যাকাত শব্দের অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া বা পবিত্র করা। যাকাত ইসলামের একটি অন্যতম স্তম্ভ এবং ইসলামি অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য চালিকাশক্তি। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ৩২ বার যাকাতের কথা উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে ২৮ বার নামাজের সঙ্গে যাকাতের কথা বলেছেন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনের বহু আগে থেকেই মহান আল্লাহ যাকাতের নির্দেশ দিয়েছেন।
পবিত্র কুরআনের সুরা মারিয়ামের ৫৪ ও ৫৫ নম্বর আয়াতে হজরত ইসমাইল (আ.)-এর কথা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন, ‘তিনি তাঁর পরিবারবর্গকে নামাজ ও যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিতেন এবং তিনি তাঁর পালনকর্তার কাছে পছন্দনীয় ছিলেন।’ পবিত্র কুরআনের সুরা আম্বিয়ার ৭৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা হজরত ইসহাক (আ.) ও হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর উদ্দেশে বলেন, ‘আমি তাঁদের প্রতি ওহী নাজিল করলাম সৎকর্ম করার, নামাজ কায়েম করার এবং যাকাত দান করার।’ সুরা মারিয়ামের ৩১ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে, তিনি হজরত ইসা (আ.)-কে বলেন, ‘তিনি (মহান আল্লাহ) আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যতদিন জীবিত থাকি, ততদিন নামাজ ও যাকাত আদায় করতে।’ সামর্থ্যবান মুসলমানদের যাকাত না দেওয়া আল্লাহর আদেশকে অমান্য করার শামিল। ইমাম আয-যাহাবী (রহ.) তার ‘আল কাবায়ের’ গ্রন্থে যাকাত না দেওয়াকে পঞ্চম কবিরা গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বাংলাদেশে যাকাতের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার শতকরা ৯১.০৪ ভাগ মুসলমান। বিগত দশকগুলোতে বাংলাদেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সামর্থ্যবান মুসলমানের সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২ সালের প্রথম কোয়ার্টারে দেশের ব্যাংকগুলোতে মিলিয়নিয়ার অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ৫৯৭টি। এই অ্যাকাউন্টগুলোতে সঞ্চয়ের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা (২০২২ সালের ২২ জুন দি বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মাত্র তিন মাসে মিলিয়নিয়ার অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬২১টি। শতকরা আড়াই টাকা হিসেবে শুধু মিলিয়নিয়ার অ্যাকাউন্টে সঞ্চিত অর্থের যাকাত আসবে ১৬ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা। অনেকে প্রশ্ন করেন, ইনকাম ট্যাক্স দিলে যাকাত কেন দিতে হবে? অথচ ইনকাম ট্যাক্সের সঙ্গে যাকাতের কোনো সম্পর্ক নেই। এ ব্যাপারে পরবর্তী কোনো এক সময়ে লেখার ইচ্ছে আছে।
এমফিল করার সময় আমার গবেষণার বিষয় ছিল ‘দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে যাকাতের ভূমিকা’। এই গবেষণার সময় আমি দেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যারা স্বল্প পরিসরে যাকাত নিয়ে কাজ করছেন তাদের সঙ্গে কথা বলি। একই সঙ্গে ইতিপূর্বে যারা যাকাত নিয়ে গবেষণা করেছেন তাদের গবেষণাগুলো পর্যালোচনা করি। এই গবেষকদের মধ্যে ছিলেন এম কবির হাসান (প্রফেসর নিউ অরলিন্স বিশ^বিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র), প্রফেসর শাহ মুহাম্মাদ হাবিবুর রহমান এবং মোহাম্মদ আবদুল লতিফ। এই তিন গবেষকই বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে বিভিন্ন খাত থেকে সম্ভাব্য যাকাত সংগ্রহের পরিমাণ হিসাব করেছিলেন।
মোহাম্মদ আবদুল লতিফ ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে বাংলাদেশে সম্ভাব্য যাকাতের হিসাব করেছিলেন, যা ছিল ২ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে শাহ মোহাম্মদ হাবিবুর রহমানের হিসাবে সম্ভাব্য যাকাতের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। প্রফেসর এম কবির হাসান ১৯৯৭-৯৮ সাল থেকে ২০০৫-০৬ সাল পর্যন্ত যাকাতের আটটি উৎস যথা-রেমিট্যান্স, খনিজসম্পদ, ব্যবসায়িক পণ্য, ব্যাংক সঞ্চয়, মৎস্য খাত, কৃষি খাত, শেয়ার, পশুসম্পদ নিয়ে গবেষণা করেন। তার হিসাব অনুযায়ী ২০০৫-০৬ সালে সম্ভাব্য যাকাত ছিল ১২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা।
গবেষণার অংশ হিসেবে আমি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশে যাকাতের মাত্র পাঁচটি খাত চিহ্নিত করে হিসাব করি। খাতগুলো ছিল-কৃষি উৎপাদন, খনিজসম্পদ, পশুসম্পদ, মৎস্যসম্পদ ও ব্যাংক সঞ্চয়। আমি দেখেছি, এই পাঁচটি খাত থেকেই সঠিক যাকাত আদায় করলে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা পাওয়া সম্ভব। এর সঙ্গে ব্যবসায়িক পণ্য, শেয়ার, রেমিট্যান্স যোগ করলে যাকাত অর্থের পরিমাণ আরও অনেক বেড়ে যাবে নিঃসন্দেহে।
গত ১১ ও ১২ মার্চ ২০২৩ তারিখে সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট কর্তৃক গুলশান আলোকি কমিউনিটি সেন্টারে ১১তম যাকাত মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এবারের যাকাত মেলার প্রতিপাদ্য ছিল ‘মেকিং এ ডিফারেন্ট উইথ যাকাত’। যাকাত মেলা উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা সামর্থ্যবান মুসলমানদের যাকাত প্রদানে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি সঠিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বক্তারা মনে করেন, যথাযথ যাকাত সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষার পাশাপাশি ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূরীকরণ ও এসডিজি অর্জনে সহায়ক হবে। সেমিনারে প্রফেসর এম কবির হাসানের গবেষণা প্রবন্ধ ‘এস্টিমেটিং দি পটেনশিয়াল অব যাকাত কালেকশন ইন বাংলাদেশ ইউসিং সেকেন্ডারি সোর্স’ উপস্থাপন করা হয়। এই গবেষণা অনুযায়ী ২০২২ সালে বাংলাদেশে সম্ভাব্য যাকাত সংগ্রহের পরিমাণ হতো ৮৪ হাজার কোটি টাকা। (দি বিজনেস পোস্ট, ১২ মার্চ ২০২৩)
বাংলাদেশে যাকাতের প্রভূত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন গবেষণা, সঠিক পরিকল্পনা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। তবে সামর্থ্যবানদের যাকাত প্রদানে উদ্বুদ্ধকরণ অতটা সহজ নয়। বর্তমানে আমি ‘সায়েন্টিফিক ম্যানেজমেন্ট অব যাকাত ইন বাংলাদেশ : প্রসপেক্টাস অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস’ নিয়ে পিএইচডি করছি। গবেষণার অংশ হিসেবে আমি রাজধানী ঢাকার একটি অভিজাত এলাকা বেছে নিয়েছিলাম। বসবাসকারী সম্পদশালী লোকদের সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয়েছে বেশিরভাগ মানুষ যাকাতের ব্যাপারে সচেতন নন। অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষকে দেখেছি, তারা নামাজ, রোজা কিংবা হজের ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন হলেও যাকাত প্রদানের ব্যাপারে অনেকটাই উদাসীন। অনেকেই ঘোষণা দিয়ে যাকাতের শাড়ি, লুঙ্গি প্রদান করেন। এসব ক্ষেত্রে মানুষের ভিড়ে পদদলিত হয়ে অনেক মৃত্যুর খবর আমাদের জানা আছে। অনেকে বছরের বিভিন্ন সময় বিশেষ করে রমজান মাসে নিজ দরিদ্র আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীকে যাকাত দেন।
মসজিদ, মাদরাসায় যাকাত দেন যা অনেকটাই সঠিক নয় ও অপরিকল্পিত। তাই সচেতনতা বৃদ্ধি ও সামর্থ্যবানদের যাকাত প্রদানে উৎসাহিত করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে মনে হয়েছে। পাশাপাশি আরও অনেক চ্যালেঞ্জ আমি চিহ্নিত করেছি। পরবর্তী পর্বে তা আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
পিএইচডি গবেষক, বিইউপি