বিশ্বমানবতার সর্বশেষ ও চূড়ান্ত মুক্তির সনদ আল কুরআন নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)। রাসুল (সা.) পৃথিবীতে আগমনপূর্ব যুগকে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা অজ্ঞতা ও অন্ধকারের যুগ বলা হয়। এই অন্ধকার ও অজ্ঞতা ছিল মানব চরিত্রের চরম অধঃপতনের। তৎকালীন সময়ে দুনিয়ার ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় ছিল। সেই মূর্খতার যুগে মানুষের ছিল না কোনো সামাজিক অধিকার, মানুষ ভুলে গিয়েছিল তাদের সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য। তখন নারী জাতির সামান্যতম মর্যাদাও ছিল না। খুনোখুুনি, রাহাজানি, মদ্যপান, নেশা, জেনা-ব্যভিচার, অবৈধ কার্যকলাপ ছিল তখনকার লোকদের নিত্যদিনের কাজ। চরম নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে মানুষ জাহান্নামের কিনারায় পৌঁছে গিয়েছিল। ঠিক এমনই সময় মজলুম মানুষকে মুক্তি দিতে পৃথিবীতে আগমন করলেন মহানবী (সা.)।
কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের কাছে তাদের মধ্য হতে একজন রাসুল পাঠিয়ে তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। তিনি তাদের কাছে আল্লাহর আয়াতগুলো পড়ে শোনান আর তাদের আত্মশুদ্ধি করান এবং তাদের কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। নিশ্চয় তারা ইতিপূর্বে প্রকাশ্যে গোমরাহির মধ্যে ডুবে ছিল।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৬৫)
মহানবী (সা.)-এর বয়স যখন ১৪ বছর তখন সমাজের দুরাবস্থা, অন্যায়-জুলুম-অত্যাচার-পাপাচার থেকে মানুষকে কল্যাণ ও মুক্তির পথে নিয়ে আসার জন্য সমবয়সিদের সঙ্গে নিয়ে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামক একটি সামাজিক সংঘ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ সংঘের মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করেন। অতঃপর ৬১০ খ্রিস্টাব্দে ৪০ বছর বয়সে তিনি নবুয়তপ্রাপ্ত হন। এরপর থেকে ইসলামের বাণী প্রকাশ্যে মানবজাতির কাছে প্রচার করেন। রাসুল (সা.) অনুভব করলেন, চরম অধঃপতন-অবনতি থেকে মুক্তির জন্য অবশ্যই মানুষের আত্মার সার্জারি প্রয়োজন। তাই তিনি ঘোষণা করলেন, ‘মানবদেহে একপিণ্ড মাংস রয়েছে সেই মাংসপিণ্ড ভালো থাকলে মানবদেহ ভালো থাকে, আর তা নষ্ট হয়ে গেলে মানবদেহ নষ্ট হয়ে যায়। শোনো, মানুষের অন্তরই হচ্ছে সেই মাংসপিণ্ড’ (বুখারি)। আত্মার সংশোধনে জন্য রাসুল (সা.) সর্বপ্রথম যে মহৌষধ প্রদান করলেন তা হলো কালেমা তাইয়্যেবা, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ, অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর প্রেরিত রাসুল।’ এই কালেমা পৌত্তলিকতা ও নাস্তিকতার নাগপাশ থেকে মানুষকে মুক্ত করে আস্তিকতা এবং একত্ববাদের দীক্ষা দিয়ে মানুষের সম্পর্ক জুড়ে দিল আল্লাহর সঙ্গে। তিনি মানুষের সামনে পবিত্র কুরআনের সেই আয়াত তুলে ধরলেন যাতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চই মহান আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই সম্মানিত যে বেশি আল্লাহভীরু।’ (সুরা হুজরাত : ১৩)
রাসুল (সা.) ধারাবাহিকভাবে আল কুরআনের সুমহান বাণী মানুষের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরলেন। মানুষ ধীরে ধীরে কুরআনের শিক্ষায় শিক্ষিত হতে লাগল। ইসলামের সুমহান আদর্শে আদর্শবান হয়ে সোনার মানুষে পরিণত হতে শুরু করল। সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাসুল (সা.) ঘোষণা করেন, ‘ওই ব্যক্তি পরিপূর্ণ মুমিন নয়, যে তৃপ্তিসহকারে খায় আর তার প্রতিবেশী অনাহারে থাকে’ (বুখারি)। খুন-খারাবি তথা অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করার পরিণতি সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক করেন। মানুষকে জানিয়ে দিলেন, ‘মানুষ হত্যা মহা পাপ’ (মেশকাত)। রাসুল (সা.) মানুষ হত্যাকারীর শাস্তিস্বরূপ কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী কঠোর বিধান জারি করেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করো না।’ (সুরা আনআম : ১৫১)
সমাজের সর্বস্তরে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং আদর্শ সমাজ বিনির্মাণের জন্য মৌলিকভাবে কয়েকটি বিষয় রাসুল (সা.) হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়েছেন। নৈতিকতার অর্জনীয় এবং বর্জনীয় বিষয়গুলো বিশেষভাবে শিক্ষা দিলেন। অর্জনীয় বিষয়গুলো হলো- বিনয় ও নম্রতা, দয়া ও সহমর্মিতা, মার্জনা ও ক্ষমা প্রদর্শন, উদারতা ও দানশীলতা, সততা ও সত্যবাদিতা, ধার্মিকতা ও ন্যায়পরায়ণতা, ত্যাগ ও কুরবানি। নৈতিকতার বর্জনীয় যেমন- গিবত, অহংকার, হিংসা-বিদ্বেষ, মিথ্যা, পরশ্রীকাতরতা, চৌর্যবৃত্তি, সন্ত্রাস, রাহাজানি ইত্যাদি বিষয়গুলোর কুফল ও পরিণাম সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করেন। এভাবে মহান আল্লাহর অনুগ্রহ ও রাসুল (সা.)-এর সর্বাত্মক প্রচেষ্টার ফলে জাহান্নামের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো হয়ে গেলেন ‘সাহাবায়ে কেরাম’। রাসুল (সা.)-এর জীবনাদর্শ ঐক্যবদ্ধভাবে অনুসরণ-অনুকরণ করে আল্লাহর রঙে রঙিন হয়ে জাহেলি যুগের বর্বর মানুষগুলো মানবতার বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্য ওইসব হতভাগাদের, যারা রাসুল (সা.)-এর সংস্পর্শ পেয়েও হেদায়তের আলোয় আলোকিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। তারা এতটাই অজ্ঞতা ও অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল যে, তাদের সামনে কুরআনের বাণীগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরার পরেও তারা রাসুল (সা.)-এর কথায় কর্ণপাত করেনি, বরং তাঁর শত্রুতা ও ক্ষতিসাধনের যত পন্থা ছিল সবই প্রয়োগ করতে একটুও কার্পণ্য করেনি। তারা রাসুল (সা.)-কে নির্যাতন-নিপীড়ন করেই ক্লান্ত হয়নি, বরং বারবার তাঁকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। ইসলামের দুশমনদের বিরোধিতার কারণে এবং তাদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে রাসুল (সা.) মদিনায় হিজরত করেছিলেন। সেখানেও রাসুল (সা.) নানা ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের শিকার হয়েছেন। তারা চেয়েছিল রাসুল (সা.) মদিনায়ও শান্তিতে থাকতে দেবে না, তাই তারা বারবার মদিনা আক্রমণের চেষ্টা করেছে। রাসুল (সা.) ও তাঁর অনুসারী সাহাবায়ে কেরাম ইসলামের দুশমনদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বদর, উহুদ, খন্দকসহ বেশ কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এসব যুদ্ধে আল্লাহর অনুগ্রহে মুসলমানরা বিজয়ী হন এবং ইসলাম আরও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হলো। দুনিয়াব্যাপী ইসলামের আলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল।
মহানবী (সা.) সব ধরনের কল্যাণের পথপ্রদর্শক। আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত। তিনি সর্বশেষ নবী ও রাসুল। তাঁর পর আর কোনো নবী পৃথিবীতে আগমন করেননি, করবেনও না। তাঁর ওপর নাজিলকৃত কিতাব আল কুরআনই বিশ্বমানবতার চূড়ান্ত মুক্তির সনদ। এরপর আর কোনো আসমানি কিতাব অবতীর্ণ হয়নি, হবেও না। তিনি ঘোষণা করেন, ‘হে মানবজাতি! তোমরা আমার কথা অনুধাবন করো। আমি তোমাদের মাঝে এমন সুস্পষ্ট দুটি বিষয় (বিধান) রেখে গেলাম যা দৃঢ়ভাবে ধারণ করলে তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব এবং আমার সুন্নাহ’ (বুখারি)। আল্লাহ আমাদের তাঁর আদর্শ অনুযায়ী জীবন সাজানোর তওফিক দিন।
শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
এএডি/