সুদ, মিথ্যা, মুনাফেকি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মন্দ কাজ। পৃথিবীতে মানুষের জীবনেও এসব অপকর্মের সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। অথচ ইহুদি জাতি ইতিহাসজুড়ে এসব অপকর্মের কারণেই পরিচিতি ও ঘৃণিত। কুরআনে তাদের অভিশপ্ত ও লাঞ্ছিত জাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সুদখোর ও ধনলিপ্সু জাতি হিসেবেও তাদের একটা পরিচয় রয়েছে। এ জাতি যুগ যুগ ধরে খোদাদ্রোহিতা, কুফরি ও তাদের খারাপ কর্মকা-ের জন্য মানুষের কাছে অত্যন্ত ঘৃণাভরে পরিচিতি পেয়ে এসেছে। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তারা মন্দ কাজ থেকে বিরত হয় না, যা তারা ইতিপূর্বে করেছে এবং তারা যা করে তা কতই না খারাপ’ (সুরা মায়েদা : ৭৯)। মূলত শুরু থেকেই ইহুদিরা চক্রান্তকারী ও বক্র স্বভাবের। নবী হজরত ইউসুফ (আ.)-কে কূপে নিক্ষেপ করে মিথ্যাচারের মাধ্যমে শুরু হয় তাদের ষড়যন্ত্রের ইতিহাস। হজরত মুসা (আ.)-এর সময় তাদের বক্রতা ও চক্রান্ত যেন পূর্ণতা পায়। এ জন্য তাদের প্রায় চল্লিশ বছর তিহ প্রান্তরে উদভ্রান্তের মতো ঘুরতে হয়। ইহুদি জাতি প্রায় দুই হাজার বছরের ইতিহাসে অনেক নবীকে হত্যা করে।
ইহুদিদের এসব পাপাচারের শাস্তি হিসেবে যুগে যুগে তাদের ওপর নেমে আসে লাঞ্ছনা ও অভিশাপ। খ্রিস্টপূর্ব ৫১৫ খ্রিস্টাব্দে ব্যাবিলনের বুখত নাসর বনি ইসরাইল তথা ইহুদিদের ওপর নিধনযজ্ঞ চালান। আল্লামা ইবনে কাসির (র.) লিখেছেন, ‘মহান আল্লাহ নবী আরমিয়াকে বনি ইসরাইলের মধ্যে প্রেরণ করেন। তখন তাদের পাপের মাত্রা, অপরাধ প্রবণতা চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। এমনকি বহু নবীকে তারা হত্যা করেছিল। তখন আল্লাহ বুখত নাসরের অন্তরে বনি ইসরাইলের ওপর হামলা করার ইচ্ছে জাগিয়ে দেন। তাই বুখত নাসর তাদের আক্রমণ করার উদ্যোগ নেন এবং জানান, আমি বনি ইসরাইলকে ধ্বংস করব; তাদের পাপের সমুচিত শাস্তি দেব’ (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)।
তারপর ইহুদিরা প্রতিশ্রুত শেষ নবীর আগমনের অপেক্ষায় ইয়াসরিব তথা মদিনায় এসে বসবাস শুরু করে এবং সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে প্রাধান্য বিস্তার করে। মদিনায় ইয়েমেন থেকে আগত আউস ও খাজরাজ নামক আরও দুটো আরব গোত্রের প্রাধান্য ছিল। এই দুই গোত্র একসময় নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। ইহুদি গোত্রগুলো এ সময় এদের সঙ্গে মিত্রতায় আবদ্ধ হয়। বনু কুরাইজা গোত্র আরব বনু আউসের সঙ্গে মিত্রতা করে মুসলামনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে উৎসাহী করেছিল। যে কারণে খন্দকের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। ৬২২ সালে নবীজি (সা.) মদিনায় হিজরত করেন। বিবাদমান পক্ষগুলোর মধ্যে ‘মদিনা সনদ’ নামক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। হিজরতের পর মক্কার কুরাইশদের সঙ্গে মদিনার মুসলিমদের মধ্যে কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
এ ছাড়াও মুসলিমদের সঙ্গে মদিনার ইহুদিদের মধ্যেও বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তীতে উভয়ের মধ্যে চুক্তি হয়। এই চুক্তি ভঙ্গ করে ইহুদিরা কুরাইশদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাদের ভুল বুঝিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বাধ্য করে। সেই যুদ্ধ ছিল খন্দকের। খন্দকের যুদ্ধের সময় কুরাইশ ও তাদের মিত্ররা মদিনা শহর অবরোধ করে। মদিনার চারপাশে পরিখা খুঁড়ে প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা নেয়। অবশেষে মুসলমানরা বিজয়ী হয়। যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার পর মুসলিমরা ইহুদিদের প্রতারণার কারণে তাদের গোত্রের ওপর অবরোধ করে। শেষ পর্যন্ত সাদ ইবনে মুয়াজ (রা.)-কে বিরোধ মীমাংসার জন্য উভয় পক্ষ থেকে বিচারক নিযুক্ত করা হয়। সাদ ইতিপূর্বে ইহুদি নেতা ও প-িত ছিলেন, পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন। সঙ্গত কারণে তাকে তাওরাত কিতাব অনুযায়ী ফয়সালার ভার দেওয়া হয়। বিচারে গোত্রের সব প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সদস্যকে হত্যা এবং নারী ও শিশুদের দাস হিসেবে বন্দি করার নির্দেশ দেন। দুঃখজনক হচ্ছে, এভাবেই ইহুদিরা আমাদের নবীজির যুগেও পাপাচার, মিথ্যাচার, ষড়যন্ত্র, সুদ ও মুনাফেকির মাধ্যমে মদিনায় নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনে। এমনকি অভিশপ্ত ইহুদিরা অসংখ্যবার নবীজি (সা.)-কে হত্যার ষড়যন্ত্রও করে। নবীজিকে বিষ মেশানো খাবার খাওয়ানো হয়। নবীজিকে জাদুগ্রস্ত করা হয়। মদিনায় তারা অনেক বড় বড় যুদ্ধাপরাধ করে। মদিনা রাষ্ট্রে সংবিধান মদিনা সংবিধান লঙ্ঘন করে অসংখ্যবার। আর এর শাস্তিস্বরূপ তাদের মদিনা থেকে বহিষ্কার করা হয়।
ইহুদিদের একটি অংশ বহু বছর আগে জার্মানিতে প্রবেশ করে। প্রাচীন যুগ থেকেই ইহুদিদের মূল কর্ম ছিল সুদের ব্যবসা। জার্মানিতেও তারা সুদের ব্যবসার গোড়াপত্তন করে। কালক্রমে জমি কিনে খাজনার বিনিময়ে জমি ভাড়া দেয়। উচ্চহারে খাজনা দিতে গিয়ে মানুষ গরিব হয়ে পড়ল। একসময় খাজনার প্রথার বিরুদ্ধে মানুষ আন্দোলন করে ইহুদিদের সব জমি দখল করে নেয়। ইহুদিরা কয়েক বছর বাদে শাসকদের প্রচুর উপঢৌকন এবং উৎকোচ দিয়ে আবারও ফিরে আসে। ততদিনে জার্মানে ইন্ডাস্ট্রি কলকারখানা দাঁড়িয়ে গেছে। মানুষ ইহুদিদের ঘৃণা করতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষের কাছাকাছি যাওয়া এবং একই সঙ্গে কলকারখানায় নিজেদের আধিপত্য তৈরি করতে তারা একটি কৌশল খুঁজতে থাকে। তখন ইহুদি দার্শনিক কার্ল মার্ক্সের মাধ্যমে মার্কসবাদ নামে একটি তত্ত্ব প্রচার করানো হয়। ট্রেড ইউনিয়ন বানানো হয়। ট্রেড ইউনিয়নের নামে প্রভাব খাটিয়ে ধ্বংস করা হয় জার্মান শিল্প কারখানা। মেইন ক্যাম্পে হিটলার এভাবেই বলেছেন মার্কসবাদ সম্পর্কে। হিটলার ইহুদি নিধনের চিন্তা করলেন এবং কার্যক্রম শুরু করলেন। হিটলার বলেছিলেন, আমি চেয়েছিলাম পুরো ইহুদি জাতিকে হত্যা করতে। জানা যায়, জার্মানির চ্যান্সেলর এডলফ হিটলারের নেতৃত্বে তার নাৎসি বাহিনী ৬০ লাখ ইহুদিকে হত্যা করেছিল। যা ওই সময়ের ইহুদির ৩৭ পার্সেন্ট প্রায়। ইতিহাসে এই ঘটনাটি হলোকাস্ট নামে পরিচিত। কারও কারও মতে এই হলোকাস্ট ইহুদিদের ওপর নির্মম ও হৃদয়বিদারক হত্যাযজ্ঞ চালানো হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। যা এতটাই বর্বরোচিত ছিল যে, ইহুদি জাতির অবুঝ শিশু ও নারী, প্রতিবন্ধী, বৃদ্ধ কিংবা অসুস্থ রোগীরা পর্যন্ত রেহাই পায়নি।
দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, শুরু থেকেই ইহুদি জাতির ইতিহাস অরাজকতা ও বর্বরতার ইতিহাস। যুদ্ধ, জিঘাংসা, ধ্বংসযজ্ঞ চালানো ও নিজেরা ধ্বংস হওয়া ছাড়া তাদের কোনো শান্তির ইতিহাস নেই। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সময় ফিলিস্তিনিরা বিভিন্ন দেশ থেকে ফিলিস্তিনে সমবেত হতে থাকে। হঠাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসা একটা জাতিগোষ্ঠী ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করে ইসরাইল নামক রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয়। ১৯৪৮ থেকে জায়নবাদী ইহুদিরা ফিলিস্তিন দখলের নামে অবিরাম মানুষ হত্যা করে চলছে। নারী-শিশু, সামরিক-বেসামরিক জনগণকে পাখির মতো বোমা ফেলে মারছে। সম্প্রতি অল্প কয়েক দিনেই হত্যা করেছে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। ভিটেমাটি ছাড়া করেছে প্রায় ১৫ লাখ মানুষকে। এমনকি শান্তি ও সন্ধির প্রস্তাব মেনে নিতেও তাদের অনীহা। পাপের প্রায়শ্চিত্ত সবাইকে করতে হবে। ইহুদিরা আজ যা করছে, এর শাস্তি আজ হোক বা কাল, তাদের তা ভোগ করতেই হবে।
সময়ের আলো/জেডআই