মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মহানবীকে প্রদত্ত এক অনবদ্য উপহার পবিত্র মেরাজ। বিবি খাদিজা (রা.) ও আবু তালিবের মৃত্যুর পর শোকাহত মহানবী (সা.)-কে সান্ত্বনা দানের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ তাঁর সান্নিধ্যে টেনে নেন। মেরাজের ঘটনাটি ৬১৯ সালে সংঘটিত হয়।
মেরাজের পরিচয় : মেরাজ আরবি শব্দ। এর অর্থ সিঁড়ি, সোপান, ধাপ, ঊর্ধ্বগমন ইত্যাদি। পরিভাষায় ঐতিহাসিকদের মতে মহানবী (সা.)-এর পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের উদ্দেশ্যে আল্লাহর নির্দেশে মানবজ্ঞানের সীমানা পেরিয়ে মহা ঊর্ধ্বজগতে আরোহণ করে আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য লাভ ও বাক্যালাপ করাকে মেরাজ বলে।
এক নজরে মেরাজ : নবুয়তের দ্বাদশ বছর ২৭ রজব, রজনি দ্বিপ্রহর। নীরব নিশীথ, তারাভরা রাত। ঘন অন্ধকারে আকাশ আচ্ছন্ন। নিস্তব্ধ নির্জন চারিধার। একটা অস্বাভাবিক গাম্ভীর্যে প্রকৃতি স্তব্ধ। এমন সময় কত আকাশ পেরিয়ে স্বর্ণ নিশীথে নামল শবে মেরাজ। কাবাগৃহের চত্বরে ঘুমিয়ে আছেন মহামানব। এমন সময় কে যেন ডাকছে ‘মুহাম্মদ’। নবীজির ঘুম ভেঙে গেল। জেগে দেখলেন ফেরেশতা জিবরাইল শিয়রে দণ্ডায়মান। অদূরে ‘বোরাক’ নামক একটি অদ্ভুদ জ্যোতির্ময় বাহন অপেক্ষা। মুহূর্তের মধ্যে বোরাক পৃষ্ঠে আরোহণ করে বায়তুল মুকাদ্দাসে গিয়ে পৌঁছালেন। মসজিদুল আকসায় মহানবী সব নবীর সঙ্গে নিয়ে নিজের ইমামতিতে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন। অতঃপর মহাকাশের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে বায়তুল মামুরে পৌঁছেন। এখান থেকে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। এখানে তিনি সৃষ্টি জগতের রহস্য বেহেশত, দোজখ, শাস্তি ও পুরস্কার প্রত্যেক্ষ করলেন এবং আল্লাহর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাতে মিলিত হলেন। আল্লাহ তাঁকে যা বলার বললেন। অতঃপর তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রাষ্ট্রের ১৪ দফা কর্মসূচি এবং মানবজাতির মুক্তি ও কল্যাণের জন্য বিশেষ উপহার নিয়ে মেরাজ থেকে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন।
আল্লাহর কুদরত প্রদর্শন : নবী-রাসুলগণ সৃষ্টি জগতে আল্লাহর বিধানকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে আল্লাহর প্রেরিত প্রতিনিধি। তাই সৃষ্টিজগতের ওপর খোদায়ি প্রশাসন পরিচালনা করার জন্য সৃষ্টিজগতের মৌলিক ও রহস্যরাজির প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা লাভ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এ জন্য মেরাজের মাধ্যমে রাসুল (সা.)-কে জান্নাত, জাহান্নাম, আসমান ও আরশ ভ্রমণ করিয়ে আল্লাহর অসীম কুদরত ও রহস্যরাজি প্রদর্শন করানো হয়।
জান্নাত-জাহান্নাম অবলোকন : এ রজনীতেই মহানবী (সা.) জান্নাতবাসীদের সুখ-শান্তি দর্শনে আনন্দিত হয়েছিলেন এবং জাহান্নামবাসীদের করুণ দুঃখ ভারাক্রান্ত অবস্থা অবলোকনে দুঃখিতও হন।
অলৌকিক দৃশ্যাবলি অবলোকন : আশ্চর্য সিঁড়ির (বোরাকের) সাহায্যে মহানবী (সা.) প্রথম আসমানসহ অবশিষ্ট আকাশগুলো ভ্রমণ করেন। এ ভ্রমণে তিনি ফেরেশতা জিবরাইলের ৬০০ ডানা, দিগন্তবেষ্টিত সবুজ রঙের রফরফ, বায়তুল মামুর দেখলেন- যেখানে ৭০ হাজার ফেরেশতা দৈনিক তওয়াফ করেন।
অন্যান্য নীতিমালা : একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা, নিকটাত্মীয়, প্রতিবেশী, মিসকিন, বিপদগ্রস্ত পথিক প্রভৃতির প্রতি কর্তব্য আদায় করা, অহংকার ও গৌরব বর্জন করা, খাদ্য ও পোশাক দানের ভয়ে সন্তানদের হত্যা না করা, ব্যভিচার ও কুৎসা না করা, অজ্ঞাত বিষয়াদিতে হস্তক্ষেপ না করা ইত্যাদি বিষয়গুলোও মেরাজের নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মেরাজের শিক্ষা : মেরাজ থেকে শিক্ষা অর্জন করার বিষয় অনেক। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে- ক. মেরাজ আমাদের সঠিক লক্ষ ও গন্তব্য পথেরই সন্ধান দেয়। খ. আমাদের অসীম অনন্তের পথে যেতে হবে এবং অজানাকে জানতে হবে। গ. মেরাজ ব্যক্তি চরিত্র ও মানবিক গুণাবলি যথাযথ উন্নয়ন সাধন করে। ঘ. আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ককে খাঁটি করে দেয়।
মহাশূন্য ভ্রমণের সূত্র স্থাপন : বিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষ ও উন্নতির যুগে মানুষ মহাশূন্যে ভ্রমণের পথ ও বাহন আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। অথচ মহাবিজ্ঞানী আল্লাহ তায়ালা চৌদ্দশ বছর আগে মেরাজের মাধ্যমে মহাশূন্যে মনুষ্য জাতির ভ্রমণের বাস্তবতা প্রমাণ করেছেন। তাই বলা যায় মেরাজের মাধ্যমেই আমরা মহাশূন্যে ভ্রমণের সূত্র পাই।
দ্রুত গতিশীল যানবাহন আবিষ্কারের সূত্র : অতিদ্রুত মেরাজ ভ্রমণের মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রমাণ করেছেন যে, মানুষের ভ্রমণের জন্য প্রচণ্ড গতিশীল যানবাহন আবিষ্কার সম্ভব। বর্তমান যুগের দ্রুত গতিশীল বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যানবাহন তারই প্রমাণ।
মহাশূন্যে ভ্রমণোপযোগী যানবাহন আবিষ্কারের পূর্বাভাস : বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে মহাশূন্যে পাড়ি দিয়ে সপ্ত আকাশ ভেদ করে আরশ পর্যন্ত ভ্রমণের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, মহাশূন্যে মনুষ্য জাতির ভ্রমণের মতো যানবাহন আবিষ্কার করা সম্ভব।
ঊর্ধ্বলোক সম্পর্কে জানার আকাক্সক্ষা সৃষ্টি : মহানবী (সা.)-এর ঊর্ধ্বলোক ভ্রমণের মধ্য দিয়ে মানুষের ঊর্ধ্বলোক সম্পর্কে জানার আকাক্সক্ষা এবং জ্ঞানার্জনের পিপাসা সৃষ্টি হয়েছে। ইতিপূর্বে মানুষের মাঝে এ অজানা জগৎকে বাস্তবভাবে জানার আকাক্সক্ষা প্রবল ছিল না। এটি মেরাজেরই অবদান। মেরাজ ইসলামের ইতিহাসে সর্বাধিক বিস্ময়কর ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকে অদ্য পর্যন্ত এ রূপ অভিনব ঘটনা আর দ্বিতীয়টি কখনো হয়নি। ফলে মেরাজের মাধ্যমে মানবজাতির হেদায়েতের জন্য এক অপূর্ব বৈপ্লবিক কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছিল। (সুরা বনি ইসরাইলের প্রথম আয়াতের তাফসির; বুখারি : ১/৫০; সিরাতে মুস্তফা : ১/৩১১)
সময়ের আলো/এনএ