চলছে ২০১৯ সালের বসন্ত। সিরিয়ার সরকারি বাহিনী ও রুশ বিমান বাহিনী যৌথ আক্রমণ জোরদার করে অগ্রসর হচ্ছে ইদলিবের দিকে। এই মুহূর্তে হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) এর নেতা আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি, যিনি এখন আহমেদ আল-শারা নামে পরিচিত, এসময় ইদলিব শহরের কেন্দ্রে তার নিজস্ব বাড়িতে তুরস্কের অতথিদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। বৈঠকটি ছিল তার স্বপ্নকে ঘিরে, তিনি দামেস্কের আমির হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন ছোটবেলায়, তার এই স্বপ্ন একদিন বাস্তবে রূপ পাবে এটাও তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, এ স্বপ্ন ছিল তার আজকের বাস্তবের ঈশ্বরীয় ইঙ্গিত।
আজ, পাঁচ বছর পর, সেই জোলানি আর জঙ্গি গোষ্ঠীর কমান্ডার নন, তিনি সিরিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি—যে “আমির” হওয়ার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তার এক বাস্তব রূপ।
জিহাদি নেতা থেকে আধুনিক রাষ্ট্রনায়ক
জোলানির পরিচয় বদল হয়েছে নাটকীয়ভাবে। একসময় আল-কায়েদা নেটওয়ার্কে লড়াই করা এই ব্যক্তি আজ স্যুট-টাই পরেন, স্ত্রীকে পাশে নিয়ে আন্তর্জাতিক নেতাদের সঙ্গে দেখা করেন, দাড়ি ছেঁটে ফেলেছেন, প্রকাশ্যে ইসলামের কঠোর নীতি থেকে বেরিয়ে এসে সিরিয়াকে একটি নতুন রাষ্ট্রকাঠামো, যেখানে প্রকাশ্যভাবে ইসলামপন্থী প্রভাব থাকবে না এমনভাবে গড়ার চেষ্টা করছেন।
সিরিয়ার বহু সূত্র, তুর্কি ও আঞ্চলিক কর্মকর্তা এবং গবেষকদের বিশ্লেষণ বলছে, এই বদল কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। ইদলিবে তিনি যে রাষ্ট্র-সদৃশ কাঠামো নির্মাণ করেছেন যা এখন পরোক্ষভাবে তুরস্কের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, আর এর রাজনৈতিক নির্দেশনা এই পরিবর্তনের মূল চালিকা শক্তি।
তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের শুরু যেভাবে
২০১৭ সালে তার গোষ্ঠী বাব আল-হাওয়া সীমান্তপথ দখল করলে তুরস্ক এ পথটি বন্ধ করে দেয়। এতে চাপের মুখে জোলানি সীমান্ত পরিচালনার জন্য বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
তুরস্ক তখনো এইচটিএস-বিরোধী গোষ্ঠী আহরার আল-শাম ও নুরেদ্দিন জেঙ্গিকে সমর্থন দিচ্ছিল। কিন্তু ইদলিবে শারার ক্ষমতা বাড়তে থাকলে আঙ্কারার নিরাপত্তা দলটিও ধীরে ধীরে বদলে যায়, পুরনো কট্টরপন্থীদের সরিয়ে দেওয়া হয় এবং নতুন কর্মকর্তারা আলোচনার পথ খোলেন।
অস্তানা চুক্তি
অস্তানা চুক্তির অধীনে তুরস্ককে ইদলিবজুড়ে পর্যবেক্ষণ পোস্ট বসাতে হয়। এতে এইচটিএস-এর সঙ্গে এক ধরনের কার্যকর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
এক তুর্কি নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, জোলানিকে বোঝানো হয়েছিল যে ইদলিব কোনো একক গোষ্ঠীর শক্তিতে টিকে থাকতে পারবে না। এর ফলেই ২০১৭ সালে হায়াত তাহরির আল-শাম গঠিত হয়, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েকটি দল এক ছাতার নিচে আসে এবং “সিরিয়ান” পরিচিতি সামনে আনে।
এরপর, তুরস্কের পরামর্শে গঠিত হয় বেসামরিক প্রশাসন, যা এইচটিএস-কে সরাসরি “জঙ্গি প্রশাসন” হিসেবে চিহ্নিত করার বদলে বেসামরিক মুখোশ দেয়। তুরস্কের যুক্তি ছিল, এভাবে ইদলিবকে সিরিয়ার বিপ্লবের ধারাবাহক হিসেবে সামনে আনবে।
জোলানির কৌশল বদল
২০১৮ থেকে ২০ সালের দিকে শারা ক্রমাগত তুরস্কের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান। তার বক্তৃতা নরম হয়, চেহারা পালটে যায় এবং তিনি তুরস্ককে একমাত্র বন্ধু ভাবতে শুরু করে। কৌশলগতভাবে তিনি বুঝেছিলেন, রাশিয়া-তুরস্কের ইদলিব চুক্তি দুর্বল, বড় হামলা শুরু হলে তার নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়বে।
২০২০ সালের বড় যুদ্ধ ও তুরস্কের সরাসরি হস্তক্ষেপ
২০২০ শুরুর দিকে রাশিয়া ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীদের সহায়তায় সিরিয়ার সরকারি সেনারা ইদলিবে ব্যাপক আক্রমণ শুরু করলে তুরস্ক ১২হাজারের বেশি সৈন্য মোতায়েন করে এবং শত শত সরকারি স্থাপনায় হামলা চালায়।
এই পরিস্থিতিতে দুই পক্ষ আরও ঘনিষ্ঠ হয়। তুর্কি সেনাবাহিনী মাঠে থাকায় এইচটিএসকে নতি স্বীকার করতে হয়, তবে তাদের কিছু দাবি থাকে-ভারী অস্ত্র সরিয়ে ফেলা, যৌথ রুশ-তুর্কি টহল, এলাকাভিত্তিক সমঝোতা। অভ্যন্তরীণ কট্টরপন্থীরা এর বিরোধিতা করলে শারা তাদের দমন করতে বাধ্য হন।
আল-কায়েদাপন্থী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান
হুরাস আল-দিন, যারা শারার আল-কায়েদা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মেনে নিতে পারেনি, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান ছিল মোড় ঘোরানো ঘটনা। তুর্কি কর্মকর্তাদের মতে, এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে এইচটিএস প্রকৃত অর্থেই আল-কায়েদা থেকে দূরে সরে এসেছে। এর ফলে তুরস্ক দলটিকে নতুনচেতনায় গড়ে ওঠা দল হিসেবে দেখতে শুরু করে এবং তখন থেকেই শারার প্রতিনিধিরা তুরস্কে অবাধে যাতায়াতের সুযোগ পান।
তুর্কি প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, সংখ্যালঘুদের প্রতি সহনশীলতা বজায় রাখা, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কঠোর শরিয়াভিত্তিক শাসন এড়ানো। আঙ্কারা চায়নি যে তারা এমন একটি গোষ্ঠীকে রক্ষা করছে, যাদেরকে আন্তর্জাতিকভাবে সমস্যাজনক হিসেবে দেখানো যায়।
পশ্চিমে যোগাযোগের সুযোগ
২০২০ সালের শেষে শারা পশ্চিমা দেশের সঙ্গে তুরস্কের মাধ্যমে পরোক্ষ সম্পর্ক গড়ে ফেলেন। ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় কূটনীতিকেরা মানবিক সহায়তা ও প্রশাসনিক প্রশ্নে তার দলের সঙ্গে বৈঠক শুরু করেন। পাশাপাশি ২০১৯ থেকে ২২ সালে বিপুল সংখ্যক গবেষক ও থিংক-ট্যাঙ্ক প্রতিনিধিরা তুরস্কের অনুমতিতে ইদলিবে প্রবেশ করেন।
২০২১ সালে তার বিখ্যাত পিবিএস ফ্রন্টলাইন সাক্ষাৎকার, যেখানে প্রথমবার তাকে পশ্চিমা পোশাকে দেখা যায়, তার এই পরিবর্তনকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়। তুরস্ক সাক্ষাৎকার আয়োজন করেনি, কিন্তু বাধাও দেয়নি।
শারার প্রশাসন এরপর থেকে ইদলিবে কর আদায়, পুলিশ, ছোট ব্যবসা–উৎপাদন, নিরাপত্তা, সব মিলিয়ে একটি কার্যকর রাষ্ট্র গঠন করে।
রাশিয়ার মনোযোগ সরার সুযোগ
২০২২ সালে রাশিয়া যখন ইউক্রেন যুদ্ধে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেয়, তখন সিরিয়ায় তাদের সামরিক উপস্থিতি কমে যায়। পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে দেখেন জোলানি।
তুরস্ক তখন ইদলিবে এইচটিএস-নিয়ন্ত্রিত সামরিক একাডেমিতে বই তৈরি, অনুবাদ ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করে। আফগানিস্তান, মালি ও চেচনিয়া থেকে যুদ্ধ–অভিজ্ঞ যোদ্ধাদের জ্ঞানও কাজে লাগানো হয়।
একই সময়, যুক্তরাজ্যের জনাথন পাওয়েলের মধ্যস্থতায় ২০২৩ সালে এইচটিএস-এর রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
তুরস্কের অবস্থান বদল ও দ্রুত আক্রমণ
দীর্ঘদিন ধরে শারা নতুন আক্রমণের অনুমতি চাইছিলেন, কিন্তু তুরস্ক তা দিচ্ছিল না। পরিস্থিতি বদলায় যখন রাশিয়া ২০২৪ সালে তুরস্ককে প্রকাশ্যে দখলকারী রাষ্ট্র বলে আখ্যা দেয় এবং সিরিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহারের আল্টিমেটাম দেয়। অস্তানা বৈঠকও ব্যর্থ হলে তুরস্ক তার অবস্থান বদলায় এবং এইচটিএসকে পশ্চিম আলেপ্পো অভিমুখে আগানোর অনুমতি দেয়।
তারপর যা ঘটে, তা অনেকেরই অপ্রত্যাশিত, দ্রুত শহর ও গ্রামগুলোর একের পর এক পতন হয়। কাপ্তান আল-জাবাল দখলের পর পশ্চিম ফ্রন্টে অগ্রগতি থমকে গেলে উইঘুর যোদ্ধারা পুরোনো পানির টানেল দিয়ে ঢুকে পরিস্থিতি বদলে দেয়। আলেপ্পো পতনের পর জোলানি প্রচণ্ড উচ্ছ্বাসে ঘোষণা করেন, হে দামেস্কবাসী, সাক্ষী থাক, ইতিহাস লেখা হচ্ছে! একই গতিতে তারা দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে হামাও দখল করে।
এই ঘটনাগুলোই তার নিজের কাছে প্রমাণ করতে যথেষ্ট যে এবার তিনি সিরিয়ার নেতৃত্বে আসতে পারবেন।
পরিবর্তনের স্থপতি-শারা নাকি তুরস্ক?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শারার ব্যক্তিগত বিশ্বাস এখনো ইসলামপন্থী হলেও তিনি কঠোর মতাদর্শী নন, বরং বাস্তবের ওপর নির্ভরশীল। তুরস্ক তাকে ক্রমাগত চাপ, উৎসাহ ও সুযোগ দিয়ে একজন শক্তিশালী রাষ্ট্রনির্মাতাতে রূপান্তর করেছে। আজকের আহমেদ আল-শারা, যিনি সাবেক জিহাদি কমান্ডার, এই নতুন সিরিয়ার নায়কদের একজন।
/ইউএমএইচ