ইসলামে বিনোদন ও খেলাধুলার শর্তমানুষের জীবনে বিনোদন ও শরীরচর্চা একটি স্বাভাবিক প্রয়োজন। দেহ ও মনকে সুস্থ রাখার জন্য উপযুক্ত পরিমাণ বিশ্রাম, বিনোদন এবং খেলাধুলাকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। তবে ইসলাম এগুলোর জন্য নির্দিষ্ট শর্ত, বৈধতার সীমা ও মৌলিক নীতিমালা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কারণ মুমিন জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুহূর্তের সমষ্টির নামই জীবন। জীবনের আয়ু ফুরিয়ে যাওয়ার আগে মুমিনকে আখেরাতের পুঁজি সংগ্রহ করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘বুদ্ধিমান সে ব্যক্তি যে নিজের প্রবৃত্তিকে দমন করে এবং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য আমল করে।
পক্ষান্তরে অক্ষম সে ব্যক্তি যে নিজের প্রবৃত্তি ও খেয়ালখুশির অনুসরণ করে এবং আল্লাহর কাছে (ভালো প্রতিদানের) প্রত্যাশা রাখে’ (আত তারগিব ওয়াত তারহিব, হাদিস : ৫১১০)। ঈমানদার ব্যক্তির তাই কোনো একটা মুহূর্তও নষ্ট করার অবকাশ নেই।
মুমিনের বৈশিষ্ট্য
একজন ঈমানদার নিজের জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য, নেক কাজ ও ইবাদত-বন্দেগির পেছনে ব্যয় করে। এটাই তাদের বৈশিষ্ট্য। অহেতুক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে সময় নষ্ট করা কোনো ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘আর তারা সেসব ব্যক্তি, যারা অহেতুক কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকে’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত : ০৩)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যদি তারা অনর্থক কথা ও কাজের সম্মুখীন হয়, তা হলে ভদ্রভাবে এড়িয়ে চলে’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৭২)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মানুষের জন্য সুন্দর ইসলাম হলো সে অনর্থক বিষয়াবলি পরিত্যাগ করবে’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২৩১৭)। অন্য হাদিসে হজরত হোসাইন ইবনে আলি (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের সুন্দর ইসলাম হলো অল্প কথা বলা এবং অহেতুক কর্মকাণ্ড পরিহার করা’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৭৩৭)। এ হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বেশি কথা বলার মতো সময় নষ্টকারী কাজও একজন মুমিনের জন্য পরিহারযোগ্য।
ইসলামে পছন্দনীয় খেলা
খেলাধুলাকে স্রেফ বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং বিনোদনের পাশাপাশি মানুষের কল্যাণ, উপকার ও শরীরচর্চার প্রতি লক্ষ রেখে কিছু খেলাকে ইসলাম পছন্দের তালিকায় রেখেছে। যেমন- তীরচালনা, অশ্বচালনা, সাঁতার শেখা বা শেখানো, স্ত্রীর সঙ্গে খেলাধুলা করা এবং দৌড় প্রতিযোগিতা। হাদিস শরিফে হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, চারটি জিনিস ছাড়া আল্লাহকে স্মরণ করার সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না এমন সব কিছুই অনর্থক খেল-তামাশা। নিজ স্ত্রীর সঙ্গে খেলাধুলা করা; নিজের ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া; লক্ষ্যভেদ করার প্রশিক্ষণ নেওয়া ও সাঁতার শেখা (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৮৯৩৯)। অন্য হাদিসে এসেছে, আল্লাহ তায়ালার কাছে সবচেয়ে প্রিয় খেলা হচ্ছে অশ্বচালনা ও তীরন্দাজি (ইবনে আদি : ৬/১৭৬)। দৌড় প্রতিযোগিতাও ইসলামে পছন্দনীয় একটি খেলা। এতে শারীরিক সুস্থতা ও মানসিক প্রফুল্লতা অর্জিত হয়। নবীজি (সা.) হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন বলে হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়।
হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, ‘একবার আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সফরে দৌড় প্রতিযোগিতা করলাম এবং আমি আগে চলে গেলাম। কিছুদিন পর পুনরায় আরেক সফরে রাসুলের সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলাম। তখন আমি একটু মোটা হয়ে যাওয়ায় নবীজি (সা.) আমার আগে চলে গেলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন হাসির ছলে বললেন, এটা আগেরবারের প্রতিশোধ।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৫৭৮)
খেলাধুলার শরয়ি দৃষ্টিভঙ্গি
কিছু খেলাকে ইসলামি শরিয়ত সুস্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করেছে। যেমন- জুয়া, পাশা, দাবা, মোরগ বা ষাঁড়ের লড়াই, কবুতরবাজি। এগুলোর বাইরে অন্যান্য খেলা বৈধ-অবৈধতার বিষয়টি ইসলামি শরিয়তে মৌলিক কিছু নীতিমালার ওপর নির্ভরশীল। সেগুলো হলো- ১. যে খেলা উদ্দেশ্যহীন স্রেফ সময় কাটানোর জন্য হয়, সেগুলো বৈধ নয়। কেননা এতে অনর্থক জীবনের মহামূল্যবান সময় বিনষ্ট হয়। ২. যেসব খেলাধুলা ফরজ, ওয়াজিব প্রভৃতি ইসলামি বিধিনিষেধের প্রতি উদাসীনতা সৃষ্টি করে, সেসব খেলাধুলা অবৈধ। ইমাম বুখারি (রহ.) বলেন, ‘যে খেলা আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যের ব্যাপারে উদাসীনতা তৈরি করে, তা নাজায়েজ’ (সহিহ বুখারি)। ৩. যে খেলাধুলার সঙ্গে কোনো হারাম বিষয় সম্পৃক্ত থাকে যেমন- সতর খোলা থাকা, নারী-পুরুষের ফ্রি মিক্সিং, জুয়াবাজি, গান-বাদ্যের আয়োজন প্রভৃতি, এমন খেলাও নাজায়েজ। ৪. যে খেলায় অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয় এবং এর মাধ্যমে পড়াশোনা, কাজ বা দায়িত্ব পালনে ক্ষতি হয়, তা অপছন্দনীয় (মাকরুহ)। জীবনের সময়টা ঈমানদারের কাছে আমানত, তাই খেলাধুলা বিনোদন হলেও তা যেন জীবনের লক্ষ্য না হয়ে যায়। ৫. যে খেলায় মারাত্মক আঘাত, অঙ্গহানি বা প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকে, সেসব খেলা হারাম।
উল্লেখিত বিষয়গুলোর অনুপস্থিতিতে যদি কোনো খেলা দ্বীনি অথবা দুনিয়াবি উপকার লাভের উদ্দেশ্যে খেলা হয়, তা হলে তা জায়েজ হবে। ইসলাম খেলাধুলাকে নয়, নিষিদ্ধ করেছে সীমালঙ্ঘনকে। এ জন্য শরিয়তের সীমালঙ্ঘন হয়, এমন কিছু করা যাবে না।
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা
সময়ের আলো/জেডআই