ইসলামি ইতিহাসে রজব মাস মূলত নবীজি (সা.)-এর মেরাজ বা ঊর্ধ্বগমনের ঘটনার জন্য সুপরিচিত। বিভিন্ন গ্রন্থে মেরাজের বর্ণনা বিস্তারিতভাবে এসেছে। মুমিনের জন্য এই ঘটনায় বহু শিক্ষার উপকরণ বিদ্যমান আছে। তাই এর থেকে উপকৃত হতে হলে একে কেবল গল্প হিসেবে নয়, বরং জীবন পরিচালনার পথনির্দেশক হিসেবে অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। মেরাজ থেকে প্রাপ্ত কিছু শিক্ষা নিচে তুলে ধরা হলো।
আল্লাহর ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস : আল্লাহ তায়ালা মুহূর্তের মধ্যে এত দীর্ঘ এক সফর সম্পন্ন করিয়েছেন। এই অল্প সময়ের মধ্যেই আসমানগুলো ভ্রমণ, নবীগণের সঙ্গে সাক্ষাৎ, জান্নাত ও জাহান্নামের দৃশ্য অবলোকন, আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথন এবং নামাজের উপহার নিয়ে ফিরে আসাÑ সবকিছুই চোখের পলকে সম্পন্ন হয়েছে। এখান থেকে যে শিক্ষাটি পাওয়া যায় তা হলো- যখন কোনো বিষয় কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত হয়, তখন মানুষের বুদ্ধি তা গ্রহণ করুক বা না করুক, মুমিন হিসেবে তা মেনে নেওয়া আবশ্যক। কারণ মানুষের চোখ ভুল দেখতে পারে, কান ভুল শুনতে পারে এবং মানুষের বুদ্ধি পদে পদে হোঁচট খেতে পারে; কিন্তু আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল (সা.)-এর কথা কখনো ভুল হতে পারে না। নিজের সামান্য বুদ্ধির পাল্লায় আল্লাহর অসীম কুদরতকে পরিমাপ করতে যাওয়া ঠিক তেমনই, যেমন সরিষার দানার মাধ্যমে পাহাড়কে মাপার চেষ্টা করা।
কষ্টের পরই স্বস্তি রয়েছে : মেরাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, কষ্টের পরই স্বস্তি আসে। নবীজি (সা.) দাওয়াতের শুরু থেকেই নানাবিধ বিপদাপদ, নির্যাতন ও কঠোর পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। সাহাবিদের ওপর জুলুম, সামাজিক বয়কট, শেআবে আবি তালিবে তিন বছরের অবরুদ্ধ জীবন, তায়েফে পাথর নিক্ষেপ এবং মক্কার মুশরিকদের নিরন্তর কষ্ট প্রদান- সবকিছুর পর আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবী (সা.)-কে সান্ত্বনার নিদর্শন হিসেবে মেরাজের ঘটনা দ্বারা সম্মানিত করেন। এতে বোঝা হয়, মানুষ যদি নবী (সা.)-এর জন্য জমিনের পথ বন্ধ করে দেয়, তবে আল্লাহ তাঁর জন্য আসমানের পথ উন্মুক্ত করে দেন। জমিনবাসীরা যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন আসমানবাসীরা তাঁকে স্বাগত জানায়। তাই হকের ওপর থাকা সত্ত্বেও যখন আমাদের ওপর বিপদ আসে, তখন আল্লাহর সঙ্গই আমাদের সাফল্যের জন্য যথেষ্ট।
বিপদাপদ চিরস্থায়ী নয় : এ ঘটনা থেকে আমরা এই শিক্ষাও পাই যে, যেভাবে রাতের অন্ধকার চিরকাল থাকে না, তেমনি বিপদাপদ ও দুঃখ-কষ্টও সারাজীবন থাকে না। দুনিয়ার দারিদ্র্য, রোগব্যাধি, দুশ্চিন্তা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি কখনোই স্থায়ী হয় না।
নবীজি (সা.)-কে যখন তায়েফবাসী কষ্ট দিয়েছিল এবং তিনি চরম সংকটের সম্মুখীন হয়েছিলেন, তখনই আল্লাহ তায়ালা তাঁকে আরশে আজিমে ডেকে নিয়ে রাজকীয় সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘নিঃসন্দেহে কষ্টের সঙ্গে রয়েছে স্বস্তি।’ (সুরা ইনশিরাহ : ৫-৬)
যেকোনো কাজের শুরুতে কষ্টের সম্মুখীন হওয়া সুনিশ্চিত : এ ঘটনা থেকে এই শিক্ষাও পাওয়া যায় যে, দ্বীনের কাজের শুরুতে কষ্ট ও বিপদের সম্মুখীন হওয়া সুনিশ্চিত। যারা দ্বীনের কাজ করেন, তাদের এই মানসিকতা তৈরি করে নেওয়া উচিত যে, উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা নবীদের কাছ থেকে যেমন ‘ইলম’ ও ‘আমল’ পেয়েছি, তেমনি তাঁদের উত্তরাধিকার হিসেবেই আমাদের ওপর বিপদাপদ আসবে এবং জখমে জর্জরিত হতে হবে। হজরত লোকমান (আ.) তাঁর পুত্রকে উপদেশ দিয়ে বলেন, ‘হে বৎস! নামাজ কায়েম করো, সৎকাজের আদেশ দাও, মন্দকাজে নিষেধ করো এবং তোমার ওপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্যধারণ করো। নিশ্চয় এটি অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ।’ (সুরা লোকমান : ১৭)
নিরাশ হবেন না : তায়েফে যখন পাথর মেরে নবীজি (সা.)-এর শরীর রক্তাক্ত করা হয়েছিল, সেই কঠিন সময়েও শত্রুকে অভিশাপ না দিয়ে দোয়া করেছেন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখেছেন।
তিনি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি, নিজের লক্ষ্য থেকে পিছপা হননি এবং পরিস্থিতির কারণে মনোক্ষুণ্নও হননি। বরং তিনি আপন মিশনে অবিচল থেকে মানুষকে সত্যের পথে দাওয়াত দিতে থাকলেন এবং প্রতিটি বিপদ সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করলেন। এ থেকে এই শিক্ষা পাওয়া যায় যে পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক না কেন, আপনি যদি সত্যের ওপর অটল থাকেন, তবে সাফল্য অবশ্যই আপনার পদচুম্বন করবে এবং পথের সব বাধা নিজে থেকেই দূর হয়ে যাবে।
দুনিয়া হলো কষ্টের আবাস : মেরাজের ঘটনা এই বিষয়েরও ইঙ্গিত দেয় যে, দুনিয়া হলো দুঃখ-কষ্টের জায়গা। এখানে মানুষকে পদে পদে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। নবীজি (সা.) মেরাজে যাওয়ার আগে দুনিয়ার জীবনে ধাপে ধাপে নানা কষ্টের মোকাবিলা করেছেন। এর বিপরীতে ঊর্ধ্বজগৎ ও পরকালই মুমিনের প্রকৃত শান্তির স্থান। তাই এই দুঃখের আবাসে আসা বিপদাপদে মনোক্ষুণ্ন হওয়া উচিত নয়। এখানকার কয়েক দিনের কষ্ট সহ্য করে যদি দ্বীনের ওপর অটল থাকা যায়, তবে চিরস্থায়ী সুখ ও আরাম অর্জিত হবে।
‘তাওয়াক্কুল’ মানে উপায়-উপকরণ বর্জন করা নয় : মসজিদুল আকসায় পৌঁছানোর পর হজরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁর সওয়ারিটিকে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধেছিলেন। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ ও মাধ্যম গ্রহণ করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়। তবে মাধ্যমের ওপর ভরসা রেখে মাধ্যম সৃষ্টিকারী আল্লাহকে ভুলে যাওয়াও ঠিক নয়। মাধ্যম গ্রহণ জরুরি, তবে বিশ্বাস রাখতে হবে যে, এই মাধ্যমের ভেতর কার্যকারিতা দান করা একমাত্র আল্লাহ তায়ালারই কাজ।
মেহমানের সামনে একাধিক জিনিস পেশ করা : বায়তুল মামুরে নবীজি (সা.)-এর সামনে পানীয় পেশ করা হয়েছিল। তার মধ্যে একটি ছিল মদের পেয়ালা এবং অন্যটি ছিল দুধের পেয়ালা। নবীজি (সা.) দুধের পেয়ালাটি গ্রহণ করলেন। হাদিসে এসেছে, ‘আমার সামনে দুটি পাত্র আনা হলো, যার একটিতে ছিল মদ এবং অন্যটিতে দুধ। উভয়টিই পেশ করা হলো। আমি দুধ বেছে নিলাম। তখন বলা হলো, আপনি সঠিকটিই গ্রহণ করেছেন; আল্লাহ আপনার মাধ্যমে আপনার উম্মতকে ফিতরাতের ওপর পরিচালিত করবেন’ (সহিহ মুসলিম)। এখান থেকে এই শিক্ষাও পাওয়া যায় যে, মেহমানের সামনে একাধিক জিনিস পেশ করা উত্তম, যাতে তিনি তার পছন্দমতো গ্রহণ করতে পারেন।
অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের থেকে উপকৃত হওয়া : মেরাজ আমাদের শেখায়, অভিজ্ঞদের থেকে উপকৃত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার পর হজরত মুসা (আ.) নবীজি (সা.)-কে মানুষের অসুবিধার কথা স্মরণ করিয়ে নামাজ কমানোর পরামর্শ দেন। তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে পরিশেষে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়। নবীজি (সা.) হজরত মুসা (আ.)-এর প্রতি দোয়া করেন এবং বলেন, ‘নবীদের মধ্যে আমার উম্মতের জন্য তাঁর মতো শুভাকাক্সক্ষী কাউকে দেখিনি।’ (তাবারানি)
শুভাকাক্সক্ষী হওয়ার মনোভাব তৈরি করুন : মেরাজ গমনের সময় হজরত মুসা (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে যখন নবীজি (সা.) বিদায় নিতে লাগলেন, তখন হজরত মুসা (আ.) কাঁদতে শুরু করলেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘আপনি কেন কাঁদছেন?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমার পরে প্রেরিত নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত আমার উম্মতের তুলনায় অধিক সংখ্যায় জান্নাতে প্রবেশ করবে’ (বুখারি ও মুসলিম)। হজরত মুসা (আ.)-এর মনে নবীজি (সা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব দেখে আফসোস থাকা সত্ত্বেও তিনি নবীর উম্মতের প্রতি দয়া ও শুভকামনা প্রদর্শন করেছেন। যখন নবীজি (সা.) ৫০ ওয়াক্ত নামাজ নিয়ে ফিরছিলেন, তখন তিনি মহান আল্লাহর কাছ থেকে তা কমিয়ে আনার পরামর্শ দেন।
তাঁর এই আচরণে বোঝা যায়, কারও গুণাবলি বা শ্রেষ্ঠত্ব দেখে মনে আফসোস বা আকাক্সক্ষা জাগলেও তার প্রতি সহানুভূতি ও শুভকামনা রাখা উচিত। অথচ এর বিপরীতে আজ আমাদের অবস্থা এমন যে, কেউ কোনো নেয়ামত লাভ করলে মানুষ তার প্রতি হিংসা করতে শুরু করে এবং সেই নেয়ামতটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কামনা করে।
মেরাজের এই ঘটনাকে যুক্তি ও অনুমানের মাপকাঠিতে মাপা নিরর্থক। এটি বিশ্বাস ও আকিদার বিষয়। সুতরাং আমাদের কাজ হলো, এর ওপর ঈমান আনা এবং এর প্রকৃত স্বরূপ ও ধরনকে আল্লাহর ইলমের ওপর সোপর্দ করা। সেই সঙ্গে মেরাজের শিক্ষাকে নিজেদের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা।
আলেম ও প্রাবন্ধিক
এএডি/