সম্পদ খরচে হিসাব প্রয়োজন

মুফতি আবদুল্লাহ নোমান

সবকিছু খরচের ক্ষেত্রেই হিসাব প্রয়োজন। বেহিসাবি খরচকে ‘অপচয়’ শব্দে বিবৃত করা হয়। এটা যে শুধু টাকা-পয়সার ক্ষেত্রেই হয় এমন নয়;

2026-01-15T06:32:36+00:00
2026-01-15T06:32:36+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
সম্পদ খরচে হিসাব প্রয়োজন
মুফতি আবদুল্লাহ নোমান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ৬:৩২ এএম 
সংগৃহীত ছবি
সবকিছু খরচের ক্ষেত্রেই হিসাব প্রয়োজন। বেহিসাবি খরচকে ‘অপচয়’ শব্দে বিবৃত করা হয়। এটা যে শুধু টাকা-পয়সার ক্ষেত্রেই হয় এমন নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি নেয়ামতের ক্ষেত্রেই হতে পারে অপচয় এবং অপব্যয়। 

হোক সেটা অর্থকড়ি, পানি, গ্যাস, মেধা, বুদ্ধি, সময়, জীবন, যৌবন কিংবা অন্য কিছু। সব ক্ষেত্রেই অপচয় নিষিদ্ধ, ঘৃণিত, বর্জনীয়। বিশ্বমানবতার অনুপম রূপকার প্রিয় নবী (সা.) জীবনের সব ক্ষেত্রে অপব্যয়কে নিষেধ করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পানাহার করো। দান-সদকা করো। পোশাক পরিধান করো। তবে অহংকার ও অপচয় করে নয়’ (মুসনাদে আহমদ : ৬৬৯৫)। 

দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে মুসলিম সমাজে বিয়ে-শাদি, নানা অনুষ্ঠান, পানাহার, সাজসজ্জা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রচুর অপচয় হয়ে থাকে। নাটক-সিনেমা, ডিজে পার্টি, নাচ-গানের আসর, মদ্যপান এবং জুয়া খেলায় অভিশপ্ত অপচয় জাহেলি যুগকেও হার মানায়। বিশ্বকাপ, ক্রিকেট, ইত্যাদিতেও শত শত কোটি টাকা অপচয় করা হয়। পরকালে এর জন্য কঠিন জবাবদিহি করতে হবে। জাহান্নামের শাস্তি তো আছেই। দুনিয়াতেও এর ভয়াবহ পরিণাম আমাদের সমাজে ভূরি ভূরি। মনে রাখতে হবে, যারা সচ্ছলাবস্থায় অপচয় করে, দুর্দিনে তাদের এর চরম খেসারত ও প্রায়শ্চিত্ত দিতে হয়।

অপচয়কারী শয়তানের ভাই : সম্প্রতি সারা বিশ্বেই জ্বালানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়েছে সবখানে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়ছে অনেক মিল-কারখানা, ফিলিং স্টেশন ও নানা কার্যালয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। সচেষ্ট হতে বলা হয়েছে, জ্বালানি অপচয় রোধে। এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে সত্যি বলতে কী, স্বীকার করি আর না করি, বিদ্যুতের এ দৈন্য আমাদেরই কর্মফল। 

সংকটে পড়ার পর সবার টনক নড়ে। তখন পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বুঝে আসে শরিয়তের শাশ্বত বিধানের যৌক্তিকতা। অথচ ইসলাম চৌদ্দশ বছর আগেই সচ্ছলতা ও সংকট সর্বাবস্থায় অপচয়কে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। অপচয়-স্বভাবকে অগাধ ঘৃণা জানিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘আত্মীয়কে তার প্রাপ্য দিয়ে দাও এবং মিসকিন ও মুসাফিরকেও; তবে কিছুতেই অপব্যয় করো না। সন্দেহ নেই, যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই, আর শয়তান তার প্রভুর প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ২৬-২৭)। 

মুমিন বলেই নয়, ‘শয়তানের ভাই হওয়া’ পৃথিবীর কোনো সভ্য মানুষের প্রার্থনীয় বিষয় হতে পারে না। হতে পারে না কাক্সিক্ষত ও স্বস্তির বিষয়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আত্মমর্যাদাশীল যেকোনো ব্যক্তির জন্য এটি একটি নিকৃষ্টতম উদাহরণ। মহান আল্লাহ অপচয়কে নিষেধ করে অন্যত্র ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা খাও এবং পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয় আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা আরাফ : ৩১) 


দানেও মিতব্যয়িতা : মানবতার ধর্ম ইসলাম দান-সদকাকে যারপরনাই উৎসাহিত করেছে। তবে এ ক্ষেত্রেও ভুলে যায়নি মধ্যপন্থার সুস্থ নিরাপদ রেখার কথা। আল্লাহ তায়ালা পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, ‘(কৃপণতাবশে) নিজের হাত ঘাড়ের সঙ্গে বেঁধে রেখো না এবং (অপব্যয়ী হয়ে) তা সম্পূর্ণরূপে খুলে রেখো না; যার কারণে তোমাকে নিন্দাযোগ্য ও অসহায় হয়ে বসে পড়তে হবে’ (সুরা বনি ইসরাইল : ২৯)। 

বলাবাহুল্য, দান করা সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। আর কার্পণ্য ও আত্মকেন্দ্রিকতা লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার ইঙ্গিত। তাই বলে সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে নিজে কিংবা পরিবারকে পথে বসাবে- এমন বিবেকহীন কাজ শরিয়ত অনুমোদন করে না। বরং পবিত্র ইসলামের শিক্ষা হলো, শরীর ও মেধায় কাজের উপযুক্ত প্রতিটি মানুষ কর্মচাঞ্চল্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। শ্রমে-ঘামে অর্জিত সফলতায় হাসিয়ে তুলবে চারপাশ। দানে-অনুদানে দূর করবে দুস্থ-অসহায়দের অভাব ও দরিদ্রতা। শরিয়তে বৈধ কাজে প্রয়োজনের বেশি ব্যয় করা এবং অবৈধ কাজে অপচয় করা উভয়টিই ঘৃণিত, অবাঞ্ছিত, পরিত্যাজ্য। 

স্বভাবধর্ম ইসলাম জীবনের সর্বক্ষেত্রে যেভাবে আমাদের মধ্যপন্থা শিক্ষা দেয়, তেমনি সম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও কার্পণ্য ও অপব্যয়কে দুই পাশে রেখে এর মাঝ দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। দয়াময় রব তাঁর প্রিয় বান্দাদের প্রশংসায় বলেছেন, ‘এবং যারা ব্যয় করার সময় না করে অপব্যয় এবং না করে কার্পণ্য; বরং তাদের পন্থা হলো (বাড়াবাড়ি ও সংকীর্ণতার) মধ্যবর্তী ভারসাম্যমান পন্থা।’ (সুরা ফুরকান : ৬৭)

সম্পদ আল্লাহর দেওয়া আমানত : মর্যাদা ও সম্মানে বেঁচে থাকতে এ নেয়ামত যেমন সবার কাক্সিক্ষত, তেমনি ইসলামের অনেক মৌলিক বিধান পালনের জন্যও এটি মুমিনের প্রার্থিত। ক্ষণিকের এ জীবনে দয়াময় আল্লাহ আমাদের সাময়িকভাবে কিছু সম্পদের মালিক বানান। বস্তুত এর প্রকৃত মালিক তিনি। এ সম্পদ আমাদের হাতে তাঁর আমানত। 

তাই এর পূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ এবং যথাযথ ব্যবহার আমাদের দায়িত্ব। এখানে স্বেচ্ছাচারিতা ও মনের ইচ্ছামতো খরচ করার কোনো সুযোগ নেই। কেয়ামতের ময়দানে আল্লাহর কাছে নেয়ামত সম্পর্কে আমরা জিজ্ঞাসিত হব। পবিত্র কুরআনের বাণী, ‘অতঃপর সেদিন তোমাদের নেয়ামতরাজি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে, (যে তোমরা তার কী হক আদায় করেছ?) (সুরা তাকাসুর : ৮)। 

রাসুল (সা.) হাদিসে নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের এ বিষয়টি পূর্ণ বিভায় ফুটিয়ে তুলেছেন এভাবে- ‘কেয়ামত দিবসে পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ হওয়ার আগ পর্যন্ত আদম সন্তানের পদদ্বয় আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে সরতে পারবে না। তার জীবনকাল সম্পর্কে, কীভাবে তা অতিবাহিত করেছে? তার যৌবনকাল সম্পর্কে, কীভাবে তা বিনাশ করেছে? তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে, কোথা হতে তা উপার্জন করেছে এবং তা কী কী খাতে ব্যয় করেছে? এবং সে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল তা কতটুকু মেনে চলেছে’ (তিরমিজি : ২৪১৬)? 

তাই রবের দেওয়া এই নেয়ামত ও আমানত তাঁর হুকুম মতে বৈধ প্রয়োজনে এবং সঠিক ব্যয় খাতেই ব্যবহার করতে হবে। আর তাও হতে হবে পরিমিত ও প্রয়োজনমাফিক। হাদিস শরিফের ভাষ্যানুসারে কেউ যদি নদীর পারেও বসে ওজু করে, তবু অপ্রয়োজনীয় পানি ব্যয় করার অনুমতি নেই। এটাও ঘৃণ্য অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত। অতএব আসুন, আমরা সবাই অপচয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই। এর সূচনা হোক ব্যক্তিগত জীবন থেকেই। মহান আল্লাহ যেন আমাদের সব সংকট থেকে উত্তরণ করে স্বস্তিময় জীবন দান করুন।

সময়ের আলো/কেএইচও
  বিষয়:   সম্পদ  খরচ  হিসাব 


Advertisement
Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: