সামাজিক নিরাপত্তার দুই মন্ত্র

মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ

ইসলামের আলো

লজ্জা মানুষের অন্তরের এমন এক সৌন্দর্য যা ব্যক্তির চিন্তা, দৃষ্টি, আচরণ ও উচ্চারণকে পরিশুদ্ধ করে তোলে। প্রকৃতপক্ষে লজ্জাই মানুষকে গুনাহ

2025-08-22T08:43:09+00:00
2025-08-22T08:43:09+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
ইসলামের আলো
সামাজিক নিরাপত্তার দুই মন্ত্র
মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ
প্রকাশ: শুক্রবার, ২২ আগস্ট, ২০২৫, ৮:৪৩ এএম 
সংগৃহীত ছবি
লজ্জা মানুষের অন্তরের এমন এক সৌন্দর্য যা ব্যক্তির চিন্তা, দৃষ্টি, আচরণ ও উচ্চারণকে পরিশুদ্ধ করে তোলে। প্রকৃতপক্ষে লজ্জাই মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে, কল্যাণের পথে চালিত করে এবং অটুট ঈমানের অধিকারী বানায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘লজ্জা হলো ঈমানের একটি শাখা’ (সহিহ বুখারি : ৯)। যার অন্তরে লজ্জা নেই, তার অন্তরে ঈমানের আলোও ম্লান হয়ে যায়। লজ্জা মানুষকে অন্যায় ও অশ্লীলতার দ্বার থেকে ফিরিয়ে আনে, হারাম কাজ থেকে বিরত রাখে এবং আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর জবাবদিহির অনুভূতি জাগ্রত করে। কিন্তু আজকের বাস্তবতা অত্যন্ত দুঃখজনক, সমাজে লজ্জাশীলতার ধ্বংসযজ্ঞ স্পষ্ট দৃশ্যমান। সর্বত্রই লজ্জাহীনতার বিষ ছড়িয়ে পড়েছে। নারী হোক বা পুরুষ—উভয়ই আজ লজ্জার সীমা ভুলে নির্লজ্জতার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। অশ্লীলতা, বেপর্দা চলাফেরা, ফ্যাশনের নামে নগ্নতা—এসব যেন সমাজের নিত্য রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, লজ্জা হলো মানুষের ঢাল, চরিত্রের অলংকার ও ঈমানের সংরক্ষক। আজ আমাদের সামনে বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, আমরা কি আমাদের পরিবার, সন্তান, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে লজ্জাহীনতার এই সুনামি থেকে রক্ষা করতে পারব? নাকি নীরব থেকে লজ্জাহীনতার এই বিষাক্ত স্রোতে তলিয়ে যাব?

হাদিসের আলোকে লাজ-লজ্জা 
রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘ঈমানের শাখা-প্রশাখা ষাটেরও বেশি। আর লাজ-লজ্জা ঈমানের একটি শাখা’ (সহিহ বুখারি : ৯)। নবীজি (সা.) আরও বলেন, ‘যখন তোমার মধ্যে হায়া অবশিষ্ট না থাকে, তখন তুমি যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে’ (সহিহ বুখারি : ৩৪৮৪)। অর্থাৎ কোনো খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখার একমাত্র কারণ হলো লজ্জা-শরম। যখন মানুষের মধ্যে শরমের অভাব ঘটে এবং লজ্জা অবশিষ্ট থাকে না, তখন সে তার খুশিমতো কাজ করতে থাকে। আর যখন মানুষ নিজের কামনা-বাসনার দাসে পরিণত হয়, তখন তার ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত করে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন আল্লাহ তায়ালা কোনো বান্দাকে ধ্বংস করতে চান, তখন তার কাছ থেকে লজ্জা-শরমকে ছিনিয়ে নেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০৫৪)

রাসুল (সা.)-এর লজ্জাশীলতা 
হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) এতটাই লাজুক ছিলেন যে, তিনি অন্তঃপুরবাসী কুমারী মেয়ের চেয়েও বেশি লজ্জাশীল ছিলেন।’ এই কারণেই যাপিত জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি সব ধরনের অনুচিত কথা ও অশোভন আচরণ থেকে সম্পূর্ণ পরিশুদ্ধ ছিলেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) না ছিলেন অশ্লীল ভাষী, না তিনি কাউকে গালি দিতেন, আর তিনি হাট-বাজারে উচ্চ আওয়াজে কথা বলতেন। তিনি কখনো মন্দের বদলা মন্দ দিয়ে দিতেন না, বরং ক্ষমা করে দিতেন। এমনকি আমি তাঁর স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও কখনো তাঁকে কাপড় ছাড়া দেখিনি। হজরত আলি বলেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘হে আলি! কখনো তোমার ঊরু খুলো না এবং কারও জীবিত বা মৃত ব্যক্তির ঊরুর দিকে তাকিয়ো না।’ হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর বলেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘হে মানুষ! একান্ত নির্জনতায়ও উলঙ্গ হওয়া থেকে বেঁচে থাকো। কারণ তোমাদের সঙ্গে সর্বদা ফেরেশতারা উপস্থিত থাকেন এবং কখনো তোমাদের থেকে আলাদা হন না। সুতরাং তাদের সঙ্গেও লজ্জা করো এবং তাদের সম্মান করো।’ তাই ফুকাহারা লিখেছেন, প্রয়োজন ব্যতীত যেমন প্রস্রাব-পায়খানা বা দাম্পত্য সম্পর্ক ছাড়া সতর খোলা জায়েজ নয়। আর সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে গোসল করাও সুন্নত পরিপন্থী, বরং গোসল করার সময়ও কাপড় দিয়ে সতর ঢেকে রাখা উত্তম।

সামাজিক নিরাপত্তার দুই মন্ত্র
শরম ও হায়া-লজ্জা কখনো কখনো কঠিন মনে হতে পারে এবং সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে কিছুটা কষ্টদায়ক মনে হয়। যেমন, পুরুষ ও নারীর জন্য আলাদা বসা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়। নারীদের ঘরে পুরুষদের প্রবেশে বাধা, পুরুষদের জন্য দৃষ্টি সংযমের হুকুম, নারীদের জন্য হিজাব ও ওড়না বাধ্যতামূলক করা, বাজার-মেলা কিংবা খেলাধুলার জায়গায় নারীদের অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করা ইত্যাদি। কিন্তু এই সামান্য কষ্টকর নিয়মগুলোর ফলেই গড়ে ওঠে এক সুবিশাল ফলদায়ক সমাজ, যেখানে বংশপরিচয় থাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ। তাদের ঈমান থাকে অটুট। অন্যদিকে যখন মানুষ মিশ্র সমাবেশে উপস্থিত থাকে, তখন দৃষ্টি সংযম রাখা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। চোখের মাধ্যমে হৃদয়ে প্রবেশ করে অবৈধ প্রলোভন, কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘দৃষ্টি হলো অন্তরের দিকে ছোড়া একটি তীর।’ এই দৃষ্টিই জন্ম দেয় অবৈধ আকাক্সক্ষা, যা ধীরে ধীরে সমাজকে ধ্বংসের গভীর খাদে টেনে নিয়ে যায়। তাই জীবনের সব ক্ষেত্রে লজ্জা ও পর্দার গুরুত্ব অপরিসীম। যখন মানুষ আল্লাহর আসমানি শিক্ষাকে উপেক্ষা করবে, তাঁর নির্দেশনাকে অবহেলা করে নিজস্ব কামনা-বাসনা চরিতার্থ করতে মগ্ন থাকবে, তখন তার জন্য ধ্বংস ও বিপর্যয় অবধারিত।

লজ্জাহীনতার পরিণতি
লজ্জাহীনতার সবচেয়ে প্রকট ও বিপজ্জনক পরিণতি হলো পারিবারিক বন্ধনের ক্ষয়। লজ্জা ও হায়া হলো বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানের দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বের ভিত্তি। যখন পুরুষ অন্য নারীর দিকে দৃষ্টি দেয় না, বা যখন নারীর সতর নিরাপদ থাকে, তখন তার মন সম্পূর্ণরূপে নিজের স্ত্রীর প্রতি নিবদ্ধ থাকে। একইভাবে যখন নারীর চাওয়া-পাওয়া একমাত্র তার স্বামীর প্রতি কেন্দ্রীভূত থাকে, তখন পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় ও শক্তিশালী হয়। এর ফলাফল হয় শান্তিময়, কল্যাণময় এবং সুস্থ সমাজ। অন্যদিকে যদি মানুষ এই লজ্জাহীনতার পথ বেছে নেয়, তখন সে তার প্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনার দাসে পরিণত হয়। সেখানে পরিবার ও সমাজের ভিত্তি ভেঙে পড়ে এবং শৃঙ্খলহীনতা ও অবাধ প্রবৃত্তি সমাজকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়।

চলমান সামাজিক অবস্থা 
 আজকের এই সমাজ মানুষকে লজ্জা ও হায়ার চেতনাকে ভুলে যেতে প্রলুব্ধ করছে। সংস্কৃতির ছদ্মবেশে মানুষের মনে এমন একটি কুপ্রবণতা ঢুকে গেছে, যা তাকে তার স্রষ্টা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছে। বিনোদন, ফ্যাশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সিনেমা-টিভি ও শহুরে বিলাসী জীবন—এসবের মাধ্যমে মানুষকে লজ্জাহীনতা, কামনার স্বেচ্ছাচারিতা এবং অনৈতিকতার দিকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। ব্যক্তি যখন এই মোহময়, ব্যভিচারী ও লজ্জাহীন সমাজের সংস্কৃতির ফাঁদে পা রাখবে, তখন প্রমাণ হবে কুরআনের সেই অমর বাণীর, ‘নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত’ (সুরা আসর)। এটি আসলে ইবলিস এবং তার অনুসারীদের পথ। এই পথের শেষ পরিণাম জাহান্নামের জ্বলন্ত অগ্নিকূপ।

ঈমান ও সমাজের সুরক্ষায় করণীয় 
লজ্জাশীল ও পর্দা মান্যকারী ব্যক্তি এই বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। যারা নবী (সা.)-এর জীবনধারা অনুসরণ করবে, তারা লাজ-লজ্জার চেতনার মধ্য দিয়ে নিজেদের সংরক্ষণ করবে, নিজেদের দৃষ্টি, কান, জিহ্বা, হাত, পা এবং অন্তরকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এই জীবনধারাকে সহজভাবে বলা যায় লজ্জাশীল জীবন, যেখানে লজ্জা, সংযম ও ঈমানের সংরক্ষণই মানুষের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক নিরাপত্তার মূল। অতএব এই দুনিয়ায় মানুষে মানুষে হায়া ও লজ্জা প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। ঘরে-বাইরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বাজার-সামাজিক অনুষ্ঠানে, প্রতিটি ক্ষেত্রে লজ্জার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ফলে আখেরাতে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় ও হায়া আমাদের চরিত্র ও কর্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে। সত্যিকারের সফলতা ও মুক্তি এই লজ্জাশীল জীবনেই নিহিত। যে ব্যক্তি এই পথ অবলম্বন করবে, সে কেবল নিজের জন্য নয়, বরং তার পরিবার, সমাজ এবং উম্মাহর জন্যও কল্যাণ বয়ে আনবে।

লেখক : শিক্ষক, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা


Loading...
Loading...
ইসলামের আলো- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: