শেষ নবী ও উম্মতের গৌরবময় প্রাপ্তি

হুমায়ুন কবীর, আলেম ও প্রাবন্ধিক

মানব জাতির উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সবশেষ নবী ও রাসুল প্রেরিত নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তার পরে আর

2026-01-23T12:26:47+00:00
2026-01-23T12:26:47+00:00
 
  রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬,
২৪ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
শেষ নবী ও উম্মতের গৌরবময় প্রাপ্তি
হুমায়ুন কবীর, আলেম ও প্রাবন্ধিক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ১২:২৬ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
মানব জাতির উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সবশেষ নবী ও রাসুল প্রেরিত নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তার পরে আর কোনো নবী বা রাসুল আসবেন না। তার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা নবুওতের দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি যেমন সবশেষ নবী, তেমনই সবচেয়ে সম্মানীত নবী। সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। সব নবীদের সর্দার তিনি। 

আগের নবীদের যেসব নিয়ামত দান করা হয়েছিল, প্রয়োজন অনুযায়ী রাসুল (সা.)-কেও সেসব নিয়ামত দান করা হয়েছে। সঙ্গে আলাদা আরও কিছু নিয়ামত দান করা হয়েছে। তার কিছু কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা বর্ণনা করেছেন, আবার কিছু হাদিসে রাসুল (সা.) নিজেও বর্ণনা করেছেন। আবার এমনও হয়েছে, আগেকার নবীরা যেসব নিয়ামত আল্লাহ তায়ালার কাছে চেয়ে নিয়েছিলেন, নবীজি হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে আল্লাহ তায়ালা সেসব নিয়ামত চাওয়া ছাড়াই দান করেছেন।

যেমন হজরত মুসা (আ.) আল্লাহর কাছে বক্ষ প্রশস্ত হওয়ার দোয়া করেছিলেন। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা সেটি বর্ণনা করেছেন। হজরত মুসা বললেন, ‘হে আমার রব! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন’ (সুরা ত্বোয়াহা : ২৫)। আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সা.)-কে বলেছেন, ‘হে নবী! আমি কি আপনার বক্ষ প্রশস্ত করে দিইনি?’ (সুরা ইনশিরাহ : ১)। অর্থাৎ চাওয়া ছাড়াই আল্লাহ তায়ালা নবীজির বক্ষ প্রশস্ত করে দিয়েছেন।

বক্ষ প্রশস্ত হওয়ার অর্থ


প্রশ্ন হতে পারে, বক্ষ প্রশস্ত হওয়ার অর্থ কী? বক্ষ প্রশস্ত হওয়ার অর্থ হলো, সব ধরনের মানসিক অশান্তি ও সংশয়মুক্ত হওয়া। বক্ষের মাঝে জ্ঞান, তত্ত্বকথা ও উত্তম চরিত্র ধারণের জায়গা হওয়া (তাফসিরে জাকারিয়া)। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, বক্ষ প্রশস্ত হওয়ার অর্থ হলো, তাওহিদ ও ঈমানের উপযুক্ত হওয়া (তাফসিরে ইবনে কাসির)। 

এ সম্পর্কেও কুরআন মাজিদে আয়াত রয়েছে, ‘আল্লাহ যাকে হেদায়াত দান করার ইচ্ছা করেন, ইসলামের জন্য তার বক্ষ উন্মুক্ত করে দেন। আর যাকে পথভ্রষ্ঠ করতে চান, তার বক্ষ সংকীর্ণ করে দেন’ (সুরা আনআম : ১২৫)। অন্য জায়গায় আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা ইসলামের জন্য যার বক্ষ উন্মুক্ত করে দেন, সে তার রবের দেওয়া আলোর মধ্যে থাকে’ (সুরা যুমার : ২২)। এখানে আমরা মাত্র একটা আলোচনা করলাম। এ ছাড়া আরও অনেক নিয়ামত রয়েছে, যেগুলো কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এক হাদিসে রাসুল (সা.) বিশেষ ছয়টি নিয়ামতের বর্ণনা দিয়েছেন।

বিশেষ ছয়টি নিয়ামত


হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমাকে ছয়টি নিয়ামত দ্বারা অন্যান্য নবীদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে ১. আমাকে ব্যাপক তথ্যপূর্ণ ও অর্থবহ বাণী দান করা হয়েছে। 

২. আমাকে প্রবল প্রভাব দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে। ৩. আমার জন্য গনিমতের সম্পদ হালাল করা হয়েছে। ৪. আমার জন্য মাটিকে পবিত্রকারী ও মসজিদ বানানো হয়েছে। ৫. আমাকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতি প্রেরণ করা হয়েছে। ৬. আমার দ্বারা নবীদের সীল মোহর করা হয়েছে অর্থাৎ নবুওয়ের সমাপ্তি করা হয়েছে’ (সহিহ মুসলিম : ৫২৩)। আমরা এখন এই ছয়টি বিষয় নিয়ে আলোচনা করব।

তথ্যপূর্ণ ও অর্থবহ বাণী


এখানে রাসুল (সা.)-এর ব্যবহৃত শব্দ হলো, ‘জাওয়ামিউল কালিম’। জাওয়ামিউল কালিম অর্থ এমন কথা যা সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তার ব্যাখ্যা প্রচুর। রাসুল (সা.)-এর প্রতিটি কথা ছিল এমন, যা ব্যাখ্যানির্ভর। তিনি খুব সংক্ষিপ্ত বলতেন, কিন্তু তা অনেক বেশি মর্মার্থ ধারণ করত। তবে হ্যাঁ, এখানে এমন মনে করার কোনো সুযোগ নেই যে, তিনি যা বলতেন তা ব্যাখ্যানির্ভর হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ বুঝতেন না। 

এটি ছিল রাসুল (সা.)-এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য যে, তার কথা ব্যাখ্যানির্ভর হওয়ার পরেও সাধারণ থেকে সাধারণ মানুষও খুব ভালোভাবে বুঝতেন। উম্মতের মুহাদ্দিসগণ রাসুল (সা.)-এর পবিত্র জবান মোবারক থেকে যেসব শব্দ বের হয়েছে, তা বিগত চৌদ্দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যাখ্যা করে যাচ্ছেন, কিন্তু আজও তার সমাপ্তি হয়নি। এই ব্যাপক তথ্যপূর্ণ ও অর্থবহ বাণী দ্বারা রাসুল (সা.)-কে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে, যা অন্য কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি।

প্রবল প্রভাব দ্বারা সাহায্য


প্রবল প্রভাব দ্বারা ভীতি সৃষ্টি করে সাহায্য করার ঘটনা প্রচুর। রাসুল (সা.)-কে আল্লাহ তায়ালা এমন প্রভাব দান করেছিলেন, যার কারণে শত্রুরা নবীজির সামনে আসতে ভয় পেত, আতঙ্কিত হয়ে ফিরে যেত অনেক সময়। প্রবল প্রভাবের ব্যাপারে কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘শিগগিরই আমি কাফেরদের মনে ভীতি সৃষ্টি করে দেব। কারণ, ওরা আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার সাব্যস্ত করে, অথচ এ ব্যাপারে কোনো সনদ অবতীর্ণ হয়নি। 

আর তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নামে। আর জালেমদের ঠিকানা অত্যন্ত নিকৃষ্ট’ (সুরা আলে ইমরান : ১৫১)। অন্য জায়গায় আল্লাহ বলেছেন, ‘যখন ফেরেশতাদের নির্দেশ করা হলো, তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের সঙ্গে রয়েছে। সুতরাং তোমরা মুসলমানদের চিত্রগুলোকে ধীরস্থির করে রাখো। আমি কাফেরদের মনে ভীতি সৃষ্টি করে দেব। এখন তোমরা তাদের গর্দানের ওপরে এবং জোড়ায় জোড়ায় আঘাত করো’ (সুরা আনফাল : ১২)। এই যে জিহাদের ময়দানে অথবা অন্যান্য জায়গায় কাফেরদের মনে ভীতি সৃষ্টি করার ব্যাপারটা, এটি শুধু নবীজি হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর বেলায় হয়েছে। অন্য কোনো নবীর ব্যাপারে এমন হয়নি।

গনিমতের সম্পদ হালাল


গনিমতের মাল বলা হয় যুদ্ধলব্ধ সম্পদকে। কোনো জিহাদে অংশগ্রহণ করার পরে শত্রুরা যদি পরাজিত হয়, তা হলে শত্রুদের সম্পদ বিজয়ীদের হয়ে যায়। অর্জিত এই সম্পদকে গনিমতের সম্পদ বলা হয়। নবীজির জন্য এবং নবীজির উম্মতের জন্য এই গনিমতের সম্পদকে হালাল করা হয়েছে। আগেকার কোনো নবী বা উম্মতের জন্য এ ধরনের সম্পদ হালাল ছিল না। 

একদম প্রথম থেকে এ উম্মতের জন্যও গনিমতের সম্পদ হালাল ছিল না। প্রথমে হারাম ছিল, পরে হালাল করা হয়েছে। হাদিস শরিফে এসেছে, আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘এক যুদ্ধের পরে আমরা গনিমতের সম্পদ নিয়ে বসে ছিলাম, কিন্তু আগুন সেটিকে জ্বালাতে আসছিল না। একজন সেখান থেকে কিছু সম্পদ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে লুকিয়ে রেখেছিল। পরে সে সম্পদগুলো ফিরিয়ে দেয় এবং অদৃশ্য থেকে আগুন এসে তা জ্বালিয়ে দিল। এরপর আমাদের জন্য আল্লাহ তায়ালা গনিমতের মাল হালাল করে দিলেন।’ (সহিহ বুখারি : ৩১২৪)

মাটিকে পবিত্রকারী ও মসজিদ বানানো


আমরা যদি পবিত্র হওয়ার জন্য পানি না পাই অথবা পানি ব্যবহারে আমাদের কোনো অক্ষমতা থাকে, তা হলে আমরা পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করে পবিত্র হতে পারি। আবার দুনিয়ার যে জায়গায়ই থাকি, নামাজের সময় হলে পবিত্র মাটিতে নামাজ পড়ে নিতে পারি। 

মসজিদ বা ইবাদতের নির্দিষ্ট স্থানের প্রয়োজন হয় না। হ্যাঁ, মসজিদের যে আলাদা ফজিলত রয়েছে, সেটি তো ভিন্ন প্রসঙ্গ। এখানের আলোচ্য বিষয় হলো, আমাদের জন্য যেকোনো পবিত্র জায়গায় ইবাদত বৈধ। এটিও নবীজির বিশেষ মর্যাদা। অন্য কোনো নবী বা নবীর উম্মতের জন্য তায়াম্মুমের বিধান ছিল না এবং তারা যেকোনো জায়গায় নামাজ পড়তে পারতেন না। মসজিদ বা ইবাদতের নির্দিষ্ট স্থান আবশ্যক ছিল।

সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতি প্রেরণ

আমাদের নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর আগে যত নবী এসেছিলেন, তারা সবাই নির্দিষ্ট কোনো দেশ, জাতি বা সম্প্রদায়ের জন্য আসতেন। তারা শুধু নির্দিষ্ট সেই অঞ্চলে দাওয়াতের কাজ করতেন। যেমন হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমাকে সমগ্র জাতির কাছে পাঠানো হয়েছে। আর অন্যান্য নবীদের বিশেষভাবে তার জাতির কাছে পাঠানো হতো’ (নাসায়ি : ৪৩০)। 

কুরআন মাজিদেও হজরত ঈসা (আ.)-এর এমন একটা বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে, ‘স্মরণ করো, যখন মরিয়মের পুত্র ঈসা বললেন, হে বনী ইসরাইল! আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর প্রেরিত রাসুল’ (সুরা সফ : ৬)। অর্থাৎ তিনি শুধু বনী ইসরাইলের নবী ছিলেন, অন্য কারও নয়। একেক দেশ, জাতি বা সম্প্রদায়ের জন্য একেকজন নবী বা রাসুল আসতেন। কিন্তু নবীজি হজরত মুহাম্মাদ (সা.) ভিন্ন। তিনি সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য নবী।

নবীদের সীল মোহর করা

নবীজি হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর আগে যেসব নবী বা রাসুল এসেছিলেন, তারা কেউ সবশেষ ছিলেন না। তাঁদের পরে আবার অন্য নবী আসতেন, আগের নবীর অসমাপ্ত কাজগুলো পরবর্তী নবীরা করতেন। এরপর তাঁর বিদায়ের পরে আবার নতুন নবীর আগমন ঘটত। এমন ধারাবাহিকতা ছিল দুনিয়ার নিয়ম। একসময় নবীজি হজরত মুহাম্মাদ (সা.) এলেন এবং সব অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করলেন। আল্লাহর দ্বীনকে পূর্ণ করলেন। কেয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ দুনিয়াতে আসবে, তাদের সব সমস্যার সমাধান তিনি দিয়ে গেছেন। আর কোনো নবীর প্রয়োজন দুনিয়াতে নেই। 

আল্লাহ তায়ালা নবীজি হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর মাধ্যমে তাঁর দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন এবং সেই দ্বীনের ওপরে তিনি সন্তুষ্ট। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্য পূর্ণ করে দিলাম, আমার নিয়ামতকে তোমাদের ওপর সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম’ (সুরা মায়েদাহ : ৩)। সুতরাং যতদিন দুনিয়া থাকবে, ততদিন আর কোনো নবীর প্রয়োজন নেই। আরেক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘মুহাম্মাদ তোমাদের কোনো ব্যক্তির পিতা নন, বরং তিনি আল্লাহর রাসুল এবং শেষ নবী। আর আল্লাহ সব বিষয়ে অবগত।’ (সুরা আহযাব : ৪০)

আল্লাহ তায়ালা নবীজি হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে যেমন আবেদন করা ছাড়াই অনেক নিয়ামত দিয়েছেন, ঠিক তেমন উম্মত হিসেবে আমাদেরও দিয়েছেন। 

আমাদের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য হলো, আমরা শ্রেষ্ঠ নবীর উম্মত হতে পেরেছি। সুতরাং আমাদের জন্য এখন করণীয় হলো, নবীজি হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর আদেশগুলো মেনে চলা, নিষেধগুলো থেকে বিরত থাকা। 

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘রাসুল তোমাদের জন্য যা এনেছেন সেগুলো গ্রহণ করো, আর যা নিষেধ করেছেন সেগুলো থেকে বিরত থাকো’ (সুরা হাশর : ৭)। মহান আল্লাহ আমাদেরকে আমাদের গৌরবের কারণ ও তাৎপর্য অনুধাবনের তওফিক দিন।

সময়ের আলো/এআর
  বিষয়:   শেষ নবী  উম্মত  গৌরব  প্রাপ্তি 


Advertisement
Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: