আত্মশুদ্ধির শবে বরাত

মুহিবুল হাসান রাফি

শব ফারসি শব্দ, যার অর্থ রাত আর বরাত শব্দের অর্থ মুক্তি। শবে বরাত অর্থ মুক্তির রাত। শবে বরাতের আরবি হলো

2026-01-30T06:19:15+00:00
2026-01-30T06:19:15+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
আত্মশুদ্ধির শবে বরাত
মুহিবুল হাসান রাফি
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬, ৬:১৯ এএম   (ভিজিট : ৪২৭)
প্রতীকী ছবি
শব ফারসি শব্দ, যার অর্থ রাত আর বরাত শব্দের অর্থ মুক্তি। শবে বরাত অর্থ মুক্তির রাত। শবে বরাতের আরবি হলো ‘লাইলাতুল বারাআত’। হাদিস শরিফে যাকে ‘নিসফ শাবান’ বা ‘শাবান মাসের মধ্য দিবসের রজনি’ বলা হয়েছে। 

ভারতীয় উপমহাদেশ, পারস্যসহ পৃথিবীর অনেক দেশের ফারসি, উর্দু, বাংলা, হিন্দিসহ নানা ভাষায় যা ‘শবে বরাত’ নামেই অধিক পরিচিত। বিশেষ এ রাতে মহান আল্লাহ তায়ালা আগামী এক বছরের জন্য মানুষের রিজিক, জন্ম-মৃত্যু ইত্যাদি বিষয় নির্ধারণসহ তাঁর সৃষ্ট জীবের ওপর অসীম রহমত নাজিল করে থাকেন বলে এ রাতকে শবে বরাত বা ভাগ্যরজনি বলা হয়।

কুরআনে বলা হয়েছে, হা-মিম! শপথ! উজ্জ্বল কিতাবের, নিশ্চয়ই আমি তা নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয়ই আমি ছিলাম সতর্ককারী। যাতে সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারিত হয়। এ নির্দেশ আমার তরফ থেকে, নিশ্চয়ই আমিই দূত পাঠিয়ে থাকি (সুরা দুখান : ১-৫)। 

বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে মুসলিম সমাজে ছয়টি রাতকে অধিক গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয়। রাতগুলো হলো— জুমার রাত, রজব মাসের প্রথম রাত, শবে বরাতের রাত, দুই ঈদের রাত ও শবে কদরের রাত। শবে কদর সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে পূর্ণাঙ্গ একটি সুরা রয়েছে। 

অবশিষ্ট রাতগুলো সম্পর্কে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) এক হাদিসে স্পষ্ট বিবরণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পাঁচটি রাত এমন আছে যাতে কোনো দোয়া ফেরত দেওয়া হয় না। সে রাতগুলো হলো— জুমার রাত, রজব মাসের প্রথম রাত, বরাতের রাত, দুই ঈদের রাত ও শাবান মাসের মধ্যরাত তথা শবে বরাত। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদিস : ৭৯২৭)

শবে বরাতের আরেকটি তাৎপর্য হলো, এই রাতে সৃষ্টিজগতের ভাগ্য বণ্টন করা হয়। মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত, যা পৃথিবী সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর আগেই নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এ রাতে এক বছরেরটি প্রকাশ করা হয়। 

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তুমি কি জানো, অর্ধ শাবানের রাতের কার্যক্রম কী? আয়েশা (রা.) বললেন, না, হে আল্লাহর রাসুল। নবী (সা.) বললেন, এ বছর যতজন সন্তান জন্মগ্রহণ করবে এবং মারা যাবে তা লিপিবদ্ধ করা হয়। এ রাতেই মানুষের আমল পৌঁছানো হয় এবং এ রাতেই তাদের রিজিক অবতীর্ণ হয় (মিশকাত : ১৩০৫)। 

হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, অর্ধ শাবানের রাতে অর্থাৎ শাবান মাসের ১৪ তারিখ রাতে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিকুলের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক-বিদ্বেষী লোক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন (ইবনে হিব্বান : ৫৬৬৫)। 

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, এক রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) উঠে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন, এতে এত দীর্ঘ সময় ধরে সেজদা করলেন যে আমার ভয় হলো তিনি মারাই গেছেন কি না। এ চিন্তা করে আমি বিছানা থেকে উঠে রাসুল (সা.)-এর বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিই, এতে আমার বিশ্বাস হলো তিনি জীবিত আছেন। তারপর নিজ বিছানায় ফিরে এলাম। এরপর তিনি সেজদা থেকে মাথা উঠালেন এবং নামাজ শেষ করে আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়েশা! তোমার কি ধারণা হয়েছে যে নবী তোমার সঙ্গে সীমা লঙ্ঘন করেছে? আমি বলি, জি না, হে আল্লাহর রাসুল! তবে আপনার দীর্ঘ সময় ধরে সেজদার কারণে আমার মনে হয়েছে আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন। 

এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে আয়েশা! তুমি কি জানো, আজকের এ রাতটি কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল এ বিষয়ে অধিক জ্ঞাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, এ রাতটি অর্ধ শাবানের রাত। এ রাতে আল্লাহ তায়ালা নিজ বান্দাদের প্রতি বিশেষ করুণার দৃষ্টি দেন, অনুগ্রহ প্রার্থীদের দয়া করেন। তবে হিংসুক লোকদের তার অবস্থার ওপর ছেড়ে দেন। (শুআবুল ইমান : ৩৮৩৫)

রাসুল (সা.) রমজান মাসের পর রজব-শাবান মাসে বেশি নফল নামাজ ও নফল রোজা পালন করতেন, শাবান মাসে কখনো ১০টি, কখনো ১৫টি, কখনো ২০টি নফল রোজা, কখনো আরও বেশি রাখতেন। এমনকি উম্মুহাতুল মুমিনিনগণ বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসে এভাবে নফল রোজা রাখা শুরু করতেন, মনে হতো তিনি আর কখনো রোজা ছাড়বেন না (মুসলিম)। 

শবে বরাতের বিশেষ কোনো আমলের কথা কুরআন-হাদিস ও সাহাবিদের জীবনীতে কোথাও নেই। তবে নামাজ আদায়, কুরআন তেলাওয়াত, তওবা, ইস্তিগফার ও ক্ষমাপ্রার্থনা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে রাত কাটানো যায়। শবে বরাতের সব আমলই নফল। আর নফল আমল নিজ নিজ ঘরে একাগ্রচিত্তে আদায় করাই উত্তম। 

আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন অর্ধ শাবানের রাত তোমাদের সম্মুখে আসে, তখন তোমরা তাতে কিয়াম তথা নামাজ আদায় করো এবং পরবর্তী দিনটিতে রোজা রাখো’ (ইবনে মাজাহ : ১৩৮৮)। 

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, আমি এক রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কাছে না পেয়ে খোঁজ করতে বের হলাম। হঠাৎ দেখলাম, তিনি বাকি কবরস্থানে আছেন। তিনি বললেন, (হে আয়েশা) তোমার কি এ আশঙ্কা হয় যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল তোমার ওপর জুলুম করতে পারেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমার ধারণা হলো, আপনি অন্য কোনো স্ত্রীর কাছে গেছেন। তিনি বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা অর্ধ শাবানের রাতে দুনিয়ার আকাশে আসেন এবং কালব গোত্রের ছাগল-ভেড়ার পশমের চেয়েও অধিকসংখ্যক লোককে ক্ষমা করে দেন (তিরমিজি : ৭৩৯)। 

মহিমান্বিত শবে বরাতে মুমিন-মুসলমান নিজ আত্মার সব খেদ ঝেড়ে ফেলে দিয়ে একনিষ্ঠভাবে মহান আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হবে, পাশবিক চিন্তা-চেতনা অন্তর থেকে দূর করে দিয়ে মানবিক মূল্যবোধে ভরে তুলবে এটাই প্রত্যাশা।

এফআর


  বিষয়:   আত্মশুদ্ধি  শবে বরাত 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: