টানা শ্রমিক অসন্তোষে তৈরি পোশাক শিল্পের কারখানায় কারখানায় এখন ঝুলছে বন্ধের নোটিস। গাজীপুর, আশুলিয়া এবং সাভার এলাকার প্রায় দুই শতাধিক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করেছেন মালিকরা। হামলা করার কারণে শ্রম আইনের ১৩(১) ধারার অনুযায়ী এসব কারখানা বন্ধ করা হয়। যতদিন বন্ধ থাকবে ততদিনের মজুরি পাবে না শ্রমিকরা। তবে কারখানা বন্ধ রাখলেও মজুরি না দেওয়ার ঘোষণাকে অমানবিক হিসাবে উল্লেখ করে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে শিল্প মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা। অন্যদিকে যারা কারখানায় ভাঙচুর চালিয়েছে তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন শিল্প মালিকরা।
এদিকে তৈরি পোশাক খাতে চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে আজ জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে বিজিএমইএ। আজ দুপুর সাড়ে ১২টায় বিজিএমইএর নেতারা এই সংবাদ সম্মেলনে শিল্পের বর্তমান সার্বিক চিত্র তুলে ধরবেন এবং বন্ধ থাকা কারখানাগুলো কবে খোলা হবে সে বিষয়েও জানানো হবে বলে বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে বিগত কয়েক দিনের শ্রমিক অসন্তোষে নিহত হওয়া তিন শ্রমিক পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বিজিএমইএ। শনিবার রাজধানীর উত্তরাস্থ বিজিএমইএ ভবনে সংগঠনটির সভাপতি ফারুক হাসান নিহত শ্রমিক আঞ্জুয়ারা খাতুন, রাসেল হাওলাদার ও মো. ইমরানের শোকসন্তপ্ত পরিবারের কাছে আর্থিক সহায়তার চেকগুলো তুলে দেন। চেক হস্তান্তর অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএর সহ-সভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম, সহ-সভাপতি মো. নাসির উদ্দিন, পরিচালক ইনামুল হক খান (বাবলু) এবং পরিচালক হারুন অর রশীদ।
পোশাক খাতের বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিজিএমইএর সহ-সভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম সময়ের আলোকে বলেন, ‘শ্রমিক অসন্তোষ ও হামলার কারণে শিল্প এলাকায় অনেক কারখানা বন্ধ করা হয়েছে। যে কারখানাতে হামলা হবে, সেটিই বন্ধ ঘোষণা করা হবে। চলমান পরিস্থিতি এবং পোশাক শিল্পের রফতানির বিষয়সহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে রোববারের সংবাদ সম্মেলনে কথা বলব। এ ছাড়া যেসব কারখানা বন্ধ রয়েছে সেগুলো কবে খোলা হবে সে বিষয়টিও আমরা জানাব।’
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এ বিষয়ে সময়ের আলোকে বলেন, ‘যারা কারখানায় হামলা করছে, ভাঙচুর করছে তারা কেউ রেহাই পাবে না। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছি-যারা এই সহিংসতা করছে তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হোক। তা না হলে শিল্পে অস্থিরতা থামবে না।’
অবশ্য শ্রমিক নেতা তৌহিদুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, ‘যারা শিল্পে হামলা করছে তাদের শাস্তি আমরাও দাবি করছি। কারণ আমরা মনে করি সাধারণ শ্রমিকরা এই হামলা-ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত নয়। কিছু নামধারী শ্রমিক সংগঠনের নেতারা ভেতরে ভেতরে এই সহিংসতায় ইন্ধন যোগাচ্ছে। যারা এগুলো করছে তারা দেশের শিল্পের ক্ষতি করার জন্য করছে। তবে আমি শিল্প মালিকদের প্রতি আহ্বান জানাব-ওইসব গুটিকয়েক লোকের ষড়যন্ত্রের কারণে সাধারণ শ্রমিকদের যেন কঠোর শাস্তি দেওয়া না হয়। মালিকরা ১৩ এর (১) ধারা মতে কারখানা বন্ধ করলেও যেন শ্রমিকদের বেতন দিয়ে দেন। বেতন বন্ধ করা অমানবিক কাজ হবে। কারণ শ্রমিকরা কত টাকা আর মজুরি পায়। এখান থেকে যদি এক সপ্তাহ বা দশ দিনের বেতন চলেই যায় তা হলে কীভাবে চলবে শ্রমিকরা।
গাজীপুরে ১২৩টি কারখানায় ভাঙচুর : আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, শিল্প পুলিশের ডিআইজি মো. জাকির হোসেন খান জানান, গার্মেন্টস সেক্টরে শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোকে কেন্দ্র করে গাজীপুরে শ্রমিক অসন্তোষ চলছে। আমাদের কাছে তথ্য আছে ১২৩টি কারখানায় কম-বেশি ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালিয়েছে। শিল্প পুলিশ, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ, র্যাব, জেলা পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবাই আমরা এ পর্যন্ত ৮৮ জনকে গ্রেফতার করেছি এবং বিভিন্ন থানায় ২২টি মামলা হয়েছে। শনিবার দুপুর ১২টার দিকে তিনি গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ীতে শ্রমিকদের আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত কারখানা তুসুকা গার্মেন্টস পরিদর্শনে এসে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। তিনি জানান, গাজীপুর কোনাবাড়ী যেসব কারখানা বন্ধ আছে মালিক কর্তৃপক্ষ যাতে কারখানা চালু রাখেন আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলছি, তারা দ্রুতই উৎপাদনে যাবে। এ সময় গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার সারোয়ার আলমসহ শিল্প পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কারখানা পরিদর্শনের সময় উপস্থিত ছিলেন।
আশুলিয়ায় শতাধিক কারখানা বন্ধ ঘোষণা : সাভার প্রতিনিধি জানান, সাভারের আশুলিয়ায় পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও কারখানা ভাঙচুরের ঘটনায় শতাধিক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। এদিকে যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কারখানাগুলোর সামনেসহ বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। শনিবার সকাল ৮টার দিকে আশুলিয়ার জামগড়া, ছয়তলা, বেরণ ও নরসিংহপুর এলাকায় গিয়ে কারখানাগুলোর সামনে অনির্দিষ্টকালের বন্ধের নোটিস দেখা গেছে। এ সময় অনেক কারখানার ফটকের সামনে কিছু শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে এসে বন্ধের নোটিস দেখে ফিরে যায়।
শ্রমিক আন্দোলন বিএনপির স্টান্টবাজি, শাজাহান খান : মজুরি বাড়ানোর পরও পোশাক শ্রমিকরা যে আন্দোলন করছেন তাকে বিএনপির রাজনৈতিক স্টান্টবাজি বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক মন্ত্রী ও গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের আহ্বায়ক শাজাহান খান। গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন তিনি। শাজাহান খান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তবুও বিএনপির প্ররোচনায় কতিপয় ব্যক্তি ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে। তারা পোশাক সেক্টরকে ধ্বংসের চেষ্টায় লিপ্ত। তারা নাশকতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। হরতাল-অবরোধে ব্যর্থ হয়ে এখন সাধারণ শ্রমিকদের ভুল বুঝিয়ে অসৎ উদ্দেশ্য সফল করার চেষ্টা করছে। শ্রমিকরা যেন বিএনপির স্টান্টবাজি থেকে সরে আসেন।
২৫ হাজার টাকা মজুরি দাবি : গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে শ্রমিক হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করা এবং সাড়ে ১২ হাজার টাকা মজুরি প্রত্যাখ্যান করে ২৫ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে গতকাল দেশব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ ওএসকে গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশন। মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন দমন করার জন্য রাষ্ট্রীয় বাহিনী গুলি চালিয়ে এবং মালিকের ভাড়াটে সন্ত্রাসী বাহিনী হামলা চালিয়ে গার্মেন্টস শ্রমিকদের হত্যা করে। এই হত্যায় জড়িত পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা এবং গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য ২৫ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণের দাবিতে সব গার্মেন্টস শিল্পাঞ্চলে এই বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সময়ের আলো/আরএস/