গতানুগতিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে যাচ্ছে বিএনপি। নির্বাচন সামনে রেখে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটির এমন উদ্যোগ। বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণে এক গুচ্ছ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শে ফিরতে চায় বিএনপি।
জিয়াউর রহমানের শাসনামলে যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল; বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব সেগুলোক অনুসরণ করতে চায়। দলটি মনে করছে, সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বরাবরই রাজনীতির বাইরে থাকছে। এখনই তাদের মূলধারায় নিয়ে আসতে পারলে বিএনপি লাভবান হবে। সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলে রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা পাওয়া যাবে। এ জন্য নির্বাচনের আগে দলটি বড় একটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ইতিমধ্যে তারা সারা দেশের বিভিন্ন প্রতিবন্ধীকে নিয়ে মতবিনিময় সভা করেছে। সামনে দলটি জেলে, বেদে, হরিজন, দলিত সম্প্রদায় ও চা শ্রমিদের কাছে পৌঁছাবে। তাদের গুরুত্ব দিয়ে তৈরি হবে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনীতির চরিত্র বদলে গেছে। আগের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বর্তমান অবস্থা মিলবে না।পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছানোর বিকল্প নেই। ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণে তারা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এ জন্য তাদের কাছে টানতে হবে। এখন থেকে এ জনগোষ্ঠীর কাছে বিএনপিকে আস্থা ও প্রতিশ্রুতিশীল দল হয়ে উঠতে হবে। জীবনযাত্রায় তারা যেসব বৈষম্যের শিকার সেগুলো কমিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।
বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) তথ্যমতে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১ শতাংশ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যারা ধর্মীয়, জাতিগত ও লিঙ্গভিত্তিক পরিচয়ে অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। পেশা ও বংশপরিচয়ের কারণে যেমন বৈষম্যের শিকার তেমনি এসব জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, আবাসন ও আইনি সহায়তার ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে বৈষম্যের শিকার হয়। বিএনপি মনে করছে, পিছিয়ে পড়া এসব জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে পতিত সরকার দায়সারা কাজ করেছে। তাদের অধিকার আদায়ের জন্য সরকার আইন প্রণয়ন করেছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন হয়নি।
রাষ্ট্রের সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা আরও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য বিএনপি এখন সচেতন। এরই ধারাবাহিকতায় তারা নানা পরিসরে কাজ করে যাচ্ছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ করতে টিম গঠন করেছে বিএনপি। তারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে এ জনগোষ্ঠীর সংগঠনের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। তাদের একত্র করে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে সেমিনার ও উঠান বৈঠকের পরিকল্পনাও রয়েছে। যেখানে অংশগ্রহণকারীর বক্তব্য, মতামত, সমস্যা ও সম্ভাবনার কথাগুলো সরাসরি শুনছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেই আলোকে তিনি দলের তরফ থেকে নানা প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন। সেই সঙ্গে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনসম্পদে পরিণত করার আশ্বাসও দেওয়া হচ্ছে, যা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরে হঠাৎ এমন উদ্যোগ কেন? জানতে চাইলে বিএনপির মিডিয়া সেলের একজন সদস্য জানান, রাজনীতির বাইরে হলেও এগুলোই একসময় রাজনীতির বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে। খালি চোখে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মোট জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ মনে হলেও রাজনীতিতে তাদের গুরুত্ব কম নয়। আমরা ভবিষ্যতে উপকূলীয় অঞ্চলে যাব। সেখানে জেলে সম্প্রদায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হবে। এরপর ধারাবাহিকভাবে চা ও তাঁত শ্রমিক, কামার, কুমার, নাপিত, বাঁশ ও বেত প্রস্তুতকারক, কাঁশা/পিতল প্রস্তুতকারী এবং জুতা মেরামত/প্রস্তুতকারী সম্প্রদায়ের কাছে আমরা বড় পরিসরে পৌঁছাব। তিনি জানান, গত ডিসেম্বরে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে এই যাত্রা শুরু করেছে বিএনপি। প্রতিবন্ধী এ ছাড়া দলিত, সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও ট্রান্সজেন্ডারের মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষরা এখনও সমাজে নানাভাবে পিছিয়ে রয়েছেন। তাদের অংশগ্রহণেও বিভিন্ন কার্যক্রম থাকবে।
তিনি বলেন, পাহাড় থেকে সমতল সব পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে নিয়ে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে কাজ করছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় অনেকটা নিভৃতে সারা দেশে মাঠ পর্যায়ে এ কাজ শুরু হয়েছে। এ নিয়ে দল বেশি প্রচারও চালাতে চায় না। রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে থাকার কৌশল হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মতামতের ভিত্তিতে অর্থাৎ তাদের গুরুত্ব দিয়ে আগামী নির্বাচনে দলের ইশতেহার তৈরি হবে। অংশগ্রহণমূলক সরকার গঠন ও রাষ্ট্র বিনির্মাণে তাদের মতামত ও চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। অঞ্চলভেদে সমস্যা, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে।
জনগণকে পাশে রাখতেই বিএনপি এ ধরনের জনগোষ্ঠীর কাছে যাচ্ছে বলে জানান বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, বিএনপি বহুমাত্রিক রাজনৈতিক দল। নতুন বাস্তবতায় আমাদের গতানুগতিক রাজনীতির বাইরে যেতে হবে। মিছিল-মিটিং-সমাবেশে ব্র্যাকেটবন্দি থাকার দিন শেষ।
রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে অধিকারহারা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করতে হবে। দলীয় কর্মকাণ্ডে এই ব্রাত্যজনদের বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত করার সুযোগ এসেছে। দলে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রমের আওতায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিয়ে আসতে হবে। তাদের জন্য রাজনৈতিক নতুন প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। জিয়াউর রহমানের সময় বিএনপি এ কাজ করেছে। এখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নে তাগিদ দিচ্ছেন। বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণে এক গুচ্ছ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, জিয়াউর রহমান প্রত্যন্ত অঞ্চল, মাঠে-ঘাটে, হেঁটে ছুটে বেড়িয়েছেন। কখনো লাঙল হাতে, কখনো কাস্তে হাতে; আবার কখনো কোদাল হাতে। জিয়া কৃষকের মাঠে গিয়ে কৃষকের সঙ্গে কথা বলেছেন, সমস্যা জেনেছেন, কৃষকের সঙ্গে কাজে অংশ নিয়েছেন। তার ডাকে জনগণও সাড়া দিয়েছিল ব্যাপকভাবে। প্রাকৃতিক জলাধার সৃষ্টির লক্ষ্যে সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেন। সমাজকে সংগঠিত করার এক অনন্য নজির হচ্ছে খাল খনন কর্মসূচি। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ সালের মে মাস পর্যন্ত সারা দেশে দেড় হাজারের বেশি খাল খনন করা হয়।
কোনো ধরনের জামানত ছাড়াই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক যেন সহজেই কৃষিকাজের জন্য ঋণ সুবিধা পান, সে জন্য তিনি ১৯৭৭ সালে ১০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ কৃষিঋণ কর্মসূচি প্রণয়ন করেন, যা বাংলাদেশের কৃষিঋণ প্রবাহে নতুনমাত্রা যোগ করে এবং দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এ ছাড়া গ্রামীণ অবকাঠামোকে উন্নত করার লক্ষ্যে ১৯৭৭ সালের অক্টোবর মাসে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন, যার দায়িত্ব ছিল গ্রামাঞ্চলকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের বাঙালি ও অবাঙালিসহ সব নাগরিকের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় পরিচয়ের মাধ্যম হিসেবে ‘বাঙালির’ স্থলে ‘বাংলাদেশি’ পরিভাষা ব্যবহার করার প্রস্তাব করেন।
বিএনপির শীর্ষনেতা তারেক রহমান বারবারই বলছেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী আগামীর নির্বাচন অতীতের যে কোনো নির্বাচনের থেকে অনেক অনেক কঠিন হবে। এ জন্য আগামীর নির্বাচন নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আগামীতে যে নির্বাচন হবে, আপনাদের একশ পার্সেন্ট গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি; আপনারা কেউ ভাবতে পারেন, এখানে তো প্রধান প্রতিপক্ষ নেই কিংবা দুর্বল প্রতিপক্ষ, সুতরাং নির্বাচন খুব সহজ হবে। নো, নো অ্যান্ড নো। এ নির্বাচন অতীতের যে কোনো নির্বাচন থেকে অনেক অনেক কঠিন হবে। কাজেই নিজেদের সেভাবে প্রস্তুত করুন। আগামীর নির্বাচনে জনগণের সমর্থন নিয়ে নির্বাচনি পুলসিরাত পার হতে হবে। সুতরাং জনগণের সঙ্গে থাকুন এবং জনগণকে সঙ্গে রাখুন।
প্রায় একই কথা বলেন, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনে ফিরছে বিএনপি। তারেক রহমান তার বাবার আদর্শ রাজনীতির মাঠে বাস্তবায়ন করতে চান। পাহাড়ি বলেন আর গারো বলেন, সবার সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চায় বিএনপি।
এদিকে গত ১৪ ডিসেম্বর ঢাকার আগারগাঁওয়ের এলজিইডি-আরডিইসি ভবনের মিলনায়তনে প্রতিবন্ধী নাগরিকদের এক মতবিনিময় সভা হয়। সেখানে লন্ডন থেকে ভিডিও কলে বক্তব্য রাখেন তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে মুক্ত আলোচনায় প্রতিবন্ধী নাগরিকরা প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইনের সংশোধনসহ বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরেন। শুরুতে খাতওয়ারি সমস্যা ও দাবি দাওয়ার কথা তুলে ধরে সরকারি চাকরিতে প্রতিবন্ধী কোটা ও ভাতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি চান বিএনপির কাছে। জবাবে তারেক রহমান ক্ষমতায় গেলে ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভাতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। মুক্ত আলোচনায় বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, শারীরিক প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক প্রতিবন্ধীরা তাদের দুঃখ-বেদনা এবং প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইনের সংশোধনসহ বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে ধরেন। প্রতিবন্ধীদের মধ্য থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ দল ও অংগ সংগঠনে অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করার দাবি জানানো হয়।
সময়ের আলো/আরএস/