ইসলামের ইতিহাসে যেসব শাসক ন্যায়, ইনসাফ ও আত্মসংযমের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তাদের মধ্যে হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) সর্বাগ্রে স্মরণীয়। বিশাল ইসলামি সাম্রাজ্যের শাসনভার তাঁর হাতে ন্যস্ত হলেও তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত অনাড়ম্বর, সহজ ও সংযত। ক্ষমতা, সম্পদ ও প্রতিপত্তি তাঁকে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করতে পারেনি। বরং তাঁর জীবনে যতই দায়িত্ব বেড়েছে, ততই বেড়েছে বিনয় ও আল্লাহভীতি। হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) অর্ধ পৃথিবীর শাসক হয়েও সাধারণ মানুষের মতোই জীবনযাপন করতেন। তাঁর পোশাক থাকত তালিযুক্ত, খাদ্যাভ্যাস ছিল সাদাসিধা, আর বাসস্থান ছিল অতি সাধারণ। তিনি কখনোই রাষ্ট্রের সম্পদকে নিজের আরাম-আয়েশের জন্য ব্যবহার করেননি। প্রতিটি দিরহাম ও দিনারের হিসাবের ক্ষেত্রে নিজেকে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহির আওতায় মনে করতেন। একবার মসজিদে নববীতে খুতবা দেওয়ার সময় তাঁর গায়ের জামায় ১২টি তালি ছিল।
সাহাবায়ে কেরাম (রা.) একদিন পরস্পরের মধ্যে আলোচনা করলেন। আল্লাহ তায়ালা হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর হাতে রোম ও পারস্যের মতো পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যগুলোর পতন ঘটিয়েছেন। এখন দূর-দূরান্তের বহু দেশ থেকে প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রীয় অতিথিরা নিয়মিত তাঁর দরবারে উপস্থিত হচ্ছেন। এমন অবস্থায় আমিরুল মুমিনিন যদি তাঁর বহুবার তালি দেওয়া সাধারণ পোশাকের পরিবর্তে কিছুটা পরিপাটি ও মানানসই পোশাক গ্রহণ করতেন, তবে তা মদিনার ইসলামি রাষ্ট্রের মর্যাদার জন্যও শোভন হতো। কিন্তু এই কথা সরাসরি খলিফা ওমর (রা.)-এর সামনে উপস্থাপন করার মতো সাহস কারও হলো না। অবশেষে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় দুই সহধর্মিণী হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) ও হজরত সাফিয়া (রা.) এই বিষয়টি তাঁর কাছে উত্থাপন করবেন। তাঁরা উভয়ে খলিফা ওমর (রা.)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে বিনীতভাবে আরজ করলেন, ‘হে আমিরুল মুমিনিন! আল্লাহ তায়ালা আপনার মাধ্যমে রোম ও পারস্যের পতন ঘটিয়েছেন। এখন পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে অসংখ্য রাষ্ট্রদূত ও রাষ্ট্রীয় অতিথিরা আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। আপনি যদি এই বহু তালি দেওয়া জামার পরিবর্তে কিছুটা নরম ও সুন্দর পোশাক পরিধান করেন এবং নিয়মিত উন্নত আহার গ্রহণ করেন, তা হলে আপনার ব্যক্তিত্ব ও প্রভাব আরও বিস্তৃত হবে।’
এই কথা শুনে হজরত ওমর (রা.)-এর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি আবেগভরা কণ্ঠে বললেন, ‘এই প্রস্তাবের জবাব তোমাদেরই দিতে হবে।’ তারপর তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘তোমরা বলো তো রাসুলুল্লাহ (সা.) কি কখনো যবের রুটি ত্যাগ করে গমের রুটি খেয়েছেন? তিনি কি কোনো দিন নরম বিছানায় আরাম করে শুয়েছেন কিংবা বিলাসী কোনো পোশাক পরিধান করেছেন?’ হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিলেন, ‘না, আল্লাহর রাসুল (সা.) কখনো এমন করেননি।’ এ কথা শুনে খলিফা ওমর (রা.) বললেন, ‘তবে জেনে রেখো, আমিও আমার দুই প্রিয় সঙ্গী নবীজি (সা.) ও আবু বকর (রা.)-এর পথ ছেড়ে অন্য পথে হাঁটব না। আল্লাহর শপথ! তোমাদের কে আমার কাছে পাঠিয়েছে, যদি আমি তা জানতে পারতাম, তবে তাকে কঠোরভাবে সতর্ক করতাম।’ এভাবেই তালিযুক্ত পোশাকের আড়ালে ফুটে ওঠে অর্ধ পৃথিবীর এক প্রভাবশালী খলিফার অতুলনীয় সংযম, নবীজি (সা.)-এর সুন্নতের প্রতি অটল আনুগত্য এবং দুনিয়ার জাঁকজমকের প্রতি নিরাসক্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রকৃতপক্ষে শাসকের মর্যাদা তো তার পোশাক, প্রাসাদ বা বাহ্যিক জাঁকজমকে নয়, বরং তার ন্যায়পরায়ণতা, দায়িত্ববোধ ও আমানতদারিতায়। এই অনাড়ম্বর জীবনধারা তাঁকে জনগণের আরও কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল। রাতের অন্ধকারে ছদ্মবেশে তিনি মদিনার অলিগলি ঘুরে বেড়াতেন। ক্ষুধার্ত, অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের খোঁজখবর নিতেন। শাসকের আসনে থেকেও সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার এই মানসিকতাই তাঁকে ইতিহাসের এক অতুলনীয় আদর্শে পরিণত করেছে।
মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা
এএডি/