ইসলাম স্বভাবজাত ধর্ম। মানবতার ধর্ম; মানব স্বভাবের সব চাওয়া ইসলাম পূরণ করেছে, মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ ও সুন্দর বিধান দিয়েছে। খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রেও ইসলাম অত্যন্ত সচেতন ও মধ্যপন্থি নীতি অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। খাওয়া-দাওয়ায় মিতাচার, পরিমিতি এবং সংযম এই তিনটি গুণই মুমিনের জীবনকে সুস্থ, সুন্দর ও বরকতময় করে তোলে। অতিরিক্ত খাওয়া বা অপচয় করা যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি প্রয়োজনের চেয়ে কম খেয়ে শরীরকে কষ্ট দেওয়াও ইসলামে পছন্দনীয় নয়। আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন, ‘হে আদম সন্তান! তোমরা প্রত্যেক নামাজের সময় সাজসজ্জা গ্রহণ করো এবং খাও ও পান করো, (কিন্তু) অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৩১)। এই আয়াতে একই সঙ্গে তিনটি নির্দেশনা এসেছে ১. খাও, পান করো; অর্থাৎ আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত উপভোগ করো। ২. সাজসজ্জা গ্রহণ করো, জীবনকে সুন্দর করো। ৩. কিন্তু অপচয় করো না, সীমালঙ্ঘন করো না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে ছিলেন পরিমিত খাদ্য গ্রহণের সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি কখনো দুটি খেজুর একসঙ্গে মুখে দিতেন না। তিনি বলেছেন, ‘মানুষ পেটের চেয়ে অধিক মন্দ পাত্র কখনো ভর্তি করে না। মানুষের জন্য কয়েক লোকমা যথেষ্ট, যা তার পিঠ সোজা রাখে। তবু যদি সে বেশি খেতে চায়, তা হলে তার পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে’ (তিরমিজি : ২৩৮০; ইবনে মাজাহ : ৩৩৪৯)। এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয় যে, অতিরিক্ত খাওয়া অপচয়, বরং এটি শারীরিক ও রুহানি ক্ষতির কারণ। অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ পেটের রোগ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ নানা রোগের জন্ম দেয় এবং ইবাদত-বন্দেগিতে অলসতা ও অমনোযোগ সৃষ্টি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘মুমিন যখন খায় তখন একটি অন্ত্রে খায়, আর কাফের খায় সাতটি অন্ত্রে’ (বুখারি : ৫৩৯৫; মুসলিম : ২০৬৪)।
অর্থাৎ মুমিন পরিমিত খায়, যা তার শক্তি বজায় রাখে; আর অতিরিক্ত খাওয়া অমুমিনের লক্ষণ। হজরত আলি (রা.) বলতেন, ‘পেট ভরে খাওয়ার পর ইবাদত করা যায় না’ (কাশফুল খিফা, আজলুনি, হাদিস : ২৭৩৬)। আর ইমাম গাজালি (রহ.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পেট ভরে খায়, তার দুটি জিনিস নষ্ট হয় এক. তার শরীর। দুই. তার অন্তর।’ (ইহইয়া উলুমুদ্দিন : ১০৭)
অন্যদিকে অতিরিক্ত কম খাওয়া বা অনাহারে থাকাও ইসলামে নিন্দিত। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিন ব্যক্তি (অতিরিক্ত ইবাদতের নামে) স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকার সংকল্প করল। একজন বলল, ‘আমি সারাজীবন রোজা রাখব, কখনো ইফতার করব না।’ আরেকজন বলল, ‘আমি কখনো ঘুমাব না।’ তৃতীয়জন বলল, ‘আমি আর মাংস খাব না।’ এ কথা নবীজি (সা.)-এর কানে গেলে তিনি বললেন, ‘যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আমিই তোমাদের মধ্যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করি এবং সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান। কিন্তু আমি রোজা রাখি আবার ইফতারও করি, রাতে নামাজ পড়ি আবার ঘুমাই, মাংস খাই এবং বিয়ে করি।
যে ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে আমার দলভুক্ত নয়’ (বুখারি : ৫০৬৩; মুসলিম : ১৪০১)। এই হাদিস থেকে স্পষ্ট যে, খাওয়া-দাওয়া একেবারে ছেড়ে দেওয়া বা অতিরিক্ত কম খেয়ে শরীরকে কষ্ট দেওয়া রাসুল (সা.)-এর সুন্নতের বিরুদ্ধে এবং তা গ্রহণযোগ্য নয়। আজকের যুগে আমরা দেখি, অনেকে খাবারের প্লেটে অতিরিক্ত খাবার তুলে নেয়, অতঃপর অর্ধেক ফেলে দেয়। বিয়ের অনুষ্ঠান, দাওয়াত বা হোটেলে এই অপচয়ের চিত্র আরও ভয়াবহ। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘খাবার ফেলে দেওয়া শয়তানের প্রিয় কাজ এবং অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত’ (ইবনে মাজাহ : ৩৩১৩)।
কিছু বর্ণনায় এসেছে যে, ‘এমন ব্যক্তি অভিশপ্ত’ (আত-তারগিব ওয়াত তারহিব)। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হালাল ও পবিত্র খাদ্য গ্রহণ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হারাম খাদ্য দিয়ে গড়া শরীর জান্নাতে প্রবেশ করবে না’ (তাবরানি)। তাই খাদ্যে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
ইবাদত কবুল হওয়ার জন্যও অপরিহার্য। যে ব্যক্তি পরিমিত ও হালাল খাদ্য গ্রহণ করে তার শরীর সুস্থ থাকে, মন প্রফুল্ল থাকে এবং ইবাদতে একাগ্রতা আসে। যে জাতি খাদ্যে মিতাচার করে আল্লাহ তাদের রিজিকে বরকত দান করেন, আর যে জাতি অপচয় করে তাদের থেকে বরকত উঠে যায়।