মানুষের জীবনে পাপের শেষ নেই। ময়লা থেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জনের উপায় যেমন ধৌত করা, তেমনি পাপ থেকে পুণ্যের পথে ফেরার উপায় হচ্ছে ইস্তেগফার। ইস্তেগফার মানে আল্লাহর কাছে বান্দার ক্ষমা চাওয়া। ইস্তেগফার একটি বরকতময় আমল। এটি ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ জপের মাধ্যমে হতে পারে অথবা ইস্তেগফারের পূর্ণ দোয়া পাঠের মাধ্যমেও হতে পারে। যেমন- ‘আস্তাগফিরুল্লাহাল্লাজি লা-ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়ুল কাইয়ুম ওয়া আতুবু ইলাইহি’ অথবা ‘আস্তাগফিরুল্লাহাল্লাহা রব্বি মিন কুল্লি জানবিন ওয়া আতুবু ইলাইহি’। আবার ‘সাইয়িদুল ইস্তেগফার’ তথা শ্রেষ্ঠ ইস্তেগফারের মাধ্যমেও হতে পারে।
ইস্তেগফারের যে দোয়াই পড়ি না কেন, ইস্তেগফারের আমলের সময় নিজেকে অপরাধী হিসেবে আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করা চাই। নিজের ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় যে গুনাহ হয়েছে সে বিষয়টি অনুভূতিতে রেখে আল্লাহর কাছে কাকুতি-মিনতি সহকারে ক্ষমা চাওয়া হচ্ছে ইস্তেগফার। হাদিসে এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইস্তেগফারকে অভ্যাসে পরিণত করবে, অর্থাৎ সবসময়ের আমল বানিয়ে নেবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে সব ধরনের সংকট থেকে উত্তরণের রাস্তা বের করে দেবেন। সব ধরনের দুশ্চিন্তা, পেরেশানি, অস্থিরতা ও ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি দান করবেন। অকল্পনীয় উৎস থেকে তাকে রিজিক দান করবেন।’ (আবু দাউদ : ১৫১৮)
নবী ও রাসুলগণও নিয়মিত ইস্তেগফারের আমল করতেন। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, হজরত নুহ (আ.) তাঁর জাতিকে ইস্তেগফারের পরামর্শ দিয়েছিলেন; যার বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা প্রাচুর্য দেবেন বলে জানিয়েছিলেন। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমি তাদের বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, যার কারণে ক্ষেতের ফসল ভালো হবে। উৎপাদনে বরকত হবে, অভাব দূর হবে এবং তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা সমৃদ্ধ করবেন। তোমাদের জন্য উদ্যানগুলো স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্য নহরগুলো প্রবাহিত করবেন। যে নহর দ্বারা তোমরা বাগানে পানি সিঞ্চন করবে, যার ফলে বাগানের ফলফলাদিতে ফলন ভালো হবে, বরকত হবে’ (সুরা নুহ : ১০-১২)।
অর্থাৎ যখন তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করবে, ক্ষমা চাইবে ও তাঁর আনুগত্য করবে, তখন তোমাদের রিজিক বেড়ে যাবে। তোমাদের আসমানের বরকত দ্বারা সিঞ্চিত করা হবে। জমিনের বরকত দ্বারাও তোমাদের সমৃদ্ধ করা হবে। আল্লাহ তোমাদের ক্ষেতের ফসলে এবং বাগানের ফলফলাদিতে বরকত দেবেন, দুধদানকারী পশুর দুধে বরকত দেবেন এবং তোমাদের বরকতময় সম্পদ ও সন্তান দান করবেন। ইস্তেগফারের কারণে মানুষকে পরকালে হরেক রকমের ফলের বাগান দান করা হবে এবং বাগানের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত নহরগুলো দান করা হবে (তাফসিরে ইবনে কাসির)। বাস্তবিক জীবনেও বহু মানুষ ইস্তেগফারের আমল করে সফলতা পেয়েছেন।
জগদ্বিখ্যাত ইমাম, প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর জীবনের একটি ঘটনা। তিনি শেষ জীবনে হাদিস সংগ্রহ ও সংকলনের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তার সংকলিত হাদিসের সবচেয়ে বড় কিতাব ‘মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বল’ ৪০ হাজার হাদিসের সমাহার। এক শীতের রাতে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) হাদিস সংগ্রহের জন্য অনেক দূরে সফরে বেরিয়েছেন। পথিমধ্যে রাত হয়ে যায়। একটি মসজিদে এশার নামাজ পড়ে চিন্তা করলেন, এই শীতের রাতে কোথায় যাব? এই মসজিদেই ফজর পড়ে বেরিয়ে যাব। এই ভেবে ব্যাগ থেকে কিতাব বের করে হাদিস পড়া শুরু করলেন। কিন্তু মসজিদের খাদেম এসে বলল, মসজিদে থাকা যাবে না। মসজিদ থেকে বের হয়ে যান। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বললেন, আমি এই মসজিদে ফজরের মুসল্লি। আমাকে থাকতে দাও। কিন্তু নাছোড়বান্দা খাদেম ইমাম আহমাদকে মসজিদ থেকে বের দিল। ইমাম আহমাদ (রহ.) মসজিদ থেকে বের হয়ে পাশের বাজারে এক রুটি বিক্রেতার দোকানে আশ্রয় নিলেন। রুটিওয়ালা চুলা থেকে আগুন তাপাতে তাপাতে রাত কাটাতে লাগলেন।
ইতিমধ্যে তিনি লক্ষ করলেন, রুটি বিক্রেতা কাজ চলা অবস্থায় মুখে মুখে পড়ছেন ‘আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ’। ইমাম আহমাদ (রহ.) যুবককে জিজ্ঞাসা করলেন, হে যুবক! বারবার কেন এটা পড়ছ? তুমি এই আমলের কী প্রতিদান পেয়েছ? যুবক উত্তর দিল, আমি এই ইস্তেগফারের আমলের বরকতে সবকিছু পেয়েছি। আল্লাহ আমাকে মুস্তাজাবুদ-দাওয়া (যার দোয়া কবুল হয়) বানিয়েছেন। আমার সব দোয়া আল্লাহ কবুল করেছেন, শুধু একটি দোয়া বাদে। ইমাম আহমাদ (রহ.) কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, সেটা কোন দোয়া যা এখনও কবুল হয়নি? রুটিওয়ালা যুবক জবাব দিলেন, আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলাম। হে আল্লাহ! আমার মৃত্যুর আগে আমাকে এই যুগের শ্রেষ্ঠ হাদিসবিশারদ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার তওফিক দিন। আমার এ দোয়াটি এখনও কবুল হয়নি। তখন ইমাম আহমাদ (রহ.) চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলেন, হে যুবক! তোমার এ দোয়াও কবুল হয়েছে। আমিই ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল। আল্লাহ আমাকেই তোমার কাছে এনেছেন।
এএডি/