পাহাড়ি দ্বীপের গল্প

আব্দুস সাত্তার সুমন

কক্সবাজারের সকালটা সেদিন ছিল অন্যরকম। সমুদ্রের শহর হয়েও মনে হচ্ছিল আজ আমরা সমুদ্র ছেড়ে আরও গভীর কোনো গল্পের দিকে যাচ্ছি।

2026-01-10T03:07:35+00:00
2026-01-10T03:07:35+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
পাহাড়ি দ্বীপের গল্প
আব্দুস সাত্তার সুমন
প্রকাশ: শনিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:০৭ এএম   (ভিজিট : ১৬০)
সংগৃহীত ছবি
কক্সবাজারের সকালটা সেদিন ছিল অন্যরকম। সমুদ্রের শহর হয়েও মনে হচ্ছিল আজ আমরা সমুদ্র ছেড়ে আরও গভীর কোনো গল্পের দিকে যাচ্ছি। সুমন চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পাশে স্ত্রী সাহারা, আর সামনে উৎসাহে টগবগ করা ছেলে সাঈদুল ও কৌতূহলী চোখে তাকানো মেয়ে সুবাহ। সাহারা হালকা হাসি দিয়ে বললেন, আজ মনে হচ্ছে ভ্রমণটা শুধু বেড়ানো হবে না। সুমন জবাব দিলেন, হ্যাঁ, আজ মনে হয় একটা গল্প জমবে।

সিএনজিতে করে তারা পৌঁছালেন নোনারছড়ি ঘাটে। ঘাটে দাঁড়ানো সী-ট্রাকটি দেখে সাঈদের চোখ বড় হয়ে গেল। আব্বু, আমরা কি জাহাজে যাব? হ্যাঁ বাবা, আজ নদী আর সাগর আমাদের পথ দেখাবে। জাহাজ ছাড়তেই বাকখালী খাল পেছনে পড়ে গেল। ধীরে ধীরে তারা ঢুকে পড়লেন কোহেলিয়া নদীতে। বাতাসে লবণের গন্ধ, জলে সূর্যের আলো সব মিলিয়ে মনটা অদ্ভুতভাবে হালকা হয়ে এলো।

একপাশে হঠাৎ দেখা দিল বিশাল বঙ্গোপসাগর। ঢেউয়ের শব্দে সুবাহ মায়ের হাত চেপে ধরল। আম্মু, সমুদ্র কি এত বড়? হ্যাঁ মা, সাহারা বললেন, আর সে আমাদের অনেক কথা শেখায়। জেঠিঘাট পার হয়ে জাহাজ যখন মহেশখালীর দিকে এগোতে লাগল, সুমনের মনে হলো তারা যেন ধীরে ধীরে শহরের চেনা জীবন থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছেন।

মহেশখালী পৌঁছে আবার সিএনজিতে যাত্রা। পানিরছড়া শান্তি বাজার নামতেই চারপাশের শান্ত পরিবেশ মন ছুঁয়ে গেল। এরপর নোনারছড়া হয়ে প্রায় ২৫ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে তারা পৌঁছালেন রাহেলা আপার বাড়িতে। অচেনা মানুষ, অথচ এমন আপন ব্যবহার ভ্রমণের ক্লান্তি কোথায় যে মিলিয়ে গেল, বোঝাই গেল না।

বিকালের দিকে সবাই মিলে বের হলেন। প্রথমে বৌদ্ধ বিহার স্বর্ণমন্দির। সোনালি আভা আর নিস্তব্ধ পরিবেশে দাঁড়িয়ে সাহারা চোখ বন্ধ করে একটু সময় নিলেন। মনে হলো এই নীরবতাও এক ধরনের প্রশান্তি। এরপর শুরু হলো পাহাড়ের গল্প আদিনাথ মন্দির। উঁচু উঁচু সিঁড়ি দেখে সুবাহ একটু থমকে দাঁড়াল। আব্বু, আমরা উঠতে পারব? সুমন হাত বাড়িয়ে বললেন, ভয় পেও না মা, পাহাড় সাহস শেখায়।

সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে ক্লান্তি এলো, কিন্তু চূড়ায় পৌঁছে সবাই নিঃশব্দ হয়ে গেল। দূরে সমুদ্রের নীল রেখা, নিচে নোনা বনাঞ্চল, আর সবুজে মোড়া মহেশখালীর পান-বরাগ দৃশ্যটা যেন চোখে নয়, হৃদয়ে গেঁথে যাওয়ার মতো। সন্ধ্যায় তারা গেলেন নতুন জেটিঘাটে। সেদিন অমাবস্যা চাঁদহীন আকাশ। চারপাশ অন্ধকার, শুধু সমুদ্রের গর্জন।

সবাই পাশাপাশি বসে রইলেন। কোনো কথা নেই, তবু মনে হচ্ছিল এই নীরবতাই তাদের সবচেয়ে কাছাকাছি এনে দিয়েছে। পরদিন সকালে দেখা হলো নতুন বিস্ময় লবণ তৈরির মাঠ। নোনা পানি রোদে শুকিয়ে সাদা লবণে পরিণত হচ্ছে। সুমন ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, দেখছ সাঈদ, সহজ জিনিসের পেছনেও কত পরিশ্রম লুকিয়ে থাকে। পথে বিশাল পদ্মফুলের বিল, সারি সারি শাপলা ফুল, আর শীতের অতিথি পাখির আনাগোনা এবং সারি সারি মহিষের পাল। সুবাহ খুশিতে হেসে উঠল প্রকৃতি যেন তার নতুন বন্ধু।

দুপুরে রাহেলা আপার বাড়িতে খাবারের আয়োজন ছিল স্মরণীয় নোনাপানির কাঁকড়া, সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি, দেশি মুরগি, গরুর মাংস আর নানারকম সবজি। সাহারা বললেন, এই খাবারের স্বাদ শুধু জিভে না, মনে লাগে। রাতটা কেটে গেল লুডু খেলা, দাবা খেলা গল্প আর হাসিতে। ফেরার সময় সুবাহ হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, আব্বু আমরা আবার আসব তো? সুমন হেসে বললেন, মহেশখালী একবার গেলে মন এখানেই থেকে যায়। ফেরার পথে সবার মনে একটাই অনুভূতি : এই পাহাড়ি দ্বীপ শুধু দেখা নয়, এটা অনুভব করার গল্প।

এএডি/


Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: