প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৫, ১১:৪৮ পিএম (ভিজিট : ৪০৪)
সংগৃহীত ছবিপৃথিবীতে মানুষকে সৃষ্টি করার পর জীবন পরিচালনার নিয়ম-কানুনও দিয়েছেন মহান সৃষ্টিকর্তা। জীবন পরিচালনার সেই নিয়ম-কানুনের নামই ইসলাম। ইসলাম মানুষের পার্থিব জীবনে চলার পূর্ণাঙ্গ সংবিধান। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ ও সার্বিক অঙ্গনে সেসব মেনে চলতে হয়। এতে পার্থিব জীবন যেমন সুশৃঙ্খল হয়, তেমনি পরকালেও জমা হতে থাকে প্রাপ্তি ও পুরস্কার। ইসলামি বিধানগুলোকে ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, মুস্তাহাব, মাকরুহ ও মুবাহ ইত্যাদি স্তরে বিন্যস্ত করা হয়েছে। এসব পরিভাষা যদিও আল্লাহ ও রাসুল (সা.) বলে দেননি। কিন্তু বিধানের গুরুত্ব ও গুরুতরতা সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসে বিশদ বিবরণ রয়েছে। বিষয়গুলো প্রতিটি মুসলমানের জেনে রাখা জরুরি। এখানে সংক্ষেপে বিষয়গুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
ফরজ : শরিয়তের যেসব বিধান অকাট্যভাবে পালনীয় তাকে ফরজ বলে। ফরজ দুই প্রকার। যথা- ১. ফরজে আইন; যেসব কাজ প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক বিবেকবান নারী-পুরুষ সবার ওপর সমভাবে ফরজ। যেমন- নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি। শরয়ি কোনো কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে ফরজ ত্যাগ করা কবিরা গুনাহ। কারও যদি কোনো ফরজ আমল ছুটে যায় তা হলে সেটা কাজা করা জরুরি (রদ্দুল মুহতার : ১/৩৯৭)। ২. ফরজে কিফায়া; শরিয়তের যেসব বিধান পালন করা সবার জন্য আবশ্যক নয়, বরং সমাজের কিছু সংখ্যক লোক আদায় করলে সবার পক্ষ হতে আদায় হয়ে যায়। যেমন- জানাজার নামাজ, দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন। ফরজে কিফায়া যদি কেউ আদায় না করে তবে সবার ফরজ তরক করার গুনাহ হবে। (জাওহিরাতুন নাইয়িরাহ : ১/৪)
ওয়াজিব : ওয়াজিব শব্দের অর্থ হলো অপরিহার্য, করণীয়, আবশ্যক। ইসলামি পরিভাষায় যে বিধান সুনির্ধারিত দলিল-প্রমাণের আলোকে প্রমাণিত নয়, বরং প্রবল ধারণাগত দলিলের ভিত্তিতে প্রমাণিত তাকে ওয়াজিব বলা হয়। কার্যত ওয়াজিব ফরজ বিধানের মতোই অবশ্য কর্তব্য। ওয়াজিব ত্যাগকারী কবিরা গুনাহগার হিসেবে গণ্য হবে। তবে এর অস্বীকারকারী কাফের সাব্যস্ত হবে না। যেমন- বিতরের সালাত ও দুই ঈদের সালাত ইত্যাদি। (মুজামুল ফকিহ : ৩১৯)
সুুন্নত : যেসব কাজ রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং তার সাহাবিরা করেছেন তাকে সুন্নত বলা হয়। সুন্নত দুই প্রকার। যথা- ১. সুুন্নতে মুয়াক্কাদা; যেসব কাজ রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর সাহাবিরা সর্বদা পালন করতেন, অন্যদেরও পালনের তাগিদ দিতেন। যেমন- তারাবির নামাজ, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মোট বারো রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা রয়েছে। আমলের দিক থেকে সুন্নতে মুয়াক্কাদা ওয়াজিবের কাছাকাছি। বিনা কারণে তা ত্যাগ করলে গুনাহগার হবে। ওজরবশত কখনো ছুটে গেলে তা কাজা করতে হবে না (রদ্দুল মুহতার : ১/৯৭)। ২. সুুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা; যেসব কাজ রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর সাহাবিরা মাঝেমধ্যে করতেন, কিন্তু অন্যকে তা করতে তাগিদ দেননি সেগুলোকে সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা বা সুন্নতে যায়েদা বলে। যেমন- এশা ও আসরের ফরজ নামাজের আগে চার রাকাত সুন্নত, সালাতুত তাহাজ্জুদ, এশরাক ও আউয়াবিনের নামাজ ইত্যাদি। সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা তরক করার দ্বারা কোনো গুনাহ হবে না, তবে আমল করলে সওয়াব পাওয়া যায়। (রদ্দুল মুহতার : ১/৭৭)
মুস্তাহাব : মুস্তাহাব এমন আমল যা পালন করলে সওয়াব রয়েছে কিন্তু ছেড়ে দিলে কোনো গুনাহ নেই। যেমন- জুমার দিন বেশি বেশি দরুদ পড়া, প্রতি আরবি মাসের তিন দিন রোজা রাখা, শাওয়াল মাসের ছয় রোজা ইত্যাদি। সুন্নত ফরজের সহায়ক, আর মুস্তাহাব সুন্নতের সহায়ক। তাই ফরজের পরিপূর্ণতার জন্য সুন্নত আর সুন্নতের পরিপূর্ণতার জন্য মুস্তাহাবের প্রতি গুরুত্ব প্রদান জরুরি।
মাকরুহ : মাকরুহ এমন কাজকে বলা হয়, যেগুলো ইসলামি শরিয়তে অপছন্দনীয় সাব্যস্ত হয়েছে এবং তা করতে নিষেধ করা হয়েছে। মাকরুহ দুই ভাগে বিভক্ত। যথা- ১. মাকরুহ তাহরিমি; যেসব কাজ হারামের নিকটবর্তী। যেমন- সূর্যোদয়, দ্বিপ্রহর ও সূর্যাস্তের সময় নামাজ পড়া।
কার্যত মাকরুহে তাহরিমি হারাম বিধানের মতোই পরিত্যাজ্য। যদি কেউ বিনা কারণে মাকরুহে তাহরিমি কাজে অভ্যস্ত থাকে তবে সে ফাসেক হিসেবে সাব্যস্ত হবে (কামুসুল ফিকহ : ৩/২৪৭)। ২. মাকরুহ তানজিহি; এমন অপছন্দনীয় কাজ, যা থেকে বেঁচে থাকা উত্তম। যেমন- কোনো কিছু বাম হাতে গ্রহণ করা ও বাম হাতে প্রদান করা।
মুবাহ : এটি এমন এক কর্ম যা সম্পাদন বা বর্জন কোনোটিই ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ নয়। ‘মুবাহ’ শ্রেণির অনেক কাজকেই ইবাদতে রূপান্তরিত করে পুণ্য হাসিল করা সম্ভব যদি নিজের মনের নিয়তকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের দিকে মনোনিবেশ করা হয়। যেমন- ক্রয়-বিক্রয় করা, সাধ্যমতো দামি পোশাক পরিধান করা
সময়ের আলো/জেডআই