বর্তমান পরিবর্তনশীল ডিজিটাল মানুষের যোগাযোগের ধরন ও ভাষা আমূল বদলে গেছে। চিঠি ও সরাসরি কথোপকথনের জায়গা দখল করেছে মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। এসব মাধ্যমে অনুভূতি প্রকাশ, মনোভাব বোঝানো, আনন্দ-বেদনা, সম্মতি-অসম্মতি, সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি প্রকাশের জন্য ইমোজি এক অপরিহার্য উপাদানে পরিণত হয়েছে। অনেক সময় অল্প কথায় গভীর ভাব প্রকাশ করতে কিংবা কথার কঠোরতা কমিয়ে আনতে মানুষ ইমোজির আশ্রয় নিচ্ছে এবং দৈনন্দিন যোগাযোগে এর ব্যবহার ব্যাপকভাবে চলছে। কিন্তু একজন সচেতন ও ঈমানদার মুসলিমের জন্য কেবল প্রচলন বা সুবিধাই কোনো কিছুর বৈধতার মাপকাঠি হতে পারে না। তাই নতুন কোনো মাধ্যম, পদ্ধতি বা প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে তার শরঈ অবস্থান কী, তা যাচাই করা ঈমানি দায়িত্ব।
বিশেষত ইমোজির সঙ্গে যেহেতু ছবি, আকৃতি ও জীবন্ত অবয়বের অনুকরণ জড়িত, যা ইসলামি শরিয়তে একটি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তাই এ ব্যাপারে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। এ কারণে ইমোজি ব্যবহার আদৌ জায়েজ কি না বা কোন ধরনের ইমোজি বৈধ আর কোনগুলো নিষিদ্ধ এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি।
শরিয়তে ছবির বিধান : ইসলামে প্রাণীর ছবি আঁকা, তৈরি করা ও ব্যবহার করার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন,‘কেয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হবে ছবি নির্মাতাদের’ (বুখারি : ৫৯৫৪)। ইমাম নববি (রহ.) বলেন, সব উলামায়ে কেরাম একমত যে, প্রাণীর ছবি অঙ্কন ও তৈরি করা যে হারাম। (ফাতাওয়া শামি : ১/৬৪৭)
মুখমণ্ডল বা পূর্ণ দেহবিশিষ্ট ইমোজির বিধান : যেসব ইমোজিতে মানুষের বা অন্য কোনো প্রাণীর মাথা, চোখ, নাক, মুখ কিংবা পূর্ণ দেহাবয়ব স্পষ্টভাবে বিদ্যমান থাকে, সেগুলো শরিয়তের দৃষ্টিতে ছবির অন্তর্ভুক্ত। এগুলো কার্টুন বা ডিজিটাল রূপে হলেও বিধানের ক্ষেত্রে কোনো ভিন্নতা আসে না। ছোট আকারের হওয়াও এখানে কোনো ছাড়ের কারণ নয়। অতএব এ ধরনের স্মাইলি, অ্যাভাটার, বিটমোজি বা ফেস ইমোজি তৈরি করা ও ব্যবহার করা নাজায়েজ ও হারাম। (ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ, ফতোয়া নং : ১৬৪৬৭৮)
আংশিক অঙ্গবিশিষ্ট ইমোজির বিধান : যেসব ইমোজিতে কেবল হাত, পা বা মুখমণ্ডল ছাড়া অন্য কোনো অঙ্গ দেখানো হয় এবং যার দ্বারা পূর্ণ প্রাণীর পরিচয় স্পষ্ট হয় না, সেগুলোর ব্যবহারে সুযোগ রয়েছে। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘ছবি মূলত মাথার অংশ। মাথা না থাকলে তা ছবি নয়’ (আস-সুনানুল কুবারা, ইমাম বাইহাকি : ১৪৫৮০)। তবে অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার পরিত্যাগ করাই তাকওয়ার পরিচয়।
নির্জীব বস্তুর ইমোজির বিধান : ফুল, ফল, গাছ, পাহাড়, চাঁদ, সূর্য, বই, কলম, ঘরবাড়ি কিংবা অন্যান্য নির্জীব বস্তুর ইমোজি যেহেতু প্রাণীর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়, তাই এগুলো তৈরি ও ব্যবহার করা জায়েজ।
কুফরি ও অশ্লীল ইমোজির বিধান : যেসব ইমোজি কুফর, শিরক, নগ্নতা, সমকামিতা, অশালীনতা কিংবা বিদ্রƒপ ও তাচ্ছিল্যের প্রতীক, সেগুলোর ব্যবহার যেকোনো অবস্থাতেই হারাম। একজন মুমিনের জন্য এসব প্রতীক ব্যবহার করা ঈমান ও চরিত্রের পরিপন্থী। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি অন্য কোনো জাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে’ (আবু দাউদ : ৪০৩১)। অন্য হাদিসে এসেছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা অশ্লীলতা এবং অশ্লীলতা প্রকাশকারীকে পছন্দ করেন না’ (মুসলিম : ২১৬৫)। আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘লজ্জা বা শালীনতা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ’ (বুখারি : ৯)। ইমোজি ব্যবহারে প্রয়োজনের সীমা মানা এবং সন্দেহজনক বিষয় এড়িয়ে চলাই একজন মুমিনের জন্য উত্তম ও নিরাপদ পথ।
লেখক : শিক্ষক, জামিয়া নুরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা