জলবায়ু সম্মেলন ব্যর্থ হওয়া চলবে না

সম্পাদকীয়

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পৃথিবীর ৫৫ ভাগেরও বেশি ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও রাশিয়া থেকে। যেসব জীবাশ্ম জ্বালানি

2023-12-05T02:23:23+00:00
2023-12-05T02:23:23+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
সম্পাদকীয়
জলবায়ু সম্মেলন ব্যর্থ হওয়া চলবে না
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২৩, ২:২৩ এএম 
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পৃথিবীর ৫৫ ভাগেরও বেশি ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও রাশিয়া থেকে। যেসব জীবাশ্ম জ্বালানি কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী, অন্যতম হলো তেল। তার বড় উৎপাদক দেশ হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত। সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় তেল কোম্পানি অ্যাডনকের প্রধান নির্বাহী সুলতান আল জাবের ও কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটোর যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায়। লেখাটি সময়ের আলোর জন্য অনুবাদ করেছেন সুস্মিতা শ্যামা

বর্তমানে দুবাইয়ের এক্সপো সিটিতে চলছে কপ-২৮ জলবায়ু সম্মেলন। এ বছর মোট ৭০ হাজারের বেশি প্রতিনিধির অংশগ্রহণে এই সম্মেলনটির আয়োজন হচ্ছে। জলবায়ুর ওপর মানুষের সৃষ্টি করা ক্ষতিকর প্রভাব ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য প্রতি বছর বিশে^র বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণে একেকটি স্থানে ‘কনফারেন্স অব দ্য পার্টিস’ বা ‘কপ’ আয়োজিত হয়। জলবায়ুর ওপর সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে শিল্পোন্নত দেশগুলো। এই দেশগুলো অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণ করে যাচ্ছে। তারই ফলাফল হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো। সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশে অতিমাত্রায় গরম, অতিবৃষ্টি, বিলম্বিত বৃষ্টি, শীতের তীব্রতায় পরিবর্তন ইত্যাদি ফলাফল দেখা গেছে। তাই বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ এই সম্মেলনের গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখছে।

বিগত দিনগুলোতে প্রায় প্রতি বছরই কপ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। কিন্তু সেসব কপগুলোতে বিশ্ব নেতারা কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, ক্ষতি নিরসনে ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিলেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবে গৃহীত হয়নি। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করতে কয়লা, তেল ও গ্যাসের ব্যবহার বন্ধ করা উচিত নাকি জলবায়ুর ওপর শিল্পের প্রভাব কমাতে প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গুরুত্ব দেওয়া উচিত সে বিষয়ে বিশ^নেতারা কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেননি। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পৃথিবীর ৫৫ ভাগেরও বেশি ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও রাশিয়া থেকে। যেসব জীবাশ্ম জ্বালানি কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী, তার মধ্যে অন্যতম হলো তেল। তার বড় উৎপাদক দেশ হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত। এবার সেই দেশকেই সম্মেলনের ভেন্যু হিসেবে বেছে নেওয়ার ফলে এবারকার কপের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ।

এই সম্মেলনের এবারের সভাপতি আমিরাতে জাতীয় তেল কোম্পানি অ্যাডনকের প্রধান নির্বাহী সুলতান আল জাবের ও কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটোর যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায়। সেই বিবৃতিতে তারা বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর বেসরকারি খাতের সহায়তা প্রয়োজন। তাদের একার পক্ষে এই সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। বিবৃতিটি সময়ের আলোর পাঠকদের জন্য তুলে দেয়া হলো।

উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশে সবুজ কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে অতি সত্বর জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়লাভের জন্য যে সম্মিলিত কর্মসূচি প্রয়োজন তা স্বপ্নই থেকে যাবে। উন্নয়নশীল দেশ বেশ কিছু আর্থ-সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় যার ফলে তারা ব্যয় সংকোচন করতে বাধ্য হয়। পৃথিবীজুড়ে বহু মানুষ ক্ষুধায় জর্জরিত, ২০০ কোটি মানুষের জন্য নিরাপদ পানির সংস্থান নেই। ৬০ শতাংশেরও বেশি স্বল্প আয়ের দেশ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ার উচ্চ ঝুঁকিতে আছে। কারণ এই দেশগুলোতে মূলধন সীমিত। জলবায়ু সংশ্লিষ্ট বিষয়ে টাকা খরচ করার মতো সুযোগ এসব দেশের নেই।

সবুজ শিল্পায়ন উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক বিরাট সুযোগ নিয়ে আসে। পরিবেশের দেখাশোনা আর অর্থনৈতিক অগ্রগতির সমন্বয় করার মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক রূপান্তর ঘটানোর সুযোগ। সবুজ শিল্পায়ন ঘটলে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি পথ প্রস্তুত হবে। এর ফলে এই দেশগুলো বিভিন্ন রকম শক্তি ব্যবহার করতে পারবে, শিল্পায়ন, বৈচিত্র্যকরণ এবং ক্রমবর্ধমান কর্মসংস্থানের মাধ্যমে কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে পারবে।

আমরা এর আগে দেখেছি, জলবায়ুর নীতির ফলে কীভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস আইন, ইউরোপীয় নেট জিরো ইন্ডাস্ট্রি অ্যাক্ট হয়েছে, তাদের সবুজ শিল্পায়নের দুয়ার খুলে দিয়েছে। প্রথম বছরেই মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস আইনের ফলে মূলধন এসেছে, নির্গমন হ্রাস হয়েছে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং আমেরিকান অর্থনীতিতে রূপান্তর আসছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতেও আমরা টেকসই উন্নয়নের জন্য সবুজ অর্থনীতির উদ্যোগ চালু করেছি। তার ফলে আশাব্যঞ্জক ফলাফলও পেয়েছি। এই জাতীয় উদ্যোগগুলো যতই শক্তিশালী হোক না কেন, পর্যাপ্ত পরিমাণে তহবিল সৃষ্টি এবং কার্বন নিঃসরণকে সঠিক মাত্রায় নামিয়ে আনার জন্য এগুলো যথেষ্ট নয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিনিয়োগ না বাড়ালে এই পৃথিবী জলবায়ু পরিবর্তনের বিপজ্জনক প্রভাব এড়াতে পারবে না। সংওয়ে স্টার্ন রিপোর্টে বৈশি^ক দক্ষিণে স্বল্প আয়ের এবং উদীয়মান বাজারের জন্য এক ট্রিলিয়ন বাহ্যিক অর্থায়নসহ বছরে ২.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে।

যদিও আমরা গত ২০ বছরে উদীয়মান এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ব্যক্তিগত এবং বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে দেখেছি। তবুও এই সম্পদগুলো সরাসরি সবুজ শিল্পায়ন বিপ্লবকে সমর্থন করেনি। খেয়াল রাখতে হবে, বিনিয়োগ যেন অতি অবশ্যই সবুজ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি নতুন রূপ নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। তার ফলে যেন একটি সবুজ পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়। নতুন শিল্প, উৎপাদন এবং চাকরির বিকাশ যেন শক্তিশালী হয়।

উদাহরণস্বরূপ আমরা বিদ্যুতায়নের কথা বলতে পারি। ২০৫০ সালের মধ্যে নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনতে চাইলে তামা, নিকেল এবং লিথিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজগুলোর জন্য ক্রমাগত চাহিদা বাড়তে থাকবে। এর ফলে খনিজ সমৃদ্ধ উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে এক বিরাট সুযোগ আসবে। বর্তমানে আফ্রিকাতে শক্তির পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় ৪০ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সবুজ চাকরি এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে সহজতর করার ক্ষেত্রে সবুজ শিল্পায়ন বিরাট অবদান রাখতে পারে। কপ-২৮-এর জন্য দুবাইতে বিশ^ নেতৃবৃন্দ, শিল্প এবং সুশীল সমাজের বৈঠক চলছে। এই বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে অবশ্যই সবুজ শিল্পায়নের জন্য বেসরকারি খাতের সহায়তার কথা থাকতে হবে এবং তিনটি মূল বিষয়ে আলোকপাত করতে হবে। প্রথমত, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাদের তুলনামূলক সুবিধার ওপর ভিত্তি করে ব্যাপক সবুজায়নের কৌশল নির্ধারণ করার জন্য কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। সেটা করার সময় অবশ্যই মানব উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিকে প্রাধান্য দিতে হবে। এই কৌশলগুলোর মধ্যে যেগুলো আকর্ষণীয় ও বাস্তবায়নযোগ্য সেগুলো যেন শক্তির পরিবর্তনকে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়। পাশাপাশি লক্ষ্য রাখতে হবে যেন উৎপাদন এবং অন্য সব শ্রম সৃষ্টিকারী খাতে কর্মরত মানুষের জীবিকাগুলোর কোনো ক্ষতি না হয়।

দ্বিতীয়ত, প্রকল্পের উপযুক্ত আর্থিক উপকরণ, গ্যারান্টি, ঝুঁকিমুক্ত উপকরণ সৃষ্টি করতে হবে। সেই উপকরণগুলো যেন বেসরকারি খাতের পুঁজির দুয়ার খুলে দিতে পারে। বিনিয়োগকে চিহ্নিত ও সহায়তা করার জন্য জনকল্যাণের কথা মাথায় রেখে কাজ করা অতীব জরুরি। এই বিনিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে ক্রেডিট বর্ধিতকরণ, মিশ্রিত অর্থায়ন বা গ্যারান্টি প্রদানের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ইক্যুইটি অর্থায়নকে বাড়ানো যাবে এবং উদ্ভাবন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং সুযোগ সৃষ্টিতে সহায়তা করা যাবে।

সবশেষে সবার জন্য টেকসই অর্থকে সুলভ করতে বিশ্বব্যাপী আর্থিক কাঠামোর সংস্কার করা গুরুত্বপূর্ণ। উদীয়মান বাজারে পেনশন এবং সার্বভৌম সম্পদ তহবিল ইতিমধ্যে বিনিয়োগের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সরবরাহ করছে। এর পরিমাণ আরও বাড়াতে হবে। ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি ছাড়াও ব্যাসেল কমিটি অন ব্যাংকিং সুপারভিশনের মতো অন্যান্য কিছু বড় বড় সংস্থা রয়েছে। যেগুলো সাধারণ ব্যাংকিং মান এবং পদ্ধতি সমন্বয়ের লক্ষ্যে কাজ করছে। 

এ ছাড়াও গ্লাসগো ফিন্যান্সিয়াল অ্যালায়েন্স ফর নেট জিরো সব ব্যবসায়ীদের একত্রিত করে কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এভাবে আরও বেশি বেশি বিনিয়োগবান্ধব নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে সহায়তা দেওয়ার জন্য সব ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে একযোগে কাজ করতে হবে। এতে রূপান্তরমূলক প্রকল্প চালু হবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে।

এতে আরও নিশ্চিত করা যাবে যে দেশগুলো ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে জলবায়ুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, তাদের পিঠের পেছনে হাত বাঁধা থাকবে না। বেসরকারি খাতের পূর্ণ শক্তি মুক্ত করে সবার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে অর্থায়ন নিশ্চিত করা হবে। বিশ্বব্যাপী সবুজ শিল্পায়ন এবং সহায়তা পুনরায় প্রজ্বলিত হবে। 

নেট জিরোর দিকে আমাদের যাত্রা ত্বরান্বিত করবে এবং কর্মসংস্থান ও সমৃদ্ধি তৈরি করবে। এটা আমাদের প্রজন্মের অস্তিত্বের লড়াই। চ্যালেঞ্জটি খুবই বিশাল এবং এর মোকাবিলা করতে গিয়ে কোনোভাবেই ব্যর্থ হওয়া চলবে না।

আমরা সবাই একটি গ্রহে ভাগাভাগি করে বাস করছি। সেই গ্রহটির জন্য লড়াই করতে গিয়ে বিশ্বকে অবশ্যই সব সরঞ্জাম নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রশ্ন হলো, খুব বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই বিনিয়োগ করার মতো দূরদর্শিতা নেতাদের হবে কি না।

সময়ের আলো/জেডআই


Loading...
Loading...
সম্পাদকীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: