সম্প্রতি আমাদের দেশে মানুষ হত্যা একটি মামুলি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পত্রিকার পাতা খুললেই কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই চোখে পড়ে নৃশংস হত্যা ও রক্তপাতের খবর। কোথাও তুচ্ছ বিরোধ, কোথাও ক্ষমতার দাপট, জীবনের মূল্য যেন দিন দিন সস্তা হয়ে যাচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রে পশু হত্যার বিচার মিললেও মানুষ হত্যার বিচার পাওয়া যায় না। কিছু দিন আগে কুকুরছানা হত্যার দায়ে এক সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রীকে নবজাতক শিশুসহ কারাগারে যেতে হয়েছে, কিন্তু এ দেশে কত খুনি খুন করেও শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে যায়! কত খুনি জামাই আদরে কারাগারে দিন কাটায়! ইসলামে মানুষ হত্যা তো দূরের কথা, বিনা প্রয়োজনে কোনো প্রাণীকে হত্যার অনুমতি নেই, চাই সে প্রাণী যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন। কেউ এমন অপরাধ করলে পরকালে তাকে জবাবদিহি করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অহেতুক কোনো চড়ুই পাখিকে যে হত্যা করবে, কেয়ামতের দিন সে আল্লাহর কাছে নালিশ করবে, হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি আমাকে অযথা হত্যা করেছে।’ (সুনানে নাসায়ি : ৪৪৪৬)
আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে সম্মানিত করেছেন। উত্তম রিজিক দিয়েছেন। অন্যান্য সৃষ্টির মাঝে দিয়েছেন শ্রেষ্ঠত্ব। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘বাস্তবিক পক্ষে আমি আদমসন্তানকে মর্যাদা দান করেছি। জলে ও স্থলে তাদের জন্য বাহনের ব্যবস্থা করেছি, তাদের উত্তম রিজিক দান করেছি এবং আমার বহু মাখলুকের ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ৭০)। অন্যায়ভাবে রক্তপাত ও নরহত্যাকে ইসলাম ভয়াবহ অপরাধ সাব্যস্ত করেছে। ইসলামে যেসব অপরাধের সাজা মৃত্যুদণ্ড, সেসব অপরাধ আদালতে প্রমাণিত না হলে কাউকে হত্যা করা সম্পূর্ণ হারাম। শক্তি বা ক্ষমতার জোরে অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করার বিন্দুমাত্র অধিকার কারও নেই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা যে প্রাণকে হত্যা করা হারাম করেছেন, তাকে হত্যা করো না; তবে যদি তার বিরুদ্ধে শরিয়তসম্মত কারণ প্রতিষ্ঠিত হয়, তা ভিন্ন বিষয়’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ৩৩)। অন্যত্র আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করে না, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না তারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা। আর যে কেউ এসব অপরাধ করবে, কেয়ামতের দিন তার শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে এবং সে লাঞ্ছিত অবস্থায় তাতে (জাহান্নামে) চিরকাল থাকবে’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৬৮-৬৯)। হাদিস শরিফে মুসলিমের সঙ্গে লড়াইয়ে লিপ্ত হওয়াকে কুফর বলা হয়েছে। (সহিহ বুখারি : ৪৮)
একজন মুসলিমের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোই যদি এমন ভয়াবহ অপরাধ হয়, তবে তাকে হত্যা করা যে কত বড় গুনাহ, তা সহজেই অনুমেয়। হত্যা জঘন্য পাপাচারের অন্যতম (সহিহ বুখারি : ৬৮৭১)। ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। চিরস্থায়ী শাস্তির হুঁশিয়ারি রয়েছে এ ক্ষেত্রে। রয়েছে আল্লাহর গজব ও লানতের ধমকিবাণী। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমকে জেনেশুনে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম, যাতে সে সর্বদা থাকবে এবং আল্লাহ তার প্রতি গজব নাজিল করবেন ও তাকে লানত করবেন। আর আল্লাহ তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৯৩)।
একজন মানুষকে হত্যা করা সংখ্যার বিবেচনায় তো মাত্র একটিই প্রাণহানি; কিন্তু আল্লাহ তায়ালার কাছে এ একটি হত্যার অপরাধ পুরো মানবজাতিকে হত্যা করার সমতুল্য। পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘যে কেউ হত্যা বা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টির অপরাধ ছাড়া কাউকে হত্যা করে, সে যেন পুরো মানবজাতিকে হত্যা করল। আর যে কেউ একটি প্রাণ রক্ষা করে, সে যেন পুরো মানবজাতির প্রাণ রক্ষা করল।’ (সুরা মায়িদাহ, আয়াত : ৩২)
একজন মুমিনের মর্যাদা আল্লাহর কাছে পুরো দুনিয়ার চেয়েও বেশি। পুরো দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চেয়েও একজন মুমিনের হত্যাকাণ্ড আল্লাহর কাছে গুরুতর। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একজন মুমিনকে হত্যা করা আল্লাহর কাছে পুরো পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার চেয়েও গুরুতর’ (সুনানে নাসায়ি : ৩৯৮৮)। তা ছাড়া ইচ্ছাকৃত হত্যা তওবার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ চাইলে সব গুনাহই ক্ষমা করবেন, কিন্তু কেউ যদি মুশরিক অবস্থায় মারা যায়, অথবা কোনো মুমিন ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য মুমিনকে হত্যা করে, তবে তার জন্য ক্ষমা নেই’ (সুনানে নাসায়ি : ৩৯৮৪)। আরেক বর্ণনায় এসেছে, ‘কেয়ামতের দিন নিহত ব্যক্তি তার হত্যাকারীকে ধরে আল্লাহর সামনে উপস্থিত করবে এবং অভিযোগ করবে।’ (জামে তিরমিজি: ৩০২৯)
খুন-খারাবি প্রতিরোধে একমাত্র কার্যকরী উপায় হচ্ছে, কিসাস (প্রাণের বদলে প্রাণ)। কিসাসের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, (হে বুদ্ধিমানরা!) কিসাসের ভেতর রয়েছে, তোমাদের জন্য জীবন রক্ষার ব্যবস্থা (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৭৯)। ইসলামে মানুষ হত্যা ভয়াবহ অপরাধ। এটি কেবল ব্যক্তির বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো সমাজ ও মানবতার বিরুদ্ধে এক মহা অন্যায়। তাই মানবিক সমাজ গঠনের জন্য প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব হলো, মানবজীবনের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষা করা। সমাজে যদি মানবজীবনের মূল্য সম্পর্কে সচেতনতা না বাড়ে, তবে অপরাধীর হাতে নিরপরাধ মানুষের রক্তপাত অব্যাহতই থাকবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব সুস্পষ্ট। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের মৌলিক কর্তব্য। রাষ্ট্র যদি হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধে দোষীদের জনসম্মুখে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করত, তবে অনেক ক্ষেত্রেই খুন-খারাবির প্রবণতা কমে আসত। তাই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রÑ সবার সম্মিলিত সচেতনতা এবং ন্যায়ভিত্তিক শাসনই পারে মানবজীবনের মর্যাদা রক্ষা করতে, আর হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ থেকে সমাজকে দূরে রাখতে।
লেখক : শিক্ষক, মাদরাসা দারুল উলুম আল ইসলামিয়া, সাতবাড়িয়া, চান্দিনা, কুমিল্লা।
সময়ের আলো/জেডআই