শবে মেরাজের ইতিহাস ও মাহাত্ম্য

আরিফ খান সাদ

ইসলামে যে পাঁচটি রাতের বিশেষ ফজিলত ও মাহাত্ম্য ঘোষণা করা হয়েছে, তার অন্যতম পবিত্র শবে মেরাজ। এই রাতে নবীজি (সা.)-এর

2026-01-16T12:01:47+00:00
2026-01-16T12:01:47+00:00
 
  শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬,
২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
শবে মেরাজের ইতিহাস ও মাহাত্ম্য
আরিফ খান সাদ
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬, ১২:০১ পিএম   (ভিজিট : ২৩৫)
সংগৃহীত ছবি
ইসলামে যে পাঁচটি রাতের বিশেষ ফজিলত ও মাহাত্ম্য ঘোষণা করা হয়েছে, তার অন্যতম পবিত্র শবে মেরাজ। এই রাতে নবীজি (সা.)-এর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুজেজা বা অলৌকিক ঘটনাগুলোর একটি ‘মেরাজ’ সংঘটিত হয়। নবুয়তের দশম বছর রজব মাসের ২৭ তারিখে নবীজি (সা.) ৫০ বছর বয়সে মহান আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ঊর্ধ্বাকাশে গমন করেন। ঐতিহাসিক সেই সফরকেই মেরাজ বলা হয়। মেরাজ আরবি শব্দ; শাব্দিক অর্থ ঊর্ধ্বগমন, আকাশপথে ভ্রমণ করা, সোপান ইত্যাদি। নবীজি (সা.) এ রাতে ঊর্ধ্বজগতে ভ্রমণ করেন, আরশে আজিমে আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথনের সৌভাগ্য লাভ করেন, জান্নাত-জাহান্নাম পরিদর্শন করেন, পূর্ববর্তী নবী-রাসুলদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং উম্মতের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ উপহার হিসেবে নিয়ে আসেন। ইসলামের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংযোজিত হয় এ সফরে। তাই মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে মেরাজের ঘটনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মেরাজের ঘটনা কুরআন-হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘পবিত্র ও মহিমাময় ওই সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রজনির কিছু অংশে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত। যার চারপাশকে আমি করেছি বরকতময়; তাঁকে আমার নিদর্শন দেখানোর জন্য। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত ১) 

মেরাজের সফর শুরু হয় মসজিদে হারাম থেকে। নবুয়তের দশম বছর রজব মাসের ২৭ তারিখ রাতে নবীজি (সা.) পবিত্র কাবাঘরের কাছে উম্মে হানির ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। এমন সময় হজরত জিবরাইল (আ.) এসে তাঁকে ঘুম থেকে জাগ্রত করে কাবার হাতিমে নিয়ে তাঁর বক্ষ মোবারক বিদীর্ণ করে দূষিত রক্ত বের করে আবার জোড়া লাগিয়ে দেন। অতঃপর বোরাকে করে সশরীরে বায়তুল মুকাদ্দাসে নিয়ে যান। বোরাক এমন একটি প্রাণী, যা গাধা ও খচ্চরের মাঝামাঝি আকৃতির একটি জন্তু। তার দুই ঊরুতে রয়েছে দুটি পাখা। তা দিয়ে সে পেছনের পায়ে ঝাপটা দেয়, আর সামনের দৃষ্টির শেষ সীমায় পা ফেলে চোখের পলকে হাজার মাইল দূরত্ব অতিক্রম করে। নবীজি (সা.) বায়তুল মুকাদ্দাসের দরজায় একটি খুঁটির সঙ্গে বোরাকটি বেঁধে যাত্রাবিরতি করেন এবং সব নবীর ইমাম হয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। (আর রাহিকুল মাখতুম) 

বায়তুল মুকাদ্দাসে দুই রাকাত নামাজ আদায় করার পর আসমানের দিকে আরোহণের সময় একটা চলন্ত সিঁড়ি আনা হয়। তিনি বোরাকসহ সেই চলন্ত সিঁড়িতে করে ঊর্ধ্বজগতে আরোহণ করেন। এ জন্যই একে মেরাজ বলা হয়। মেরাজ শব্দের অর্থ হলো সিঁড়ি। এতে ভূপৃষ্ঠ থেকে ওপরে যাওয়ার জন্য ধাপ বানানো ছিল। তিনি সিঁড়ির সাহায্যে প্রথমে প্রথম আকাশে, অতঃপর অবশিষ্ট আকাশগুলোয় গমন করেন। প্রতিটি আকাশে সেখানকার ফেরেশতারা তাঁকে অভ্যর্থনা জানান এবং প্রত্যেক আকাশে অবস্থানরত নবীদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। প্রথম আকাশে হজরত আদম (আ.)-কে, দ্বিতীয় আকাশে হজরত ইয়াহিয়া ও ঈসা (আ.)-কে, তৃতীয় আকাশে হজরত ইউসুফ (আ.)-কে, চতুর্থ আকাশে হজরত ইদরিস (আ.)-কে, পঞ্চম আকাশে হজরত হারুন (আ.)-কে, ষষ্ঠ আকাশে হজরত মুসা (আ.)-কে এবং সপ্তম আকাশে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে দেখতে পান। তিনি সাহাবায়ে কেরামের কাছে হজরত ঈসা ও মুসা (আ.)-এর আকৃতিও বর্ণনা করেছেন। নবীদের স্থানগুলো অতিক্রম করে এক ময়দানে পৌঁছেন। যেখানে ভাগ্যলিপি লেখার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তারপর তিনি সিদরাতুল মুনতাহা গমন করেন, সেখানে আল্লাহর নির্দেশে স্বর্ণের প্রজাপতি ও নানা রঙের প্রজাপতি ছোটাছুটি করছিল। ফেরেশতারা স্থানটিকে ঘিরে রেখেছিলেন। সেখানে তিনি একটি দিগন্তবেষ্টিত সবুজ রঙের পালকির মতো ‘রফরফ’ ও বায়তুল মামুর দেখেন। বায়তুল মামুরের কাছেই হজরত ইবরাহিম (আ.) একটি প্রাচীরের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। এই বায়তুল মামুরে দৈনিক ৭০ হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করেন। কেয়ামত পর্যন্ত তাঁদের পুনরায় প্রবেশ করার সুযোগ আসবে না। (মুসলিম : ৩২০৭; ইবনে হিশাম : ১/৩৯৯) 

সিদরাতুল মুনতাহার কাছাকাছি ছিল জান্নাত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জান্নাতের সব শ্রেণি ঘুরিয়ে দেখানো হয়। একটা ঘর দেখিয়ে জিবরাইল (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বললেন, ‘এই ঘরটা হবে আপনার।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আমাকে এতে একটু প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হোক।’ ফেরেশতা বললেন, ‘এখনও আপনার সময় হয়নি, দুনিয়ায় আপনার হায়াত বাকি আছে।’ রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কলমের লেখার খসখস আওয়াজও শোনানো হয়। দুনিয়ার শুরু থেকে অনন্তকাল পর্যন্ত যা কিছু ঘটেছে এবং ঘটবে, এ সবকিছু লওহে মাহফুজে লিখে রাখা হচ্ছে। 

সেখানে নবীজি (সা.) হজরত জিবরাইল (আ.)-কে রেখে একাই ‘রফরফ’ নামক আরেকটি আসমানি বাহনে চড়ে মহান আল্লাহর দরবারে হাজির হন। প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী নবীজি (সা.) আল্লাহ তায়ালার এতটা কাছাকাছি গিয়েছিলেন যে, দুজনের মধ্যখানে মাত্র এক ধনুক পরিমাণ ব্যবধান ছিল। আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় রাসুল (সা.)-কে বিশেষভাবে অভিবাদন জানান। আল্লাহর রাসুল (সা.)-ও আবেগ-কম্পিত কণ্ঠে সালাম পেশ করেন। আরশে মুয়াল্লায় আল্লাহর সঙ্গে নবীজি (সা.)-এর কিছু কথাবার্তা হয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর সেই মহিমাময় আলাপচারিতার সারাংশই নামাজে তাশাহহুদে পাঠ করা হয়। আল্লাহ তায়ালা তাঁর উম্মতের জন্য ৫০ ওয়াক্ত নামাজের বিধান উপহারস্বরূপ প্রদান করেন। আল্লাহর দরবার থেকে ফেরার সময় ষষ্ঠ আসমানে মুসা (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। মুসা (আ.)-এর কথায় তিনি বারবার আল্লাহ তায়ালার কাছে গিয়ে নামাজ কমিয়ে ৫০ থেকে ৫ ওয়াক্ত করে আনেন। এরপর আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষণা আসে- আমার ফরজ ঠিক রাখলাম। কিন্তু বান্দাদের ওপর থেকে সংখ্যা কমিয়ে দিলাম। আর আমি প্রতিটি নেক আমলের বিনিময় ১০ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেব। (বুখারি : ৩৬৭৪; জাদুল মায়াদ : ২/৪৯; রাহমাতুল্লিল আলামিন : ১/৭৬) 

মেরাজের সফর থেকে ফিরে সেদিন ফজরের নামাজের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে মেরাজের বিস্তারিত ঘটনা শোনান। মক্কার কাফের নেতারা এটা শুনে চরমভাবে অস্বীকার করল এবং উপহাস শুরু করল। এত অল্প সময়ে মক্কা শরিফ থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসে গমন তাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলো। তাদের মধ্যে যে এর আগে মসজিদে আকসা ভ্রমণ করেছে সে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা বায়তুল মুকাদ্দাসের কিছু বিবরণ শোনান দেখি! অমনি আল্লাহ তায়ালা মসজিদের বাস্তব চিত্র নবীজি (সা.)-এর সামনে হাজির করে দিলেন আর তিনি দেখে দেখে সব বলে দিলেন। কাফেররা ছুটে গেল হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর কাছে। তিনি সেদিন ফজরের জামাতে ছিলেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মুখ থেকে তখনও তিনি শোনেননি। কাফেররা তাঁর কাছে গিয়ে বলল, যদি কোনো লোক বলে যে, সে রাতের অল্প সময়ের মধ্যে সাত আসমানের ওপর পর্যন্ত গিয়েছে, আবার ফজরের আগে দুনিয়ায় ফিরে এসেছে, তুমি কি তা বিশ্বাস করবে? আবু বকর (রা.) জানতে চাইলেন, কে বলেছেন? তারা বলল, তোমাদের নবী! আবু বকর (রা.) সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, তা হলে আমি বিশ্বাস করি। তিনি সত্যই বলেছেন। এখান থেকেই আবু বকর (রা.)-কে ‘সিদ্দিক’ বলা হয়। সিদ্দিক অর্থ পরম বিশ্বাসী। (বুখারি : ৪৭১০; সিরাতে ইবনে হিশাম : ৯১) 

মহানবী (সা.)-এর ঐতিহাসিক মেরাজ আমাদের অদৃশ্য জগতের প্রতি পূর্ণ ঈমান আনয়নের শিক্ষা দেয়। নামাজের মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত ‘মেরাজ’ অর্জনের বার্তা দেয়। আর এ রজব মাসেই মেরাজ সংঘটিত হয়েছিল। রজব একটি বরকতময় মাস। রজব ও শাবান মাসকে আল্লাহর রাসুল (সা.) রমজানের প্রস্তুতি মাস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাই এ দুই মাসকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বেশি বেশি নফল আমল, রোজা, নামাজসহ অন্যান্য নেক আমলের প্রতি মনোনিবেশ করা দরকার। মহান আল্লাহ আমাদের পবিত্র এ রাতের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ঐশী মাহাত্ম্য অনুধাবন করে পাপ থেকে ফিরে পুণ্যের পথে চলার তওফিক দিন। 

সময়ের আলো/এনএ 

  বিষয়:   শবে মেরাজ  ইতিহাস ও মাহাত্ম্য 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: