মৃতদের প্রতি জীবিতদের কর্তব্য

মুফতি মুহাম্মাদ ইয়াসীন

জগতের কোনো কিছু চিরস্থায়ী নয়, সবই ধ্বংসশীল। মানুষ মারা যাবে, মৃত্যু অনিবার্য সত্য; অনস্বীকার্য বাস্তবতা। দুনিয়ার সব বন্ধন ছিন্ন করে

2026-01-30T06:14:47+00:00
2026-01-30T06:14:47+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
মৃতদের প্রতি জীবিতদের কর্তব্য
মুফতি মুহাম্মাদ ইয়াসীন
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬, ৬:১৪ এএম   (ভিজিট : ১৭৩)
প্রতীকী ছবি
জগতের কোনো কিছু চিরস্থায়ী নয়, সবই ধ্বংসশীল। মানুষ মারা যাবে, মৃত্যু অনিবার্য সত্য; অনস্বীকার্য বাস্তবতা। দুনিয়ার সব বন্ধন ছিন্ন করে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও আপনজন ছেড়ে চলে যেতে হবে প্রত্যেককে। দুনিয়ায় রেখে যাওয়া মানুষের কাছে মাইয়েতের কী অধিকার ও পাওনা রয়েছে, তা নিয়ে এই আলোচনা।

কালিমার তালকিন করা
মুমূর্ষু ব্যক্তির পাশে মৃদু আওয়াজে কালিমা পড়তে থাকা সুন্নত। এ অবস্থায় তাকে কালিমা পড়ার আদেশ দেবে না বা কালিমা উচ্চারণ করতে কোনোরূপ জোরাজুরি করবে না। তার পাশে বসে কালিমা পড়তে থাকলে আশা করা যায়, শুনে শুনে একসময় সেও পড়ে নেবে। 

হাদিসে এসেছে, ‘যার শেষ কথা হবে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’ (আবু দাউদ : ৩১১৮)। অন্তিম শয্যায় শায়িত ব্যক্তির কাছে সুরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করার কথাও হাদিসে এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, মৃত্যুপথযাত্রীদের পাশে তোমরা সুরা ইয়াসিন পাঠ করো (আবু দাউদ : ৩১২৩)। 

ছোট ও সহজ এ দুটি আমলের পাশাপাশি কাছের-দূরের সবার উচিত তার জন্য সহজ ও ঈমানের সঙ্গে মৃত্যুর দোয়া করা।

গোসল দেওয়া
ইসলামি শরিয়ত কোনো মুসলিমকে শেষ বিদায় জানানোর সর্বোচ্চ সম্মানজনক পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। তাই মাইয়েতকে সুনির্দিষ্ট পন্থায় গোসল করানোর বিধান রেখেছে। মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়া ফরজে কিফায়া। অর্থাৎ কিছু লোক আদায় করলে সবার দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়।

সুন্নত তরিকায় কাফন পরানো
কাফন শুধু একটি কাপড় নয়; বরং এটি মৃত মুমিনের প্রতি জীবিতদের শেষ দায়িত্ব ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে কাফন পরানোর নিয়ম শিখিয়েছেন এবং সাহাবায়ে কেরাম তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করেছেন। পুরুষের জন্য তিনটি আর নারীর জন্য পাঁচটি মধ্যম মানের সাদা কাপড়ে কাফন দেবে।

জানাজার নামাজ পড়া
জানাজার নামাজ ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ ফরজে কেফায়া। কোনো মুসলমান ইন্তেকাল করলে তার জন্য জানাজার নামাজ আদায় করা জীবিত মুসলমানদের সম্মিলিত দায়িত্ব। কেউ কেউ আদায় করলে দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করা গুনাহের কারণ। জানাজার নামাজে রুকু-সেজদা নেই; এটি  নামাজের আকৃতিতে মূলত মাইয়েতের জন্য দোয়া। এখানে মৃতের গুনাহ মাফ, কবরের আজাব থেকে নাজাত এবং আখেরাতে শান্তির জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা হয়। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) জানাজার নামাজে অংশ নিতে এবং এতে বেশি মানুষকে শরিক করতে উৎসাহ দিয়েছেন।

দাফনে বিলম্ব না করা

শরিয়তের নির্দেশনা হলো, কেউ মারা গেলে যত দ্রুত সম্ভব তাকে দাফন করা। 

নবীজি বলেন, ‘তোমরা মৃত ব্যক্তির জানাজা-দাফন ইত্যাদি দ্রুত করো। সে যদি ভালো মানুষ হয়ে থাকে, তা হলে তো তার জন্য কল্যাণ ও পুরস্কার রয়েছে, তোমরা তাকে সেই কল্যাণের দিকে এগিয়ে দিলে। আর যদি এমন না হয়, তবে তোমরা তোমাদের ঘাড় থেকে এ মন্দকে নামিয়ে দেবে’ (বুখারি : ১৩১৫)। 

তাই দূর-দূরান্তের আপনজনের অপেক্ষা, অধিক মুসল্লির জানাজায় অংশগ্রহণ অথবা এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় মৃত দেহ স্থানান্তর ইত্যাদি কারণে দাফনে বিলম্ব করা যাবে না।

দোয়া ও ইস্তেগফার
কবরের প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং পরবর্তী ধাপগুলো অটল-অবিচল থাকার জন্য দাফনের পর মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা। যদিও জানাজার নামাজ একটি দোয়া। কিন্তু দাফনের পর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করা নবীজি থেকে প্রমাণিত আছে। 

হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) মৃতের দাফন শেষ করে সেখানে দাঁড়িয়ে বলতেন, তোমাদের ভাইয়ের জন্য তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং সে যেন দৃঢ়পদ থাকে সে জন্য দোয়া করো। কেননা তাকে এখনই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। (আবু দাউদ : ৩২২১)

অসিয়ত ও দেনা পরিশোধ
মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে দেনা পরিশোধ করা এবং এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ থেকে অসিয়ত পুরো করা। এর মধ্যে বান্দার হক যেমন আদায়যোগ্য ঋণ রয়েছে, তেমনি রয়েছে আল্লাহর হক যেমন হজ ফরজ হওয়ার পর কেউ হজ না করে মারা গেল, তা হলে আল্লাহর পাওনা হিসেবে তার পক্ষ থেকে হজ করতে হবে। 

হাদিসে এসেছে, এক সাহাবি হজ না করে ইন্তেকাল করেন, অথচ তার ওপর হজ ফরজ হয়েছিল। তার ছেলে এসে নবীজির কাছে জানতে চান, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার বাবা হজ না করে ইন্তেকাল করেছেন। আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ আদায় করব? 

রাসুল তাকে বললেন, আচ্ছা বলত, তোমার বাবার যদি কোনো ঋণ থাকত, তবে কি তুমি তা আদায় করতে? সাহাবি বললেন, হ্যাঁ, করতাম। তখন নবীজি বললেন, আল্লাহর ঋণ আদায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ। (নাসাঈ : ২৬৩৯)

ঈসালে সওয়াব
মৃত্যুর পর আমলের ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়ে যায়। মৃত ব্যক্তি তখন জীবিতদের পাঠানো নেক আমলের আশায় বুক বেঁধে থাকে। ঈসালে সওয়াব মৃত ব্যক্তির হক আদায়ের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া। মৃত ব্যক্তির রুহের মাগফিরাত কামনায় দান-সদকা, কুরআন তেলাওয়াত, নফল নামাজ, নফল রোজা, নফল কুরবানি, নফল হজ ইত্যাদি সবই করা যেতে পারে। 

দুনিয়ার এই ক্ষণিকের নিবাসে কেউ চিরস্থায়ী নয়। আখেরাত আসল গন্তব্য, স্থায়ী ঠিকানা। প্রিয়জনদের পরকালীন জীবন সুখময় করতে উপরোক্ত হকগুলো আদায়ে আমাদের যত্নবান হতে হবে।

লেখক : মুহাদ্দিস, দিলু রোড মাদরাসা, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা।


এফআর


  বিষয়:   মৃতদের প্রতি  জীবিতদের কর্তব্য 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: