ইসলামের দৃষ্টিতে বিধবা নারীর পুনর্বিবাহ

মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ

নারীর জীবনে অন্যতম জটিল ও সংবেদনশীল অধ্যায় হলো স্বামীর মৃত্যুর পর তার জীবনব্যবস্থা। বিশেষত পুনর্বিবাহের বিষয়টি। আমাদের বাংলাদেশি সমাজে বিধবা

2026-01-22T11:45:07+00:00
2026-01-22T11:45:07+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ইসলামের দৃষ্টিতে বিধবা নারীর পুনর্বিবাহ
মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬, ১১:৪৫ এএম 
প্রতীকী ছবি
নারীর জীবনে অন্যতম জটিল ও সংবেদনশীল অধ্যায় হলো স্বামীর মৃত্যুর পর তার জীবনব্যবস্থা। বিশেষত পুনর্বিবাহের বিষয়টি। আমাদের বাংলাদেশি সমাজে বিধবা নারীর জীবন বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সংকোচ, আবেগী দৃষ্টিভঙ্গি ও কুসংস্কারের আবরণে আবদ্ধ হয়ে আছে। অনেক ক্ষেত্রেই স্বামীর মৃত্যুর পর নারীর স্বাভাবিক জীবন যেন অদৃশ্য কারাগারে বন্দি হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল ও কিছু সমাজে এখনও এমন ধারণা প্রচলিত যে, বিধবা নারী যেন সারাজীবন শোকের জীবনযাপন করবে, রঙিন পোশাক পরবে না, সাজগোজ করবে না, এমনকি নতুন করে সংসার গড়ার চিন্তা করাও তার জন্য অপরাধ। কোথাও কোথাও তাকে পরিবার ও সমাজের বোঝা হিসেবে দেখা হয়। যদিও এখানে প্রাচীন যুগের মতো নারীর জীবননাশের নৃশংস রীতি নেই, তবু সামাজিকভাবে তাকে ‘জীবন্ত মৃত’ করে রাখার প্রবণতা এখনও বিদ্যমান।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পৃথিবীর বহু সমাজে একসময় বিধবা নারীদের প্রতি ভয়াবহ আচরণ প্রচলিত ছিল। কোথাও স্বামীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে নারীকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হতো, কোথাও তাকে স্বামীর কবরে জীবন্ত সমাধিস্থ করা হতো। আবার কোথাও তাকে আজীবন বিয়েবঞ্চিত করে রাখা হতো এই ধারণায় যে, স্বামীর পর নারীর বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই। এমতাবস্থায় ইসলাম বিধবা নারীকে পুনর্বিবাহের পূর্ণ অধিকার দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করবে এবং তাদের স্ত্রীদের রেখে যাবে, সে স্ত্রীদের কর্তব্য হলো নিজেরা চার মাস দশ দিন পর্যন্ত ইদ্দত পালন করবে। তারপর যখন ইদ্দত পূর্ণ করে নেবে, তখন নিজের ব্যাপারে ন্যায়সংগত ব্যবস্থা নিলে কোনো পাপ নেই। আর তোমাদের যাবতীয় কাজের ব্যাপারেই আল্লাহর অবগতি রয়েছে’ (সুরা বাকারা : ২৩৪)। যেমন নবীজি (সা.) অনেক বিধবা নারীকে বিয়ে করেছেন, যা সামাজিক, মানবিক ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রচারের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে হজরত আয়শা (রা.) ছাড়া অন্য সব স্ত্রী ছিলেন বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা।

বিধবা নারীকে সমাজে উপেক্ষা বা অবজ্ঞার চোখে দেখা ইসলাম কখনো অনুমোদন করেনি। হাদিসে এসেছে, হজরত আউফ বিন মালিক আশজায়ি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমি এবং কষ্ট ও মেহনতের কারণে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া মহিলা কেয়ামতের দিন দুই আঙুলের মতো নিকটবর্তী হব। সেই নারী যিনি এতিম সন্তানদের লালন-পালনের জন্য নিজেকে আটকে রেখেছেন’ (আবু দাউদ : ৫১৪৯)। এ ছাড়া হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে নারী নিজের এতিম সন্তানদের জন্য নিজেকে সীমাবদ্ধ করেছে, তার জন্য জান্নাতের দরজা খুলবে’ (মুসনাদে আবি ইয়ালা, হাদিস নং : ৬৬৫১)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘বিধবা এবং মিসকিনের সহযোগিতাকারী আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর ন্যায়, বা সর্বদা রাতে নামাজরত ও দিনের বেলা রোজাদার ব্যক্তির মতো’ (বুখারি, হাদিস : ৫০৩৮, ৫৩৫৩)। যে নারীটির জীবন ও সমগ্র নিরাপত্তার কেন্দ্র ছিল তার স্বামী, সেই স্বামীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই তার পৃথিবী যেন অথই সাগরে পরিণত হয়। তিনি খড়কুটো আঁকড়ে ধরে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখেন, সংসারের দায়ভার বহন করেন, সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকেন বছরের পর বছর। অথচ সমাজ ও পরিবার, যারা একজন পুরুষের স্ত্রী মারা গেলে শোক, সহানুভূতি ও যত্নে সীমাহীন, সেই একই সমাজ কখনো বিধবা নারীর একাকিত্ব ও কষ্ট নিয়ে চিন্তিত হয় না।

বর্তমানে দ্বীনি অজ্ঞতা ও সামাজিক রীতির কারণে পরিবারের লোকজন পুনর্বিবাহকে ‘অপরাধ’ মনে করে। সন্তান বড় হচ্ছে, এখন কীভাবে বিয়ে বসবে? অথচ বাস্তবতা হলো, বিধবা নারী নিজের জীবনকে পরিচালনার পূর্ণ অধিকার রাখে। যদি তিনি বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন, তা হলে তা পূরণ করাই যথার্থ ও ন্যায়সংগত। সামাজিক রীতি বা পারিবারিক মানসিকতা কখনো তার অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। এটি শুধু ব্যক্তিগত অধিকার নয়, এটি ইসলামের বিধানেরও অংশ। রাসুল (সা.) এবং সাহাবিরা যে বিধবা নারীদের পুনর্বিবাহ করেছেন তা সামাজিক প্রয়োজন, মানবিক দায়বদ্ধতা ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রসারে সমানভাবে প্রমাণিত। এ বিধানকে অবজ্ঞার নজরে দেখার কোনো সুযোগ নেই, বরং এটি সাদরে গ্রহণ করা সমাজের দায়িত্ব।

মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার মৌলিক মর্যাদা বিধবা হওয়ার কারণে কেউ হারাতে পারেন না। অথচ আমাদের সমাজে এবং রাষ্ট্রে বিধবা নারীরা প্রায়শই নিগৃহীত ও অবহেলিত অবস্থায় পড়ে যান। পরিবারে, সমাজে, এমনকি অনেক সময় নিজেদের চোখেও তারা নিজেদের অমূল্য মনে করতে থাকেন। এটি কোনো ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়, এটি আমাদের সম্মিলিত সামাজিক ব্যর্থতা। আমাদের অবশ্যই সচেতন হতে হবে, বিধবা মানেই অভিশাপ নয়। বিধবা নারীও সমাজের মূল্যবান অংশ, যারা সঠিক সহায়তা ও সুযোগ পেলে নিজের জীবনে মর্যাদা ও স্বনির্ভরতা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। আমাদের কর্তব্য হলো তাদের অধিকার নিশ্চিত করা; তাদের আর্থিক, সামাজিক ও মানসিক দুরবস্থা দূর করা।

এটি কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি ইসলামের নির্দেশিত মানবিক দায়িত্ব। অসহায় ও নিপীড়িত বিধবার পাশে দাঁড়ানো প্রতিটি মানুষকে আল্লাহর কাছে প্রিয় করে। তাই আমরা বাধ্য, আমরা প্রত্যয়ী, বিধবাদের আমরা শুধু সাহায্য করব না, তাদের মর্যাদা ফিরিয়ে দেব, তাদের মা, বোন, কন্যা হিসেবে গ্রহণ করব, সমাজের স্বাভাবিক মর্যাদার অধিকার নিশ্চিত করব।

আসুন, আজই আমরা দৃঢ় সংকল্প করি, বিধবাদের সমাজের অন্তঃকোণে ফেলে দেব না, বরং তাদের পাশে দাঁড়াব। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এমন তৌফিক দান করুন, যেন আমরা নিপীড়িত ও বঞ্চিতদের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিকতার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি। বিধবা মানেই অভিশাপ নয়, বরং আমাদের মানবিক ও ইসলামি দায়িত্বের পরীক্ষা। আমরা যদি তাদের মর্যাদা ফিরিয়ে দিই, তাদের পাশে দাঁড়াই, এটাই হবে সত্যিকারের ন্যায়, এটাই সত্যিকারের মানবতা।

মুদাররিস, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া

কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা

এএডি/


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: