আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদত ও দায়িত্ব পালনের জন্য। তিনি ইরশাদ করেন, ‘আমি জিন ও মানুষকে কেবল এ জন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদত করবে’ (সুরা জারিয়াত : ৫৬)। কিন্তু বর্তমান যুগে প্রযুক্তির নামে আমরা এমন এক জালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছি, যা আমাদের জীবনের মূল্যবান সময়কে নিঃশব্দে গ্রাস করছে। ইউটিউব শর্টস, ফেসবুক রিলস, টিকটক- এসব মাধ্যম আজ আমাদের জীবনে এমন নেশায় পরিণত হয়েছে, যা আমাদের দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সময় আল্লাহর বিশেষ আমানত : আল্লাহ তায়ালা কুরআনে সময়ের শপথ করে বলেছেন, ‘শপথ যুগের (সময়ের), নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত’ (সুরা আসর : ১-২)। এই সংক্ষিপ্ত সুরায় আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সময় মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। ইমাম শাফিঈ (রহ.) বলেছেন, ‘যদি মানুষ শুধু সুরা আসর নিয়ে চিন্তা করত, তা হলে তা তার জন্য যথেষ্ট হতো’ (তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা আসর : ১)। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন বান্দার পা নড়বে না যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবেÑ তার জীবন কীভাবে কাটিয়েছে, তার যৌবন কোথায় ব্যয় করেছে...’ (তিরমিজি : ২৪১৬)। এই হাদিসে স্পষ্ট যে, আমাদের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে। আজ যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা অর্থহীন রিলস দেখে কাটাচ্ছি, সেই সময়ের হিসাব আল্লাহর দরবারে দিতে হবে।
রিলস দেখার দুনিয়াবি ক্ষতি : রিলস দেখা কয়েক সেকেন্ডের বিনোদনের লোভে শুরু হলেও এটি ধীরে ধীরে সময়, মনোযোগ ও জীবনের ভারসাম্যকে গ্রাস করে নিচ্ছে। আমরা অনেকেই এটাকে নিরীহ বিনোদন মনে করি; অথচ বাস্তবে এটি এমন এক অভ্যাসে রূপ নিয়েছে যা আমাদের দেহ, মন, পরিবার ও কর্মজীবনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। ইসলাম মানুষকে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থার দিকে আহ্বান করে, যেখানে সময়, স্বাস্থ্য ও দায়িত্বের সঠিক ব্যবহার ঈমানেরই অংশ। কিন্তু রিলস দেখার অতিরিক্ত আসক্তি সেই ভারসাম্যকে ভেঙে দিচ্ছে নিঃশব্দে।
শারীরিক ক্ষতি : রিলস দেখায় আসক্তি চোখের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ওপর তোমার শরীরেরও হক আছে’ (বুখারি : ৫১৯৯)। কিন্তু আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আমাদের চোখের ওপর জুলুম করছি। ঘুমের ব্যাঘাত, মাথাব্যথা, মানসিক অস্থিরতা এসব শারীরিক ক্ষতি আমরা নিজেদের ওপর চাপিয়ে নিচ্ছি।
পারিবারিক সম্পর্কের বিচ্ছিন্নতা : আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা করো’ (সুরা তাহরিম : ৬)। কিন্তু আমরা একই ঘরে থেকেও পরিবারের সদস্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি। স্ত্রী-স্বামী, পিতা-পুত্র, মা-মেয়ে, সবার মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালনে অবহেলা হচ্ছে, যা কেয়ামতের দিন আমাদের জবাবদিহিতার কারণ হবে।
শিক্ষাগত ও পেশাগত ক্ষতি : শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ হারাচ্ছে, চাকরিজীবীরা দায়িত্বে অবহেলা করছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন যে, যখন তোমাদের কেউ কোনো কাজ করে তখন সে যেন তা সুচারুরূপে (নিখুঁতভাবে ও দৃঢ়তার সঙ্গে) সম্পন্ন করে’ (মুজামুল আওসাত, ইমাম তাবারানি : ৮৯৭)। কিন্তু রিলসের আসক্তি আমাদের শিক্ষায় উন্নতি ও কর্মদক্ষতা নষ্ট করছে, ফলে দুনিয়াবি উন্নতির পথ রুদ্ধ হচ্ছে।
মানসিক অস্থিরতা ও বিষণ্নতা : স্ক্রিনে অন্যের কৃত্রিম সুখী জীবন দেখে আমরা নিজেদের জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট হচ্ছি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহর জিকিরেই অন্তর প্রশান্ত হয়’ (সুরা রাদ : ২৮)। কিন্তু আল্লাহর জিকিরের পরিবর্তে আমরা স্ক্রিনে প্রশান্তি খুঁজছি, যা কখনো মিলবে না। বরং মানসিক অশান্তি, হতাশা ও তুলনামূলক হীনম্মন্যতা দিন দিন বেড়েই চলছে।
রিলস দেখার দ্বীনি ক্ষতি : দুনিয়াবি ক্ষতির চেয়েও ভয়াবহ হলো রিলস দেখার আখেরাতকেন্দ্রিক ক্ষতি, যার পরিণতি দুনিয়াতে চোখে পড়ে না। কিন্তু কেয়ামতের ময়দানে একে একে এগুলো উন্মোচিত হবে। প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি দৃষ্টি ও প্রতিটি অবহেলিত দায়িত্বের হিসাব আল্লাহর দরবারে পেশ করা হবে। যে সময় আল্লাহর স্মরণ, ইলম অর্জন, পরিবার প্রতিপালন ও নেক আমলের জন্য বরাদ্দ ছিল তা যদি নিছক স্ক্রলিং ও অর্থহীন বিনোদনে ব্যয় হয়, তবে তা আখেরাতে চরম অনুশোচনার কারণ হবে।
নামাজের প্রতি উদাসীনতা : রিলস দেখতে দেখতে নামাজের সময় চলে যায়। অনেকে নামাজই ছেড়ে দেয়। আবার অনেকে নামাজ কাজা করে ফেলে। অথচ আল্লাহ তায়ালা কঠোর হুঁশিয়ারির সঙ্গে উচ্চারণ করেছেন, ‘দুর্ভোগ সেই নামাজিদের জন্য, যারা তাদের নামাজে উদাসীন’ (সুরা মাউন : ৪-৫)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কুফর ও ঈমানের মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ ত্যাগ করা।’ (মুসলিম : ৮২)
অশ্লীলতা ও গুনাহের প্রবেশদ্বার : অনেক রিলসে থাকে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও গান-বাজনার সম্পৃক্ততা। আর কুরআন ঘোষণা করেছে, ‘বলুন, আমার রব তো হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন (সব ধরনের) অশ্লীল কাজ’ (সুরা আরাফ : ৩৩)। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘চোখের জিনা হলো হারামের দিকে তাকানো, দুই কানের জিনা হলো মন্দ কথা শোনা, জিহ্বার জিনা হলো অন্যায় কথা বলা, হাতের জিনা হলো ধরা বা স্পর্শ করা, পায়ের জিনা হলো গুনাহের দিকে হেঁটে যাওয়া।’ (বুখারি : ৬২৩৪)
মোটকথা, আল্লাহ তায়ালা আমাদের যে সীমিত সময় দিয়েছেন তা অসীম মূল্যবান। হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, ‘হে আদম সন্তান, তুমি তো দিনগুলোর সমষ্টি মাত্র। যখন একটি দিন চলে যায়, তোমার একটি অংশ চলে যায়’ (হিলয়াতুল আউলিয়া : ২/১৪৮)। তাই রিলস ও শর্ট ভিডিওর নেশা থেকে বের হয়ে আসুন। আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে সময়কে কাজে লাগান। মনে রাখবেন, মৃত্যু হঠাৎ এসে যাবে তখন অনুতাপের কোনো সুযোগ থাকবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মৃত্যু যখন তাদের কারও কাছে এসে উপস্থিত হয় তখন সে বলে, হে আমার রব! আমাকে পুনরায় পাঠিয়ে দিন। যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি যা আমি ছেড়ে এসেছি’ (সুরা মুমিনুন : ৯৯-১০০)। অতএব আজ থেকে আর একটি মুহূর্তও নষ্ট না করে আল্লাহর পথে চলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেদায়েত দান করুন এবং সময়ের সঠিক মূল্য বোঝার তওফিক দিন।
শিক্ষক, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা
এএডি/