আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের দাবি তুলছে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নির্বাচনি ইস্যুতে রাজনীতির মাঠে সরব বিএনপি। একই দাবি উঠেছে বাম রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে। তবে পতিত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের বাইরে থাকা বাম দলগুলো দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে এক মঞ্চে আসার উদ্যোগ নিয়েছে। এই দলগুলো নির্বাচনি রোডম্যাপের দাবিতে বিএনপির সঙ্গে যৌথ কর্মসূচি দিতে চায়। ইতিমধ্যে বাম দলগুলোর মধ্যে একাধিক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে বলে জানিয়েছেন নেতারা।
বাম দলগুলোর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের ৫ আগস্টের পর প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ভাবাপন্ন বাম দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে চায়। তারা নির্বাচনকে সামনে রেখে এক মঞ্চে আনতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েক দফায় বৈঠক করেছে। এই উদ্যোগের অগ্রভাগে রয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। তারা বাম গণতান্ত্রিক জোটকে সামনে রেখে এগোচ্ছে। জোটের বাইরের দলগুলোর সঙ্গেও একাধিক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে।
ঈদের আগে গণফোরামের ইমেরিটাস সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বাসায় বাম নেতাদের বৈঠকে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তির বৃহত্তর জোট গঠন ও দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে কর্মসূচির বিষয়ে ঐকমত্য হয়। এসব রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রয়েছে- গণফোরাম, বাংলাদেশ জাসদ, ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চা, জাতীয় গণফ্রন্ট, ঐক্য ন্যাপ, গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলনসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, দলিত ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একাধিক সংগঠন, গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন।
একাধিক বাম নেতা বলেন, গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছি। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরও নির্বাচনের নিশ্চয়তা মিলছে না। বিএনপি নির্বাচনের দাবি করলেও সরকার সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ডিসেম্বর বা ২০২৬ সালের জুনে নির্বাচন হবে, যা কালক্ষেপণের ইঙ্গিত। সরকার সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ দিচ্ছে না। এতে জনগণের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাই দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে সরকারকে চাপে রাখতে বড় ধরনের কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে সোচ্চার হতে হবে। যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে বাম দলগুলো আলোচনা করছে এবং জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনে অংশ নেওয়া দলগুলোর সঙ্গে কথা চলছে।
নেতারা বলেন, গত ১৫ বছর নির্বাচনের দাবিতে রাস্তায় ছিলাম। এই সরকারের আমলেও রাস্তায় নামতে হবে, এটা দুঃখজনক। সরকারের আচরণ পর্যবেক্ষণ করছি। নির্বাচনি ইস্যুতে মাঠে নামার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, সময় বলে দেবে কাদের সঙ্গে ঐক্য করে কর্মসূচি দেব। প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ঐক্য জরুরি। তাই বাম গণতান্ত্রিক জোট, গণতন্ত্র মঞ্চ, ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চা, গণফোরাম, জাসদসহ বিভিন্ন সংগঠন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। ঐক্যটা হলে হয়তো বাম ফ্রন্ট বা ১১ দলীয় জোট এমন আদলে কিছু হতে পারে। তবে নির্দিষ্টভাবে এখনই বলা যাচ্ছে না, এই ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মের নাম কী হবে। এই প্ল্যাটফর্মটা হওয়ার পরে বিএনপির সঙ্গে নির্বাচন ইস্যুতে কোনো কর্মসূচি দেব কি না, সেটি সময় বলে দেবে। তবে কোনো সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদি সরকার নির্বাচন নিয়ে কোনো তালবাহানা করে সে ক্ষেত্রে বিএনপির সঙ্গে থেকে নির্বাচন ইস্যুতে মাঠে থাকবে বাম দলগুলোর এই প্ল্যাটফর্ম। ইতিমধ্যে দেশের বিদ্যমান সংকট নিরসনে দ্রুত নির্বাচনের দাবিসহ চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপি নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও বিবৃতির সঙ্গে বাম দলগুলো একমত হয়েছে। তাই বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। গত ২০ এপ্রিল বিএনপির সঙ্গে বাম দলগুলোর বৈঠকে যৌথ কর্মসূচির বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। তবে বাম দলগুলোর এক পতাকাতলে আসার ক্ষেত্রে আলাপ-আলোচনা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। অনানুষ্ঠানিকভাবে বৈঠক হয়েছে। এটিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। এটি আরও আগেই হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু পতিত আওয়ামী লীগ সরকার নানাবিধ চাপে রেখে আমাদের এক মঞ্চে আসার সুযোগ দেয়নি। এখন একটা ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তবে ১৪ দলীয় জোটের বাম দলগুলোকে এই পতাকাতলে আনার সম্ভাবনা খুব কম। আত্ম সমালোচনা কী- সেটি আগে বুঝতে হবে তাদের।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম সময়ের আলোকে বলেন, দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নেই। ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশকে বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। এই মুহূর্তে দেশে গণতান্ত্রিক সরকারের বিকল্প নেই, তা যেই দলই ক্ষমতায় আসুক। ফলে বাম প্রগতিশীল শক্তি ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে এবং শিগগির নির্বাচনের দাবিতে মাঠে নামবে। বিএনপির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, প্রয়োজনে আরও হবে। তবে বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে যাবো কি না, তা সময় বলে দেবে।
গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক সময়ের আলোকে বলেন, বাম দলগুলোর ঐক্যের আলোচনা প্রাথমিক পর্যায়ে। এটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে এক মঞ্চে আসার পর এর সেইপ কোন দিকে যাবে এখনও বলা যাচ্ছে না। তবে সবাইকে এক মঞ্চে আনার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছি। নির্বাচনের দাবিতে রাস্তায় থাকব। আমরা সরকারের আচরণ দেখছি। সময় বলে দেবে কী কর্মসূচি নেব ও কাদের সঙ্গে ঐক্য করে কর্মসূচি দেব।
বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া সময়ের আলোকে বলেন, রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণে গণতান্ত্রিক ঐক্যের বিকল্প নেই। আলোচনা চলছে, বৈঠক হচ্ছে। প্রয়োজনে প্রগতিশীল শক্তি মিলে আন্দোলনে যাব। বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন বা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে বাম দলগুলো যাবে কি না, সেটি আলাপ-আলোচনা শেষে বলা যাবে।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ সময়ের আলোকে বলেন, একটি অনির্বাচিত সরকার দেশকে ধ্বংস করে গেছে। আরেকটি অনির্বাচিত সরকার দেশকে নানা সংকটে ফেলেছে। এই সংকট থেকে রেহাই পেতে বৃহত্তর ঐক্যের বিকল্প নেই।
বাম গণতান্ত্রিক জোট আলোচনা করছে। গত ২৩ এপ্রিল বৈঠক হয়েছে। নির্বাচনের দাবিতে মাঠে আছি। প্রয়োজনে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে মাঠে থাকব। বিএনপির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, সিদ্ধান্ত সময়ের হাতে। ইতিমধ্যে আমরা নির্বাচনের দাবিতে মাঠে আছি। প্রয়োজনে আরও বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলে মাঠে থাকব। তবে বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে যাব কি যাব না, সেটি সময় বলে দেবে।