পুরুষ ও নারীর সমন্বয়ে মানবজাতি। আর নারী হচ্ছে মানবজাতির ভারসাম্যের প্রতীক। মানবসভ্যতার অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অন্ধকারে রেখে কোনো দিন মানবজাতির উন্নতি সম্ভব নয়। এ জন্য সমাজে নারীদের সুষম অধিকার প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। আর সেই সুষম অধিকার প্রতিষ্ঠার ধারণা থেকেই জন্ম নেয় নারীবাদী চেতনা।
ইসলামি সমাজব্যবস্থায় তা ইসলামি নারীবাদ নামে পরিচিত। আমাদের সমাজের নারীবাদীরা মূলত নিজেদের প্রাপ্য অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে কাজ করে। সহনশীল নারীবাদ তথা লিবারেল ফেমিনিজম ইসলামি নারীবাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। লিবারেল নারীবাদীদের উদ্দেশ্য হচ্ছে পিতা, পুত্র ও স্বামীকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু তারা মানবসমাজে পুরুষের অবস্থান এবং মর্যাদা অস্বীকার করে না। বাঙালি সমাজ ও ধর্মীয় মূল্যবোধ নারীদের বদ্ধঘরে কোণঠাসা করে রাখেনি। যদিও কিছু কিছু নারীবাদী ইসলামকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ইসলামি মূল্যবোধ অনুসারে বাড়ির বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের অনুমতি নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই অনুমতি নেওয়া শোষণ কিংবা পিতৃতান্ত্রিকতা নয়। এটি মূলত সম্মানের সঙ্গে নারীদের নিরাপত্তা বিধানের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। পারিবারিক প্রয়োজনে নারীকে বাড়ির বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। এ ছাড়া এটা প্রায়শই শুনতে পাওয়া যায়, ইসলামে সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে নারীদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। খুবই দুঃখের বিষয়, একবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এসেও নারীরা সম্পত্তি বণ্টনসহ বিভিন্ন জায়গায় তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মুসলিমপ্রধান দেশ হওয়ায় এবং পারিবারিক ও সামাজিক কার্যকলাপ ধর্মীয় রীতিতে সম্পন্ন হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানদের ধর্মীয় রীতিনীতিকে দোষারোপ করা যুক্তিসম্মত মনে হতে পারে। কিন্তু আসলেই কি ইসলাম নারীকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দেয়নি?
মুসলিম পারিবারিক আইন অনুসারে, একজন নারী তার পিতা-মাতার সম্পত্তির ওয়ারিশ হওয়ার পাশাপাশি তার স্বামী ও সন্তানের সম্পত্তির ভাগিদার। যেই মর্যাদা ইসলামি শরিয়াহ আইনের মাধ্যমে একজন নারীকে দেওয়া হয়েছে। তবুও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়, কেন ইসলাম ছেলেমেয়েকে পিতার সম্পত্তিতে সমান অধিকার দেয়নি। কেন পিতা-মাতার সম্পত্তিতে একজন ছেলে একজন মেয়ের দ্বিগুণ পায়। ইসলামি শরিয়াহ আইন অনুযায়ী, পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব শুধুই একজন ছেলের ওপর বর্তায়। এখানে সে স্ত্রীর সম্পত্তি ব্যবহার করতে পারবে না। আবার বিয়ের সময় মেয়েরা তাদের স্বামী কর্তৃক দেনমোহর পান। কিন্তু ইসলামে স্বামী কিংবা তার পরিবারকে কোনো উৎকোচ দেওয়ার বিধান নেই। সব দিক বিবেচনা করলে মেয়েদের মূলধন হ্রাস পায় না কিন্তু ছেলেদের মূলধন হ্রাস পায়।
ইসলামি বিধান অনুযায়ী মেয়েদের সম্পত্তির সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আমাদের ভূখণ্ডের প্রাচীন সমাজব্যবস্থা দায়ী। ইসলাম ইনসাফ বা ন্যায্য অধিকারে বিশ্বাসী। এখানে ইনসাফ হচ্ছে নারী ও পুরুষের মধ্যে সুষম বণ্টন। ধর্মীয় মূল্যবোধ নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে নয় বরং সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। প্রাক-ইসলামি যুগে বহু নারীরা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অনেক নারী সাহাবি পর্দার অন্তরালে থেকে পুরুষ সাহাবিদের হাদিস শিক্ষা দিতেন। এমনকি অনেক নারী যুদ্ধে পর্যন্ত অংশগ্রহণ করেছেন। হজরত আয়েশা (রা.) ও উম্মে সালমা (রা.) উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। উষ্ট্রের যুদ্ধে আয়েশা (রা.)-এর ভূমিকা ছিল সর্বাধিক। বাঙালি সমাজব্যবস্থা ও ইসলাম নারীকে উচ্চ মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। সর্বোপরি নারীবাদ ও পুরুষতন্ত্রের বাইরে গিয়ে উদার নৈতিকতা চর্চা করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। নারীবাদকে পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী না বানিয়ে ইসলাম ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সময়ের আলো/আরএস/