মদিনা শহর
মুসলমানদের কাছে এটি দ্বিতীয় পবিত্রতম শহর। মক্কার পরেই পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র জায়গা হিসেবে মদিনা শহরকে সম্মানিত করা হয়েছে। মদিনা শহরের প্রাতিষ্ঠানিক নাম ‘আল মদিনা আল মুনাওয়ারা’ যার বাংলা অর্থ আলোর শহর। নবীর নামেও চেনে মানুষ। ইসলামের প্রথম রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু হয় এ শহর থেকেই। নবীজি (সা.)-এর আগমনের আগে এ শহরের নাম ছিল ইয়াসরিব। মদিনা শহরের মোট আয়তন ৪৪৫.৫ কিলোমিটার বা ২২৭ বর্গমাইল। নবীজির রওজা মোবারক মদিনা শহরে অবস্থিত। প্রতিদিন হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলিম মদিনা শহরে আসে নবীজির রওজা মোবারক পরিদর্শন করতে।
মসজিদে নববী
পৃথিবীতে মসজিদুল হারাম এর পরেই মসজিদে নববীর স্থান। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এই মসজিদটি নির্মাণ করেছেন। নিজেও এর নির্মাণকাজে অংশগ্রহণ করেছেন। নবীজির মদিনায় হিজরতের পর এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল। নবীজির কবর জিয়ারত করার উদ্দেশ্যেই সব হাজিরা মসজিদে নববীতে এসে উপস্থিত হন। মসজিদের সবুজ গম্বুজবিশিষ্ট কক্ষে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.), হযরত ওমর (রা.) ও হজরত আবু বকর (রা.)-এর রওজা মোবারক অবস্থিত। সবুজ গম্বুজবিশিষ্ট এই কক্ষটি হজরত আয়েশা (রা.)-এর ঘর ছিল। মুসল্লিরা সাধারণত হজের শুরুতে বা শেষে মসজিদে নববীতে এসে অবস্থান করেন।
জান্নাতুল বাকি
মদিনা শহরে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক কবরস্থান জান্নাতুল বাকি। এই কবরস্থানের আরবি নাম মাকবারাতুল বাকি বা বাকিউল গারকাদ। এখানে নবীজির স্ত্রী, কন্যা, আত্মীয়স্বজনসহ অনেক সাহাবির কবর রয়েছে। হাজিরা মসজিদে নববী অবস্থানকালে জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে ইসলামের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কবর জিয়ারত করে আসেন। আগে জান্নাতুল বাকির প্রতিটি কবরের ওপর বিশেষ স্থাপনা ছিল। কিন্তু সৌদ বংশ ক্ষমতায় আসার পরে এই স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলা হয়।
রিয়াজুল জান্নাত
মসজিদে নববীতে নবীজির হুজরা থেকে নিয়ে মিম্বর পর্যন্ত যে জায়গাটুকু রয়েছে তাকেই রিয়াজুল জান্নাত বলা হয়। এ জায়গাটুকুর দৈর্ঘ্য হচ্ছে ২২ মিটার আর প্রস্থে ১৫ মিটার। এর মেঝেতে বিছানো হয়েছে সুন্দর কারুকার্য খচিত দামি কার্পেট। এক পাশে রয়েছে আসহাবে সুফফার স্থান। যেখানে ৭০ জন সাহাবি ইলম অর্জনের লক্ষে নিজেদের বিলীন করে দিতেন। তাদের মধ্যে আবু হুরায়রা (রা.) অন্যতম। আরেক পাশে রয়েছে দ্বিতল বিশিষ্ট একটি আজানখানা, যেখানে হজরত বিলাল (রা.) আজান দিতেন। পাশেই রয়েছে নবীজির মিম্বর, যেখানে নবীজি খুতবা দিতেন।
আল-গামামাহ মসজিদ
আল-গামামাহ মসজিদ প্রিয় নবীর স্মৃতিবিজড়িত মদিনার প্রাচীন ঐতিহ্য সংবলিত মসজিদ। খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজের শাসনামলে ৮৬ থেকে ৯৩ হিজরি মধ্যে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল। নবীজি ৬৩১ সালে এই মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করেছিলেন। আগে এই মসজিদে নামাজ আদায় বন্ধ ছিল, তবে এখন মসজিদটিকে পুনরায় মুসল্লিদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। মদিনার প্রাচীন নিদর্শনগুলোর মধ্যে আল-গামামাহ মসজিদ বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
মসজিদে কুবা
ইসলামের সর্বপ্রথম নির্মিত মসজিদ। মদিনার কুবা নামক গ্রামে এই মসজিদটি অবস্থিত। সম্মান ও মর্যাদার দিক থেকে মসজিদে কুবার অবস্থান চতুর্থ। মক্কার মসজিদুল হারাম, মদিনার মসজিদে নববী এবং জেরুজালেমের মসজিদে আকসার পরেই মসজিদে কুবার অবস্থান। নবীজি মদিনায় হিজরতের সময় পথিমধ্যে এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। মসজিদটির ভিত প্রস্তুত হয়েছিল নবীজির হাত ধরেই। নবীজি বেশ কয়েক দিন এখানে অবস্থান করেছিলেন। পবিত্র কুরআনে কুবার অধিবাসী ও মসজিদে কুবার প্রশংসায় বর্ণিত হয়েছে, ‘যে মসজিদ প্রথম দিন থেকে তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেখানে অবস্থান করা আপনার জন্য অধিক সংগত। সেখানে এমন কিছু লোক আছে, যারা পবিত্রতা পছন্দ করে। আর আল্লাহ পবিত্র ব্যক্তিদের ভালোবাসেন’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১০৮)। নবীজি প্রতি শনিবার কুবা মসজিদে আসতেন, কখনো হেঁটে, কখনো আরোহণ করে (বুখারি, হাদিস : ১১১৯)। নবীজির স্মৃতিবিজড়িত এই মসজিদ দেখতে অনেক মুসল্লি কুবা গ্রামে চলে যান।
মসজিদ আল কিবলাতাইন
ইসলামের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ মসজিদ হলো মসজিদ আল কিবলাতাইন। মদিনায় অবস্থিত এই মসজিদটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কুরআনের বিশেষ কিছু আয়াত নাজিলের ইতিহাস। নবীজি এই মসজিদে যখন জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করতে থাকেন তখন কেবলা পরিবর্তন করার জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আয়াত নাজিল হয়।
মসজিদে জুমা
মদিনা শহরের মসজিদে কুবা থেকে ৯০০ মিটার উত্তরে আর মসজিদে নববীর ৬ কিলোমিটার দক্ষিণে মসজিদে জুমা অবস্থিত। নবীজি মদিনা শহরে এসে প্রথম এখানে জুমার নামাজ আদায় করেছিলেন। এখানেই ইতিহাসের প্রথম জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। নবীজির নামাজ আদায়ের পর সেখান স্বতন্ত্র মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। হাজিদের মূল আকর্ষণের একটি বিশেষ মসজিদ হলো মসজিদে জুমা। অনেকেই এখানে জুমার নামাজ আদায় করতে আসেন।
আল-শাজারাহ মসজিদ
মদিনা থেকে মক্কা যাওয়ার পথে ১২ কিমি দূরত্বে। যুল হুলাইফাতে অবস্থিত মিকাত। নবীজি মক্কা যাওয়ার পথে এ মসজিদে সালাত আদায় করতেন। এখানেই মদিনাবাসীদের ইহরাম বাঁধতে হয়। মসজিদে শাজারাহ মানে হলো গাছের মসজিদ। মক্কায় ওমরাহ বা হজ করার জন্য মুসলমানদের একাধিক মিকাতের (যেখানে ইহরাম স্থাপন করা হয়) একটি। আবের আলি হচ্ছে একটি স্থানের নাম যেখানে মসজিদে শাজারাহ রয়েছে। যুল হুলাইফা মদিনা থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
মসজিদে বেলাল
নবীজির প্রিয় সাহাবি হজরত বেলাল (রা.)-এর নামে পবিত্র ভূমি মদিনা মুনওয়ারায় একটি মসজিদ রয়েছে। যা মসজিদে বেলাল (রা.) বা বেলাল মসজিদ নামে পরিচিত। বেলাল মসজিদ সৌদি আরবের মদিনায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি মসজিদ। নবীজির হাতে গড়া মসজিদে নববীর দক্ষিণ পাশেই এর অবস্থান। মসজিদে নববী থেকে মাত্র ৫ মিনিটেই জান্নাতুল বাকির সীমানা দিয়ে পায়ে হেঁটে বেলাল মসজিদে সহজেই যাওয়া যায়।
বদর প্রান্তর
মদিনা থেকে প্রায় ৮০ মাইল দূরে পাহাড় ঘেরা এক প্রান্তর। ডিম আকৃতির সুবিশাল সেই প্রান্তরের প্রস্থ প্রায় সাড়ে চার মাইল। আগে থেকেই একটি ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা ছিল এর। ইয়েমেন থেকে সিরিয়া পর্যন্ত বাণিজ্য পথ গেছে এই পাহাড় ঘেরা জায়গাটির ওপর দিয়েই। বণিকদের কাফেলা যাওয়ার সেই স্থানেই আবার মিলেছে মক্কা ও মদিনা থেকে আসা দুটি পথ। এখান থেকে লোহিত সাগরও নিকটবর্তী। স্থানটির নামকরণ ‘বদর’ করার পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণের কথা জানা যায়। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যটি হলো, বদর বিন ইয়াখলাদ নামে এক ব্যক্তি এখানে একটি কূপ খনন করেছিলেন। কূপের পানি ছিল খুবই স্বচ্ছ। কথিত আছে, সেখানকার পানিতে চাঁদের প্রতিফলন ঘটত। যেহেতু চাঁদকে আরবিতে বদর বলা হয়, তাই উভয় দিকের সূত্র মিলিয়ে এই স্থানের নাম বদর রাখা হয়েছিল। ২ হিজরির ১৭ রমজান (১৩ মার্চ ৬২৪ খ্রিস্টাব্দ) মদিনার মুসলিম ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইসলামের ইতিহাসে এটি প্রথম যুদ্ধ। এতে মুসলমানরা জয়লাভ করে।
উহুদ পাহাড়
ইসলামের ইতিহাসের তাৎপর্যময় উহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল যে পাহাড়ের ওপর সেই পাহাড়ই মূলত উহুদ পাহাড় নামে পরিচিত। মক্কার কুরাইশ বংশের এবং মদিনাবাসীর মধ্যে এই যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে প্রায় ৭০ জন সাহাবায়ে কেরাম শহিদ হয়েছিলেন। তাদের সবার কবর এই উহুদের ময়দানেই অবস্থিত। হাজিরা উহুদের যুদ্ধে শহিদ হওয়া সাহাবায়ে কেরামদের কবর জিয়ারত করতে উহুদ পাহাড়ে আসেন। উহুদ পাহাড়ের উচ্চতা উচ্চতা ১ হাজার ৭৭ মিটার বা ৩ হাজার ৫৩৩ ফুট। উহুদ পাহাড়ের পেছনের দিকে আরেকটি ছোট পাহাড় আছে যার নাম লোকমুখে রুমার পাহাড় বলেই পরিচিত, এর আসল নাম জাবালে রুমাত। উহুদ পাহাড় পরিদর্শন করতে এলে রুমার পাহাড়ে ঘুরে আসতেও কেউ ভোলে না।
খন্দক
৫ হিজরি মুতাবেক ৬২৭ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত হয় খন্দক যুদ্ধ। এ সময় ২৭ দিন ধরে আরব ও ইহুদি গোত্রগুলো মদিনা অবরোধ করে রাখে। জোট বাহিনীর সেনাসংখ্যা ছিল প্রায় ১০ হাজার। সেই সঙ্গে তাদের ৬০০ ঘোড়া ও কিছু উট ছিল। অন্যদিকে মদিনার বাহিনীতে সেনাসংখ্যা ছিল ৩ হাজার। পারস্য থেকে আগত সাহাবি হজরত সালমান ফারসির পরামর্শে নবীজি মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনায় যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সঙ্গে এই ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণকারীদের নিষ্ক্রিয় করে ফেলে।
কাহফে খুজায়া
কাহফে খুজায়া একটি বিশেষ গুহা, এ গুহাটি নবীজির একটি দুঃসময়ের ঘটনার সাক্ষী। কাহফে খুজায়া গুহাটি মদিনা শহরে অবস্থিত। খন্দকের যুদ্ধের সময় নবীজি এই গুহার ভেতরে আহত অবস্থায় এসে বিশ্রাম করেছিলেন। নবী প্রেমী মুসল্লিরা মদিনায় এলে কাহফে খুজায়া গুহাটি নিজ চোখে দেখতে যান।
ওয়াদিয়ে জিন
ওয়াদিয়ে জিন বিশেষ এক অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন উপত্যকা। মদিনা শহর থেকে ৩০-৪০ কিলোমিটার উত্তরে এই উপত্যকাটি অবস্থিত। এই উপত্যকার এক বিশেষ অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে। সাধারণত কোনো ঢালু জায়গায় পানি ঢাললে তা স্বভাবতই ঢালের দিকেই নামবে। কিন্তু ওয়াদি জিন উপত্যকায় পানি ঢেলে দিলে তা ঢালের দিকে না গড়িয়ে উঁচু দিকে গড়িয়ে পড়ে। এই অসম্ভব বিষয়টিকে নিজ চোখে দেখার জন্য অসংখ্য দর্শনার্থী ওয়াদিয়ে জিন উপত্যকায় ভিড় জমায়।
সালমান ফারসি (রা.)-এর বাগান
সালমান ফারসি (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) আমাকে বললেন, ‘হে সালমান, তুমি (তোমার মালিকের সঙ্গে দাসত্ব মুক্তির ব্যাপারে) চুক্তি করো।’ আমি তার সঙ্গে ৩০০ খেজুরগাছের চারা ফলদায়ক হওয়া পর্যন্ত গর্তে পানি দেওয়া এবং চল্লিশ উকিয়া আদায় করার বিনিময়ে চুক্তি করলাম। এরপর নবীজি সাহাবিদের বললেন, ‘তোমরা তোমাদের ভাইকে সাহায্য করো।’ সাহাবিরা আমাকে খেজুরগাছ (চারা) দিয়ে সাহায্য করলেন। এক ব্যক্তি ৩০টি চারা দিলেন, আরেকজন ২০টি। অন্যজন ১৫টি, আরেকজন ১০টি চারা দিলেন। অর্থাৎ প্রত্যেকেই সামর্থ্য অনুযায়ী আমাকে সাহায্য করলেন। এক পর্যায়ে আমার ৩০০ চারা হয়ে গেল। এরপর নবীজি আমাকে বললেন, ‘হে সালমান, তুমি যাও এবং এগুলো রোপণ করার জন্য গর্ত খনন করো। যখন শেষ করবে, তখন আমার কাছে আসবে। আমি নিজ হাতে তা রোপণ করব।’ যে বাগানের কথা হাদিসে এসেছে, সে খেজুর বাগানটি এখনও রয়েছে। সে বাগানটিই দেখতে যান হাজিরা।
বাদশা ফাহাদ কুরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স
পৃথিবীর সবথেকে জনপ্রিয় কুরআন প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠান বাদশা ফাহাদ কুরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স যা সৌদি আরবের মদিনা শহরে অবস্থিত। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর কমপক্ষে প্রায় ১ মিলিয়ন কপি কুরআন প্রিন্ট করে। আরবি ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় কুরআন মুদ্রণ করা হয় এই প্রিন্টিং কমপ্লেক্সে। এ ছাড়াও আরও অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে মদিনায়। মদিনার কেন্দ্রীয় খেজুর মার্কেট, ইজাবা মসজিদ আবু বকর মসজিদ সাত মসজিদ নিয়ে গঠিত কমপ্লেক্স ইত্যাদি।
এএডি/