হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হাই-সিকিউরিটি এলাকায় তিন মাস আগে গাড়িচাপায় মৃত্যু ঘটে বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রকৌশল বিভাগের সাদ্দাম হোসেনের। উড়োজাহাজের তেলবাহী পদ্মা অয়েলের গাড়ি তাকে চাপা দেয়। বিষয়টি নিয়ে তখন কোন আলোচনার জন্ম না দিলেও সম্প্রতি ফাঁস হওয়া সিসি ফুটেজে দেখে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন এবং এটা হত্যাকাণ্ড হতে পারে বলে অভিযোগ করেছেন। পাশাপাশি এই ঘটনায় হওয়া মামলায় নিহত সাদ্দামের পরিবারের কেউ বাদী না হয়ে পুলিশ বাদী হওয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন তারা। তবে ভয়ে ও আতঙ্কে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি নন।
গত ১৬ আগস্ট সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে শাহজালাল বিমানবন্দরে কর্তব্যরত ছিলেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ডিউটিরত ট্রাফিক হেলপার মো. সাদ্দাম হোসেন। এসময় পদ্মাওয়েলের গাড়ি তাকে চাপা দিলে তিনি মারা যান। ঘটনার পরদিন বিমানবন্দর থানায় সড়ক দুর্ঘটনায় গাড়ির চালকসহ তিনজনকে আসামি করে একটি মামলা করেন পুলিশের এসআই এসআই আল-আমিন কাউছার অপু।
মামলায় পদ্মা ওয়েলের গাড়ির চালক মো. ইউনুস (৩২), ও দুই সহকারী মোঃ শাহাদাৎ হোসেন দেওয়ান (২৬) এবং মোঃ ইয়াসিন মোল্লা (২২)কে আসামী করা হয়। ওইসময়ে এই তিনজনকে আটক করা হলেও বর্তমানে তারা জামিনে মুক্ত বলে জানা গেছে।
মামলার এজাহার বাদী এসআই আলামীন বলেন, গত ১৬ অগাস্ট সন্ধ্যা ৭ টা ১০ মিনিটের দিকে শাহাজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে এপ্রোন এলাকার ৭নং বে এর সামনের রাস্তার উপর পদ্মা অয়েল এর একটি তেলবাহী গাড়ী ভিকটিম সাদ্দামকে চাপা দিয়ে গুরুত্বর আহত করলে বিমান এয়ারলাইন্সের লোকজন তাকে দ্রুত উত্তরা উইমেন্স মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উপস্থিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, পদ্মা অয়েল এর একটি তেলবাহী গাড়ী দ্রুত ও বেপরোয়া গতিতে চালিয়ে সাদ্দামকে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করে এবং ভিকটিম মৃত্যুবরণ করে। চালক আসামি মো. ইউনুস তার দুই সহকারী ও দুই সহকারী মো. শাহাদাৎ হোসেন দেওয়ান এবং মো. ইয়াসিন মোল্লার সহায়তা দ্রুত ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ী চালিয়ে ভিকটিমের মৃত্যু ঘটিয়ে ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের ৯৮/৯৯/১০৫ ধারার অপরাধ করেছে। আমি মৃতের স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করে তাকে থানায় এসে উক্ত বিষয়ে এজাহার দায়ের করার জন্য অনুরোধ করি। তিনি বিভিন্ন প্রথা রীতিনীতির অজুহাতে এজাহার দাখিল না করায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সহিত আলাপ আলোচনা করে এজাহার দায়ের করতে বিলম্ব হয়।
তবে মামলার এজাহারে সাদ্দামের যে মোবাইল নাম্বার-০১৯৬৪৫১২৪২৩ দেয়া হয়েছে তা অন্য কারো বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই নাম্বারে ফোন দিলে বিমানবন্দর এলাকার জনৈক চা বিক্রেতা রুবেল তা রিসিভ করে মোবাইল নাম্বারটি নিজের বলে দাবি করেন।
ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে, বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে বে-৭ নম্বর এলাকায় ওইদিন একটি ধীর গতির গাড়ি একজন দণ্ডায়মান ব্যক্তির উপর দিয়ে চলে গেছে। গাড়িটি ওই ব্যক্তিকে ধাক্কা দিয়ে ব্রেক না করে পুরো তার উপর দিয়ে চালিয়ে কিছুদূর গিয়ে থামে। সাথে সাথেই গাড়ি চালক গাড়ি থেকে নেমে কিছু দুরে থাকা একজনের সাথে কথা বলেন। এরপর দুজনেই গাড়ির দিকে এগিয়ে যান। সিসি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলে আসায় এ নিয়ে নিহত সাদ্দাম হোসেনের সহকর্মীদের মাঝে যেমন ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে তেমনি তাদের জীবন নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
তাদের দাবী, বিমানবন্দরে চলমান গাড়ির গতিবেগ ১৫ কিলোমিটারের উপর হওয়ার কথা না। এই গতিতে কোন গাড়িতে এরকম দুর্ঘটনা সম্ভব না। পদ্মা ওয়েলের যানবাহন কখনোই গতিসীমা মেনে গাড়ি চালায় না বলেও অভিযোগ করেন তারা।
কয়েকজন সহকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালানের একটি বড় সিন্ডিকেট রয়েছে। তাদের সাথে সাদ্দামের একটি দীর্ঘদিনের ঝামেলা ছিলো। সেই কারণেই তাকে হত্যা করা হতে পারে। এরকম একটি ঘটনার পর সাদ্দামের পরিবার থেকে কাউকে মামলার বাদী না করে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করা হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও পদ্মা অয়েল কোম্পানির মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবী করেন তারা।
মামলার বাদী এসআই আল-আমিন কাউছার অপু সময়ের আলোকে বলেন, এ ঘটনায় ৩ জনকে আসামি করে সড়ক দুর্ঘটনা মামলা হয়। আসামিদের গ্রেফতার করে জেলেও পাঠানো হয়। এটা হত্যা কিনা সড়ক দুর্ঘটনা তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে।
পরিবারের কেউ বাদী না হয়ে পুলিশ বাদী হলো কেন জানতে চাইলে এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বিমান বন্দর থানার আহসান উল্লাহ সময়ের আলোকে বলেন, আমি ওইভাবে বলতে পারবো না, মামলা রজু হবার পর তদন্ত করছি।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে এটা হত্যাকাণ্ড বলে মনে হয়নি, কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে পাওয়া গেলে আমারা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবো।
সময়ের আলো/আরআই