীতে সমাবেশকে কেন্দ্র করে দুষ্কৃতকারীদের হামলায় বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ২৫ জন সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর বলে সংস্থাটির দাবি। 

বিকালে রাজধানীর কাকরাইল, মগবাজার, দৈনিক বাংলার মোড়, সেগুনবাগিচা, ইস্কাটন সচিব নিবাসের সামনে এবং রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের ভেতরে বাস, পিকআপ ভ্যান, মাইক্রো, অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস ও মোটরসাইকেলসহ অন্তত ৬৯টি যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

যানবাহন ও বিভিন্ন স্থানে আগুন: সংঘর্ষ চলাকালে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পুলিশের গাড়ি, বাস, পিকআপ ভ্যান, অ্যাম্বুলেন্স, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বেলা ১১টা ২০ মিনিটে রমনা পার্কের এনএসআই ব্যারাকের সামনে বৈশাখী পরিবহনে আগুন, দুপুর সাড়ে ১২টায় কাকরাইল চার্চের সামনে গাজীপুর পরিবহন ভাংচুর, ১টা ২০ মিনিটে কাকরাইল আইডিবি ভবনের সামনে ২টি গাড়িতে আগুন, ১টা ২৫ মিনিটে কাকরাইল জাজেস কমপ্লেক্সের সামনে পুলিশ বক্সে আগুন, ২টা ১০ মিনিটে কাকরাইল মোড় পুলিশ বক্সে আগুন, ২টা ৫০ মিনিটে আইডিবি ভবনের নিচে ২ গাড়িতে আগুন, ৩টায় বিজয় নগর মোড়ে ১টি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়েছে। বিজয়নগর বধির হাইস্কুলের সামনে পুলিশের ডাবল কেবিন গাড়িতে আগুন, শান্তিনগর মোড়ে ৩টা ১৫ মিনিটে ৪টি দোকান ভাঙচুর ও দুটি দোকানে আগুন, ৩টা ১৫ মিনিটে শান্তিনগর পুলিশ বক্সে আগুন, ৩টা ১৫ মিনিটে পুলিশের ৭টি মোটরসাইকেলে আগুন, ৩টা ১৫ মিনিটে শান্তিনগর মোড়ে ১টি কন্টেইনারে আগুন, ৩টা ২০ মিনিটে ফকিরাপুল পুলিশ বক্সে আগুন, সাড়ে ৩টায় রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে পার্কিং এরিয়ায় ৩টি অ্যাম্বুলেন্স, ৩টি জিপ, একটি আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সসহ ১৬টি মোটরসাইকেলে আগুন। একই সময়ে আরও ৯টি মোটরসাইকেলে আগুন ও পুলিশের ৭টি মোটরসাইকেলে আগুন, ৩টা ৪০ মিনিটে মালিবাগ মোড়ে পুলিশ বক্সে আগুন, ৩টা ৪৫ মিনিটে সিটি করপোরেশনের একটি ময়লার গাড়িতে আগুন, ৩টা ৫০ মিনিটে রাজারবাগ চাদমারিবাট মোড় মির্জা আব্বাসের বাড়ির সামনে ১০টি ভ্যান ও রিকশায় আগুন, ৩টা ৫৫ মিনিটে মৌচাক পুলিশ বক্সে আগুন, ৪টায় পাউনিয়া রোডে বিভাগীয় কমিশনার অফিসের বিপরীতে একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন, সেগুনবাগিচায় ৪টা ৫ মিনিটে একটি মোটরসাইকেলে আগুন, ৪টা ২০ মিনিটে রাজারবাগ ২ নম্বর গেটে আফিয়া ফার্মেসির সামনে একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন, ৪টা ২০ মিনিটে রাজারবাগ পুলিশ বক্সে ভাঙচুর, ৪টা ২৫ মিনিটে রাজারবাগ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পাশে একটি গাড়িতে আগুন, সাড়ে ৪টায় কমলাপুর রেলস্টেশনের সামনে শাহজাহানপুর থানা পুলিশের টহল গাড়িতে আগুন, সাড়ে ৪টায় কমলাপুর ট্রাফিক পুলিশ বক্সে আগুন, ৪টা ৪০ মিনিটে মৌচাক ফ্লাইওভারে বলাকা পরিবহনে আগুন, ৫টায় শাহজাহানপুর খলিল ফার্নিচারের সামনে একটি দোতলা বিআরটিসি বাসে আগুন, ৫টা ২৬ মিনিটে কাকরাইল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের সামনে আছিয়া পরিবহনে আগুন, সাড়ে ৫টায় রাজারবাগ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ভাঙচুর, সন্ধ্যা ৫টা ৩৫ মিনিটে দৈনিক বাংলার মোড়ে ফুটপাথের খুপরি দোকানে আগুন, ৫টা ৩৫ মিনিটে খিদমাহ হাসপাতালের সামনে মিডল্যান্ড পরিবহনে আগুন, ৫টা ৩৫ মিনিটে পুলিশ কনভেনশন হাসপাতালের সামনে বসুমতি বাসে আগুন, ৫টা ৪০ মিনিটে কমলাপুর বটতলা এশিয়া ও এস আলম পরিবহনের বাসে আগুন, রাত ৯টা ৪০ মিনিটে কালশীতে ট্রাস্ট পরিবহন বাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। 

ফায়ার সার্ভিসের ডিউটি অফিসার রাশেদ বিন খালিদ জানান, বিকালে মৌচাক ফ্লাইওভারে বলাকা বাসে ও কমলাপুরে বিআরটিসি বাসে আগুনের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে আগুনে বাস দুটি সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। বিকাল ৫টায় শাহজাহানপুর ফ্লাইওভারের নিচে অগ্নিনির্বাপণ শেষে ফেরত যাওয়ার পথে ফায়ার সার্ভিসের একটি পানিবাহী গাড়ি ভাঙচুর করে আগুন দেয় উচ্ছৃঙ্খল জনতা। তারা অগ্নিনির্বাপণ কর্মীদের মারধর করে। এ সময় ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা এবং একজন ড্রাইভার আহত হন। তারা হলেন খিলগাঁও ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আরিফুল ইসলাম এবং একই স্টেশনের ড্রাইভার শরিফুল ইসলাম। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তারা স্টেশনে ফেরত গিয়েছেন। তিনি বলেন, ২২টি আগুনের ঘটনার সংবাদ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১২টি দুর্ঘটনায় আগুন নেভানোর কাজ করেছে ফায়ার সার্ভিস। বাকিগুলোতে কাজ করতে হয়নি।

ডিএমপির গণমাধ্যম শাখার উপ-কমিশনার মো. ফারুক হোসেন জানান, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স হাসপাতাল চত্বরে ঢুকে বিএনপি নেতাকর্মীরা গাড়ি ও মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দিয়েছে। এ সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।

যুবদল নেতার মৃত্যু : সংঘর্ষের পর সন্ধ্যায় রাজারবাগ কেন্দ্রীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শামীম মোল্লা নামে এক ব্যক্তি মারা যান। তিনি মুগদা থানা যুবদলের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের এক নম্বর ইউনিটের সভাপতি। তার বাড়ি ৭৭, পূর্ব মানিকনগর। শামীমের বাবা ইউসুফ মোল্লা পেশায় মুদি দোকানি। তিনি জানান, তার ছেলে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। সে ছেলে এক চিকিৎসকের গাড়িচালক। তার ছেলে কোনো রাজনীতি করে না। 

রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের পরিচালক ডিআইজি রেজাউল হায়দার বলেন, মৃতের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। যেহেতু তার মৃত্যু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে হয়েছে তাই লাশের ময়নাতদন্ত করা হবে।

সময়ের আলো/জিকে


Loading...
Loading...
রাজধানী- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: