সৃষ্টিকুলে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ। পরম করুণাময় আল্লাহর খুবই মহব্বতে এবং নিজের হাতে তৈরি এই মানবকুল। আঠারো হাজার মাখলুকাতের মধ্যে যা কিছু সৃষ্টি, সবার ওপরে আল্লাহ শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন মানুষকে। আল্লাহর সৃষ্টি এই পৃথিবী কতই না সুন্দর ও মনোরম, যা না দেখলে মানবজীবন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
প্রযুক্তির বদৌলতে স্রষ্টার সৃষ্টির সৌন্দর্য অবলোকন করে আমরা মুগ্ধ হয়ে বলি সুবহানাল্লাহ। মানুষের জীবনটাও অনেক বৈচিত্র্যময়। পূর্ণবয়স্ক একজন মানুষের জীবনের শৈশব-কৈশোর, যৌবন ও বার্ধক্য- এই স্তরগুলো তুলনা করা যায় সূর্যের সঙ্গে। ভোরের সূর্যের মিষ্টি আলোর সঙ্গে শৈশব-কৈশোরের, দুপুরের সূর্যের আলোর প্রখর তাপ যৌবনের সঙ্গে এবং অস্তগামী সূর্যের সঙ্গে বৃদ্ধ বয়সের মিল বা সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়।
জন্ম থেকে বার্ধক্য অবধি যেকোনো সময় আল্লাহর ডাকে অথবা কর্ম দোষে আমাদের জীবনের ছন্দপতন হতে পারে। তখন আমরা পরিবার-পরিজনের কাছে দিনে দিনে শুধু অতীত এবং ছবি হয়ে থাকব। সর্বোচ্চ তিন প্রজন্ম আপনাকে মনে রাখতে পারে। তারপর এই পৃথিবীতে আপনার অস্তিত্ব ধীরে ধীরে মুছে যাবে, কারণ এই পৃথিবীর সবকিছুই নশ্বর।
সুন্দর এই মানবজীবন ক্ষণস্থায়ী। মানুষের বিদ্যা, বুদ্ধি, ন্যায়-অন্যায় বা ভালো-মন্দ, যা কিছু অর্জন মানুষের মাঝে বেঁচে থাকবে সম্মানের সঙ্গে অথবা অসম্মানের সঙ্গে। পৃথিবীতে যারা স্মরণীয়-বরণীয় হয়ে অথবা তার সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে মানব হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন তাদের জীবন পৃথিবীতে স্থায়ী। তাদের মধ্যে নবী-রাসুল, জ্ঞানী-গুণী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী ও মনীষীদের নাম উল্লেখযোগ্য। তারা মরেও পৃথিবীতে অমর। আর যাদের অপকর্মে মানুষ নিষ্পেষিত ও নির্যাতিত, মানুষের মাঝে তারা বেঁচে থাকবে ঘৃণার পাত্র হিসেবে। পরবর্তী প্রজন্ম তাদের কোনো অপকর্মের সঙ্গে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করবে। মানবজীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও যুগ যুগ ধরে তারা বেঁচে থাকবে তাদের নিজ কর্মের মাধ্যমে।
ক্ষণস্থায়ী এই মানবজীবনে আল্লাহর নির্দেশিত পথে যারা জীবনকে অতিবাহিত করেছেন, আখেরাতে আল্লাহর আরশের সামনে বিচারে তারা সম্মানিত হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবেন। আর যারা স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে আল্লাহর বিধিনিষেধকে অমান্য করে পৃথিবীতে দ্বন্দ্ব-কলহ ও ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে মানুষকে অশান্তিতে রাখবে, তারা আখেরাতে কঠিন বিচারের সম্মুখীন হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আখেরাত শব্দের অর্থ হলো পরকালীন জীবন। মৃত্যুর পর যে অনন্ত অসীম সময় ধরে মানুষ দুনিয়ার কর্মের ফল লাভ করবে তাকে আখেরাত বলে। আর কেয়ামত শব্দের অর্থ ওঠা, পুনরুত্থান বা দণ্ডায়মান। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসুদ (রহ.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘কেয়ামত নিকৃষ্টতম মানুষের ওপর কায়েম হবে।’ হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘পৃথিবীতে যতক্ষণ একটা লোকও থাকবে যে আল্লাহ বলবে ততক্ষণ কেয়ামত কায়েম হবে না।’
মুসলিম শরিফের এক বর্ণনায় আছে, কেয়ামতের পূর্বে আল্লাহর নির্দেশে সিরিয়ার দিক থেকে একটি হিমেল বাতাস প্রবাহিত হবে, যে বাতাস মুসলমানদের শরীরে স্পর্শ করতেই তারা মারা যাবে। তারপর বেঁচে থাকবে কেবল নিকৃষ্ট লোকেরা। আর তারা মানুষ হত্যা ও রক্ত প্রবাহিত করার ক্ষেত্রে হবে হিংস্র প্রাণীদের মতো। তারা এতটা নির্লজ্জ হবে যে মানুষের সামনে পরস্পর ব্যভিচারে লিপ্ত হবে এবং তারা হবে কেয়ামতের শিকার।
মহররমের ১০ তারিখ জুমার দিন। মহান আল্লাহর নির্দেশে যখন হজরত ইসরাফিল (আ.) তাঁর শিঙায় প্রথম ফুঁ দেবেন, তখন পৃথিবীর সব মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তু মারা যাবে। আকাশ ফেটে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ ও নক্ষত্র ইত্যাদি আসমান থেকে ছিটকে পড়বে। পাহাড়গুলো তুলার ন্যায় উড়তে থাকবে এবং সৃষ্টিজগতের সবকিছু ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘সেদিন এ পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই ধ্বংস হয়ে যাবে। শুধু বাকি থাকবে তোমার রবের সত্তা, যিনি মহিমান্বিত ও সম্মানিত।’ তাই আসুন, আমরা ক্ষণস্থায়ী এই পৃথিবীতে হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে পরস্পরকে আপনভাবে গ্রহণ করি। সবাইকে ক্ষমা করে দিই। নিজ কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনাবোধ করি। আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করি। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে আল্লাহর নির্দেশিত পথ অবলম্বন করে পৃথিবীকে শান্তি ও সুখের আবাসস্থল হিসেবে গড়ে তুলি এবং পরকালের জীবনকে জান্নাতবাসীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করি।
লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান সমাজকর্ম বিভাগ মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ, ঢাকা
সময়ের আলো/কেএইচও