দীর্ঘ লড়াইয়ের পর অবশেষে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। অজস্র নেতা-কর্মী আর দেশের মানুষের ভালোবাসাকে সঙ্গী করে পাড়ি জমিয়েছেন পরপারে।
খালেদা জিয়ার জীবন ইতিহাসের আলো আর দুঃখগাথার আশ্চর্য এক মিশেলে গড়া—ক্ষমতার শীর্ষে ওঠার আগেই হারিয়েছিলেন অনেক কিছুই, এবং বারবার হোঁচট খেয়েও ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন।
১৯৭১ : শিশুদের নিয়ে বন্দি জীবন
১৯৭১ সালের ২ জুলাই। ঢাকার সিদ্ধেশরী। পাকিস্তানি সেনারা জনাব এস আব্দুল্লাহর বাসা থেকে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করে। তখন তিনি একা নন, সঙ্গে তার দুই ছোট ছেলে। একজন মা, দুই শিশু—তিনজনকেই নিয়ে নেওয়া হয় ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়।
এই বন্দিত্ব কোনো প্রতীকী ঘটনা নয়। এটি প্রায় সাড়ে পাঁচ মাসের বাস্তব বন্দিজীবন—২ জুলাই থেকে ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত। চারপাশে যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা, ভয়। বাইরে দেশ জ্বলছে, ভেতরে একজন মা প্রতিদিন জেগে থাকছেন—এই বুঝি ছেলেদের কিছু হলো। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়। সেই স্বাধীনতার সাথেই মুক্তি পান খালেদা জিয়াও।
১৯৮১ : স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যু
১৯৮১ সালের ৩০ মে। এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন তখনকার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। খবরটি আসে হঠাৎ, নির্মমভাবে। সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় একটি পরিবারের জীবন।
খালেদা জিয়া তখন শুধু একজন রাজনীতিকের স্ত্রী নন। তিনি একজন স্ত্রী, যিনি স্বামীকে হারালেন; একজন মা, যিনি দুই ছেলেকে নিয়ে হঠাৎ একা হয়ে গেলেন। এই মৃত্যু কোনো অসুস্থতার পরিণতি ছিল না, ছিল সহিংসতা ও ষড়যন্ত্রের ফল। এই ট্র্যাজেডি তার জীবনের সবচেয়ে বড় মোড়—যেখানে শোকের মধ্যেই তাকে দাঁড়াতে হয়েছিল।
নিঃসঙ্গতা ও অবিশ্বাসের রাজনীতি
স্বামীর মৃত্যুর পর খালেদা জিয়ার জীবনে শুরু হয় আরেক ধরনের যন্ত্রণা—নিরবচ্ছিন্ন অবিশ্বাস, রাজনৈতিক বিদ্বেষ, ব্যক্তিগত আক্রমণ। তিনি বারবার বুঝেছেন, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলেও একজন নারী কতটা একা হয়ে পড়তে পারেন।
এই নিঃসঙ্গতা কেবল রাজনৈতিক ছিল না। এটি ছিল সামাজিক ও মানসিক। বন্ধু কমেছে, সম্পর্ক বদলেছে, বিশ্বাস ভেঙেছে। জীবনের বহু বছর তিনি কাটিয়েছেন এমন এক পরিবেশে, যেখানে প্রতিটি দিন ছিল সাবধানতার।
২০০৭–২০০৮ : কারাগার ও মানসিক যন্ত্রণা
২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা মামলায় খালেদা জিয়া পুত্রসহ গ্রেফতার হন। শুরু হয় আরেক অধ্যায়—কারাগার।
এক বছর সাত দিন। দীর্ঘ এই সময়ে তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক ও প্রশ্ন থেকেই গেছে। কিন্তু কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার আগেই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন—এই বন্দিত্ব শুধু আইনি নয়, এটি মানসিক ও শারীরিক শাস্তিও।
২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের নির্দেশে তিনি মুক্তি পান। কিন্তু সেই সময়ের অপমান, অনিশ্চয়তা ও একাকিত্ব তার শরীর ও মনে স্থায়ী ছাপ রেখে যায়।
সন্তানের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা
২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বরই তার বড় ছেলে তারেক রহমান লন্ডনে যান। এরপর থেকে পরিবারসহ সেখানেই অবস্থান। এটি ছিল শুধু একটি বিদেশযাত্রা নয়—এটি ছিল এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা। মা ও ছেলের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয় ভূগোলের, রাজনীতির, পরিস্থিতির কারণে।
একজন মা হিসেবে এই দূরত্ব ছিল আরেকটি নীরব কষ্ট—যা প্রকাশ্যে খুব কমই বলা হয়েছে।
কোকোর মৃত্যু—সবচেয়ে গভীর আঘাত
২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো হৃদরোগে আক্রান্ত হন। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এই মৃত্যু ছিল খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত, সবচেয়ে নির্মম ট্র্যাজেডি। রাজনীতি এখানে অর্থহীন। ক্ষমতা এখানে কোনো সান্ত্বনা দেয় না। একজন মা তাঁর সন্তানকে হারান—এই সত্যের সামনে সব পরিচয় ভেঙে পড়ে।
অসুস্থতা ও ধীরে ধীরে নিঃশেষ হওয়া
২০২৮ সালে দুর্নীতি মামলায় মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ড পেয়ে আবার জেল। আবার একাকিত্ব। বয়স বেড়েছে, শরীরও ভেঙেছে। ২০১৯ সালে তাকে জেল থেকে হাসপাতালে নিতে হয়। ২০২০ সালে মানবিক কারণে ছয় মাসের জন্য গৃহবন্দি করে মুক্তি দেওয়া হয়।
অসংখ্য ট্র্যাজেডির পরও ভেঙে পড়েননি
খালেদা জিয়ার জীবনের এই ট্র্যাজেডিগুলো তাকে মহান প্রমাণ করার জন্য নয়। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, এগুলো আমাদের দেখায়—ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মানুষদের জীবনেও কত বিপর্যয় আসতে পারে।
তিনি হারিয়েছেন স্বাধীনতা, স্বামী, সন্তান, স্বাস্থ্য, স্বাভাবিক জীবন। তবু তিনি ভেঙে পড়েননি প্রকাশ্যে। তার ট্র্যাজেডিগুলো তাই আর্তনাদ নয়—নীরব সহনশীলতার ইতিহাস।
সময়ের আলো/এআর