জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের একাংশের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) শুরু থেকেই বলে আসছে মধ্যমপন্থাই হবে তাদের দলীয় আদর্শ। কিন্তু একজন কেন্দ্রীয় নেতার হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে অংশগ্রহণ এবং ‘নারী সংস্কার ইস্যুতে’ মন্তব্য দলটির রাজনৈতিক দর্শন ও অবস্থান নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে পপুলার রাজনীতির বাস্তবতায় দলটি তার ‘মধ্যমপন্থা’ থেকে সরে আসছে কি না সেই প্রসঙ্গে মিশ্র প্রতিক্রিয়া মিলেছে বিশ্লেষকদের।
গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত না হলেও দলের আত্মপ্রকাশের দিন একটি ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। সেই ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল, আমরা (এনসিপি) রাষ্ট্রে বিদ্যমান জাতিগত, সামাজিক, লিঙ্গীয়, ধর্মীয় আর সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও বৈচিত্র্য রক্ষার মাধ্যমে একটি বহুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মাণ করতে চাই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এনসিপি এখন পর্যন্ত তাদের গঠনতন্ত্র, দর্শন কোনোটাই সামনে হাজির না করলেও তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, আলাপের মাধ্যমে তাদের ‘রাজনৈতিক দর্শন’ এবং ‘রাজনৈতিক বন্ধুত্ব’ সবার সামনে উন্মোচিত হয়েছে।
এনসিপির নেতারা বলছেন, বাংলাদেশের বাম বনাম ডান বিভাজন আওয়ামী লীগ বজায় রেখে এসেছে। এই বিভাজনের রাজনীতিকে আবার নতুনভাবে কেউ কেউ আনতে চাচ্ছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এনসিপিকে এই বিভাজনের মধ্যে ফেলা হচ্ছে। এনসিপি বিভাজনের রাজনীতিকে অতিক্রম করে নতুন জায়গায় আসতে চায়।
নারী সংস্কার কমিশন নিয়ে অবস্থান : নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন বাতিলসহ চার দফা দাবিতে গত ৩ মে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে ‘সংহতি’ জানিয়ে বক্তব্য রাখেন এনসিপির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ। সেই সমাবেশে নারীর প্রতি ‘অবমাননাকর’ মন্তব্য দেওয়ার অভিযোগ ওঠে হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে। সমাবেশে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছিলেন, অপ্রয়োজনীয় সংস্কারগুলোকে পাশ কাটিয়ে প্রয়োজনীয় যে সংস্কারগুলোর মধ্য দিয়ে নারীদের অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত হয় এবং আমাদের দেশের ধর্মীয় ও কালচারাল সম্মান যেন অক্ষুণ্ন থাকে, সেই সংস্কারগুলোর ওপর জোর দেওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।
তবে পরবর্তীতে গত সোমবার প্রকাশ্য জনসভায় নারীর প্রতি অবমাননার অভিযোগে হেফাজতে ইসলামকে লিগ্যাল নোটিস দিয়েছেন এনসিপির তিন নেত্রী ও তিন নারী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। এ ছাড়া নারী কমিশনের বিষয়ে দলের অবস্থান সম্পর্কে সোমবার রাতে একটি বিবৃতি দেয় দলটি। সেখানে বলা হয়, নারী কমিশনের কিছু সুপারিশ বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে রাষ্ট্রের দ্বান্দ্বিক অবস্থান তৈরি করে সমাজ বনাম রাষ্ট্র এবং ধর্ম বনাম নারী মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। যেসব বিষয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলোতে সব প্রতিনিধিত্বশীল অংশীজনদের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত রাখা প্রয়োজন। একই বিবৃতিতে নারী সংস্কার প্রস্তাবনার সমালোচনা করতে গিয়ে বিভিন্ন সমাবেশ থেকে অবমাননাকর বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদও জানিয়েছে এনসিপি।
‘ডান-বাম বিভাজনের রাজনীতি’ চায় না এনসিপি : হেফাজতের সমাবেশে দলের কেন্দ্রীয় নেতার যোগদানের বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মুহাম্মদ সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের প্রতিনিধিরা যেমন সিপিবির মিটিংয়ে যাচ্ছেন একইভাবে হেফাজতের মিটিংয়েও যাচ্ছেন এবং যাবেন। আমরা স্পষ্টভাবে এই রাজনীতিই স্থাপন করতে চাইÑবাংলাদেশ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের হুমকি না করে, রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি গণতন্ত্রকে অস্বীকার না করে যারাই বাংলাদেশকে ধারণ করবে তাদের সবার গণতান্ত্রিক অধিকারকে স্বীকৃতি। এই স্বীকৃতি জানানোর অর্থ এই না যে এনসিপি পুরোপুরি তাদের পকেটে চলে গেছে।
তিনি বলেন, বিএনপি যে রকম সিপিবির সঙ্গে বসেছে, বিএনপি তো জামায়াতের সঙ্গে ১৫ বছর জোটে ছিল। আমরা তো সিপিপির সঙ্গে বসার পর বলিনি বিএনপি পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমরা প্রশংসা করেছি, এখানে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহাবস্থান, তাদের মধ্যে ন্যূনতম আলাপ-আলোচনার যে পরিবেশ তা থাকা উচিত।
এনসিপির সংস্কার সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক ও দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার সময়ের আলোকে বলেন, ডান বা বামপন্থার বাংলাদেশের যে প্রচলিত রাজনীতি আছে আমরা এর সঙ্গে সম্পৃক্ততা অনুভব করি না। আমরা মধ্যমপন্থার রাজনীতি করব। এর মানে নীতির প্রশ্নে ধূসর অবস্থান নেওয়া না। এর অর্থ পরিষ্কারÑবাংলাদেশে বিভাজনের রাজনীতি, মুখোমুখির রাজনীতিকে অতিক্রম করে আমরা নতুন জায়গায় আসতে চাই।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বাম বনাম ডান বিভাজন আওয়ামী লীগ সবসময় বজায় রেখে এসেছে। এই বিভাজনের রাজনীতিকে আবার নতুন ‘ফরমেশনে’ কেউ কেউ আনতে চাচ্ছে। এনসিপিকে ডান ব্লকে ফেলতে পারলে তাদের সুবিধা হয়। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই তারা এই বিভাজনগুলো তৈরি করছে।
ভোট এবং সংগঠন ‘গোছানোর কৌশল’ : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন সময়ের আলোকে বলেন, এনসিপি এখন পর্যন্ত তাদের গঠণতন্ত্র, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, দর্শন কোনোটাই আমাদের সামনে হাজির করেনি। কিন্তু তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, আলাপ, বিভিন্ন বিষয়ে চিন্তাভাবনা সেগুলো কিন্তু এককভাবে ‘কট্টর ডানপন্থি’ হিসেবে হাজির হয়েছে। তিনি বলেন, যখন রাজনৈতিক দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ কোথাও যান তখন তার কোনো বক্তব্য, চিন্তা বা মন্তব্যকে ব্যক্তিগতভাবে দেখার সুযোগ নেই। সুতরাং এনসিপি ইতিমধ্যে তাদের রাজনৈতিক দর্শন এবং রাজনৈতিক বন্ধুত্ব সবার সামনে প্রকাশ করেছে।
তিনি আরও বলেন, এনসিপি ধর্মীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে এককভাবে ‘একাত্ম’ হয়েই রাজনীতি করছে। এর একটা প্রধান কারণ বাংলাদেশের নির্বাচনে ধর্মকে ব্যবহার করার যে প্রাচীনতম, সবচেয়ে চর্চিত বিষয় সেটিও তারা কাজে লাগাতে চাচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের মতে, এনসিপি এখনই ভোটের হিসাব করছে না। বরং সব ধরনের লোককে তাদের রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, আমি মনে করি, এনসিপি এখন ভোটের হিসাব করছে না। তারা সংগঠনের হিসাব করছে, দলটাকে কতটা প্রতিষ্ঠিত করা যায়। সে জায়গা থেকে সব ধরনের লোককে তাদের রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে।
তিনি আরও বলেন, তবে তাদের চিন্তা-চেতনা পরীক্ষা করতে প্রথমে দেখতে হবে তাদের রাজনৈতিক দলের আদর্শ কি, তারা কি বলতে চান। এনসিপির গঠনতন্ত্রে কি আদর্শ লেখা আছে, সেটির ওপরই নির্ভর করবে তারা কোনো আদর্শের। তারা এদিক সেদিক গেলেও সেটি বিষয় না, মূল বিষয় হলো এনসিপির গঠনতন্ত্র।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ-মামুন সময়ের আলোকে বলেন, এখনি চূড়ান্তভাবে কিছু বলার সময় আসেনি। তবে দলে টানাপড়েন আছে। কিন্তু পপুলার ডেমোক্র্যাসিতে অনেক সময় বিদ্যমান বাস্তবতায় অনেক কিছু করতে হয়। তার মানে এই নয় যে, দুয়েকটি ঘটনায় সিদ্ধান্ত স্থির করা সম্ভব যে এটিই দলের নীতিনির্ধারণী অবস্থান। এ ছাড়া আরও একটি দিক হচ্ছে যে, ডান-বাম দুই পক্ষ থেকেই দলটির প্রতি আক্রমণ হচ্ছে। এতেও বোঝা যাচ্ছে উভয় পক্ষ চাচ্ছে তাদের আধিপত্য বাড়াতে।
এএডি/