অসহায় ও দরিদ্র মুমিনের মর্যাদা

নিজামুল ইসলাম নিজাম

ইসলামের আলো

মানুষ মাত্রই আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান। পার্থিব জীবনে সব মানুষই আল্লাহর নেয়ামত ভোগ করবে। তবে পরকালে কেবল তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে,

2023-11-18T00:17:40+00:00
2023-11-18T00:17:40+00:00
 
  বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
ইসলামের আলো
অসহায় ও দরিদ্র মুমিনের মর্যাদা
নিজামুল ইসলাম নিজাম
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৩, ১২:১৭ এএম 
অসহায় ও দরিদ্র মুমিনের মর্যাদা
মানুষ মাত্রই আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান। পার্থিব জীবনে সব মানুষই আল্লাহর নেয়ামত ভোগ করবে। তবে পরকালে কেবল তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে ও নেক আমল করবে। পৃথিবীতে আল্লাহ মানুষকে ধনী-গরিব দুই প্রকারে ভাগ করেছেন। দরিদ্রতা পার্থিব জীবনে কষ্টের কারণ হলেও পরকালের জীবনে আনন্দের কারণ হবে। পক্ষান্তরে ধন-সম্পদ পার্থিব জীবনের আনন্দের কারণ হলেও অনেকাংশে পরকালের জীবনে কষ্টের কারণ। ধন-সম্পদের মাধ্যমে দুনিয়াতে মানুষের মর্যাদার তারতম্য করা হলেও পরকালে আল্লাহ তায়ালা ধন-সম্পদের মাধ্যমে মানুষের মর্যাদার তারতম্য করবেন না। বরং সেদিন আল্লাহ তায়ালার কাছে মানুষের মর্যাদার তারতম্যের একমাত্র মাপকাঠি হবে তাকওয়া তথা খোদাভীতি ও বান্দার নেক আমলের মাধ্যমে। দুনিয়াতে ধনী ও গরিবদের মর্যাদার তারতম্যের কারণ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-‘(আল্লাহ দুনিয়াতে) একে অন্যের ওপর মর্যাদা সমুন্নত করেছেন, যাতে তোমাদের এ বিষয়ে পরীক্ষা করেন।’ (সুরা আনআম : ১৬৫)

দরিদ্রতার কারণে কোনো ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করলে আল্লাহ তার মর্যাদা ধনীদের থেকেও অনেক বাড়িয়ে দেবেন। এ সম্পর্কে হজরত আনাস (রা.) হতে একটি ঘটনা বর্ণিত আছে। একদিন এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি দরিদ্রদের পক্ষ থেকে আপনার কাছে একটি কথা পৌঁছে দেওয়ার জন্য এসেছি। দরিদ্ররা বলে যে, সম্পদশালী ব্যক্তিরা তাদের ধনদৌলতের দ্বারা আমাদের থেকে অনেক অগ্রগামী। কারণ তাদের ধনদৌলত থাকার কারণে তারা হজ, দান প্রভৃতি ইবাদত করে আল্লাহর দরবারে অনেক উচ্চ মর্যাদা অর্জন করেছে। আর আমরা তো এসব থেকে একেবারেই বঞ্চিত। রাসুল (সা.) বললেন, তুমি দরিদ্রদের কাছে আমার এই উপদেশ বাণীটি পৌঁছে দিয়ো-যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ করো এবং আল্লাহ তায়ালার কাছে এই অবস্থার বিনিময়ে সওয়াবের আশা রাখো, তা হলে তোমাদের জন্য বিশেষ পুরস্কার রয়েছে। যাতে সম্পদশালীদের কোনো অংশ নেই। আর সেই পুরস্কার হচ্ছেÑ১. জান্নাতে লাল ইয়াকুত পাথরের তৈরি অট্টালিকা হবে। একমাত্র দরিদ্র নবী, দরিদ্র শহিদ এবং দরিদ্র মুমিন ব্যতীত অন্য কেউ এতে প্রবেশ করতে পারবে না। ২. দরিদ্র মুমিন ব্যক্তিরা সম্পদশালী ব্যক্তিদের হতে পাঁচশ বছর পূর্বে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (তাম্বিহুল গাফেলিন : ৯৯ পৃ.)

প্রত্যেক মুসলমানের উচিত নিজে সম্পদশালী হলেও যেন দুর্বল, অসহায়, দরিদ্র মানুষদের ভালোবাসে। কারণ দরিদ্রদের ভালোবাসার মধ্যে বিশ্ব প্রতিপালকের প্রিয়জনের ভালোবাসা নিহিত রয়েছে। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সা.)-কে দরিদ্রদের ভালোবাসার ও তাদের সাহচর্য গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ সম্পর্কে একটি ঘটনা বর্ণিত আছে, একদা উয়াইনা বিন হোসাইন ফাযারীসহ কয়েকজন স্বগোত্রীয় প্রধান রাসুল (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে কিছু দরিদ্র-অসহায় সাহাবিকে ময়লাযুক্ত কাপড় পরিহিত অবস্থায় দেখে রাসুল (সা.)-কে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমাদের মর্যাদা উচ্চ পর্যায়ের। সুতরাং আমাদের আগমনের সময় আপনি তাদের আমাদের সম্মানার্থে সরিয়ে দেবেন। 

এ বিষয়ে রাসুল (সা.)-এর মনে চিন্তার উদ্রেক হলে আল্লাহ তায়ালা কুরআনের আয়াত নাজিল করে রাসুল (সা.)-কে সতর্ক করে দেন। তিনি যেন দুর্বল, অসহায়, দরিদ্র, গরিব সাহাবিদের তার মজলিস থেকে সরিয়ে না দেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলে-‘(হে রাসুল!) আপনি তাদের বিতাড়িত করবেন না, যারা সকাল-বিকাল স্বীয় পালনকর্তার ইবাদত করে, তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে। তাদের হিসাব বিন্দুমাত্রও আপনার দায়িত্বে নয় এবং আপনার হিসাব বিন্দুমাত্রও তাদের দায়িত্বে নয় যে, আপনি তাদের বিতাড়িত করবেন। নতুবা আপনি অবিচারকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন।’ (সুরা আনয়াম : ৫২)

আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে, যাদের দেখতে মনে হয় গরিব, দুর্বল, অসহায় কিন্তু তাদের মর্যাদা আল্লাহর কাছে এতই বেশি যে, তারা কখনো কোনো বিষয়ে শপথ করলে আল্লাহ সেটা পূর্ণ করে দেয়। এ সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, এমন কিছু মানুষ আছে যাদের মাথার চুল উশকো-খুশকো, পা দুটো ধূলি-ধূসরিত, তাদের মানুষের দরজা থেকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়; কিন্তু তারা যদি আল্লাহর নামে কোনো শপথ করে, তা হলে আল্লাহ তায়ালা তাদের শপথ অবশ্যই পরিপূর্ণ করেন।’ (মুসলিম : ৬৫৭৬)

ধনীদের মধ্যে যারা জান্নাতে যাবে, তাদের জান্নাতে প্রবেশ করার প্রায় পাঁচশ বছর আগে গরিব, দুর্বল, অসহায় ব্যক্তিরা জান্নাতে যাবে। এটা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে গরিবদের প্রতি বিশেষ এক রহমত যা থেকে ধনী ও সম্পদশালী জান্নাতিরা বঞ্চিত থাকবে। এ সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমি মিরাজের রজনিতে জান্নাতের দরজায় দাঁড়ালাম। দেখলাম জান্নাতে প্রবেশকারী অধিকাংশ ব্যক্তিই হচ্ছে নিঃস্ব ও দরিদ্র। সম্পদশালী আর অর্থশালী ব্যক্তিদের আটকে রাখা হয়েছে। এখনও জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি তাদের দেওয়া হয়নি’ (বুখারি : ৫১৯৬)। গরিব, দুর্বল, অসহায় ব্যক্তিদের আগে আগে জান্নাতে যাওয়া দেখে, ধন-সম্পদশীল জান্নাতি ব্যক্তিরা সেদিন খুব আফসোস করে বলবে, দুনিয়াতে যদি আমি গরিব হতাম তা হলে আজকে আমিও ধনীদের থেকে পাঁচশ বছর আগেই জান্নাতে যেতে পারতাম। 
ধন-সম্পদশীল জান্নাতি ব্যক্তিদের যদি এমন আক্ষেপ হয়, তা হলে সেদিন ধনবান সম্পদশীল জাহান্নামি ব্যক্তিদের কেমন আফসোস হবে? এ জন্য গরিব, দুর্বল, অসহায় ব্যক্তিদের ভালোবাসার অর্থই হচ্ছে, রাসুল (সা.)-কে ভালোবাসা। কেননা এ ব্যাপারে রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ হচ্ছে, ‘তোমরা আমাকে নিঃস্ব দুর্বলদের মধ্যে তালাশ করো। কারণ তোমরা তোমাদের দুর্বলদের কারণেই সাহায্য ও রিজিকপ্রাপ্ত হও’ (আবু দাউদ : ২৫৯৪)। সুতরাং আমাদের উচিত হলো গরিব, দুর্বল, অসহায় ও নিঃস্ব ব্যক্তিদের কখনো অবহেলার চোখে না দেখা। বরং তাদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া। আল্লাহ তওফিক দিন।

সময়ের আলো/আরএস/ 



Loading...
Loading...
ইসলামের আলো- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: