দুয়ারে কড়া নাড়ছে মাহে রমজান

মাওলানা মুহিউদ্দীন ফারুকী

মুসলিম উম্মাহর জন্য অফুরন্ত কল্যাণ বহন করে আসে পবিত্র মাহে রমজান। এ মাস রহমত, বরকত, নাজাতের মাস। আল্লাহর বিশেষ দান

2026-02-06T10:09:30+00:00
2026-02-06T10:09:30+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
দুয়ারে কড়া নাড়ছে মাহে রমজান
মাওলানা মুহিউদ্দীন ফারুকী
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১০:০৯ এএম   (ভিজিট : ১৬২)
প্রতীকী ছবি
মুসলিম উম্মাহর জন্য অফুরন্ত কল্যাণ বহন করে আসে পবিত্র মাহে রমজান। এ মাস রহমত, বরকত, নাজাতের মাস। আল্লাহর বিশেষ দান এ মাস পাওয়া বান্দার জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। আল্লাহর রাসুল (সা.) দুই মাস আগ থেকেই এ মাস লাভের আকুতি জানিয়ে বিশেষ প্রার্থনা করতেন মহান রবের কাছে। তিনি বেশি বেশি বলতেন, ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শাবান ওয়া বাল্লিগনা রামাদান, অর্থাৎ ইয়া আল্লাহ! রজব এবং শাবানে আপনি আমাদের বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত জীবন দান করুন।’ পবিত্র রমজানের ফজিলত ও মাহাত্ম্য অফুরান। রমজানের প্রতিটি দিন-রাত ও মুহূর্ত বরকতপূর্ণ। দিনভর সিয়াম সাধনা, রাতভর কিয়ামুল্লাইল, সার্বক্ষণিক জিকির-তেলাওয়াত-দান-সদকায় পরকালের নিবাস সমৃদ্ধ করার বসন্ত মাস। এ মাস এলেই আল্লাহর রাসুল (সা.) সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাতেন।

রমজান হচ্ছে আল্লাহর ভয় ও তাকওয়ার গুণ অর্জনের একটি পাঠশালা। তাকওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করে একজন ব্যক্তি হয়ে উঠতে পারে পরিপূর্ণ মুমিন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো’ (সুরা আল-বাকারা : ১৮৩)। তাই এই মহান মাসে আমাদের এই গুণে গুণান্বিত হতে হবে এবং সারা বছর তা ধরে রাখতে চেষ্টা করতে হবে। এই মাসে সিয়াম পালন করার মাধ্যমে সব গুনাহ ও পদস্খলনগুলোকে মাফ করা হয়। দূর করা হয় সব পাপ ও পঙ্কিলতা। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখবে, তার আগের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে’ (বুখারি ও মুসলিম)। সিয়ামের সঙ্গেই হাদিসে এসেছে কিয়ামের কথা। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে কিয়াম করবে, তার আগের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে’ (বুখারি ও মুসলিম)। ইমাম নববি (রহ.) বলেছেন, ‘এই কিয়াম অর্থ হচ্ছে তারাবিহ।’ অতএব বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সতর্কতা ও সচেতনতা অবলম্বন করে সবাই বিশ রাকাত তারাবিহ আদায় করে এই সওয়াব অর্জনে সচেষ্ট হবে।

রমজান আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই তার কল্যাণের সুবাস বইতে থাকে সবদিকে। জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। মানুষকে যেন বিভ্রান্ত, আল্লাহবিমুখ না করতে পারে সে জন্য শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন রমজান আসে, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শিকলাবদ্ধ করা হয়’ (বুখারি ও মুসলিম)। যে ব্যক্তি যথাযথ সিয়াম পালন করবে আল্লাহ তায়ালা তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে হেফাজত করবেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘সিয়াম ঢালস্বরূপ’ (বুখারি ও মুসলিম)। অর্থাৎ সিয়াম ঢালের মতো ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবে। সিয়াম অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও মহান আমল। তাই এর  প্রতিদান আল্লাহ তায়ালা নিজেই দান করবেন। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘রোজা আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দেব।’ (বুখারি, মুসলিম)

মানবজাতির হেদায়েত ও পথনির্দেশ হিসেবে এই মাসেই নাজিল হয়েছে মহাগ্রন্থ আল কুরআন। আল্লাহ তায়লা বলেন, ‘রমজান মাস, এতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে মানুষের হেদায়েতের জন্য এবং হেদায়েতের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে’ (সুরা বাকারা : ১৮৫)। তাই এই মাসে অধিক পরিমাণে কুরআন তেলাওয়াত করতে হবে। এর বিশেষ ফজিলত রয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈনসহ আসলাফরা তাই এই মাসে অনেক বেশি কুরআন তেলাওয়াত করতেন। জিবরাইল (আ.) রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে কুরআনের মুদারাসা বা পাঠবিনিময় করতেন। অর্থাৎ একজন অপরজনকে শোনাতেন। তাই রমজানে নিজে তেলাওয়াতের সঙ্গে সঙ্গে একজন অপরজনকে কুরআন শোনানো উত্তম আমল। এ ছাড়া মুসলমান যত কুরআন তেলাওয়াত করবে জান্নাতে ততই তার মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। 

রাসুল (সা.) বলেন, ‘কুরআন তেলাওয়াতকারীকে বলা হবে পড়ো, ওপরে ওঠো এবং তেলাওয়াত করতে থাকো যেমন দুনিয়াতে তেলাওয়াত করতে; সর্বশেষ পঠিত আয়াতের স্থানেই তোমার অবস্থান’ (আহমাদ)। এই মাস অত্যন্ত বরকতপূর্ণ। এতে ওমরাহ হজের সমতুল্য। রাসুল (সা.) আনসারি এক মহিলাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আমাদের সঙ্গে হজ করতে তোমাকে কে নিষেধ করেছে?’ উত্তরে মহিলা বলেন, ‘আমাদের একটি উট ছিল যা আমার স্বামী ও ছেলে নিয়েছে, অন্যটি আমরা ব্যবহার করছি।’ শুনে রাসুল (সা.) বললেন, ‘রমজান এলে তাতে ওমরাহ আদায় করো, কেননা রমজানে ওমরাহ হজের সমতুল্য।’ (বুখারি)

রমজানে দান একটি অনন্য শ্রেষ্ঠ আমল। রমজান এলে রাসুল (সা.)-এর উদারতা, দানশীলতা আরও বেড়ে যেত। তিনি কল্যাণের ক্ষেত্রে ছিলেন প্রবহমান বাতাস অপেক্ষা অগ্রগামী। হাদিসে এসেছে, ‘উত্তম দান হচ্ছে রমজান মাসের দান।’ তাই রমজান মানুষকে দান-দক্ষিণা ও উদারতা শেখায়। মিসকিন ও অভাবী মানুষের প্রতি দয়া এবং বদান্যতা প্রকাশের এক সুবর্ণ সময় মাহে রমজান। রোজাদারকে ইফতার করানোতেও রয়েছে বিশাল সওয়াব। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে তার জন্য রোজার সমপরিমাণ প্রতিদান রয়েছে।’ তাই প্রত্যেকেই অন্যকে ইফতার করানোর একটি সুযোগ গ্রহণ করতে পারে।

এই মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হচ্ছে দোয়া করা। তাই বলা হয় রমজান দোয়ার মাস। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলে দিন যে) নিশ্চয় আমি অতিনিকটে। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে আমি তার আহ্বানে সাড়া দিই। কাজেই তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে’ (সুরা বাকারা : ১৮৬)। যেহেতু সিয়ামের আয়াতের মাঝে এই দোয়ার কথাটি এসেছে তাই মুফাসসাররা বলেন, এতে বোঝা যাচ্ছে এ মাসে বান্দার উচিত অধিক পরিমাণে দোয়া করা। রাসুল (সা.) এক হাদিসে এদিকেই ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘তিন ধরনের ব্যক্তির দোয়া বিফলে যায় না। এর মাঝে এক ধরনের হচ্ছে, রোজাদার যখন ইফতার করে।’ অতএব, এ মাসে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ কামনায় দোয়ার ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষত সারা বিশ্বে যে মহামারি দেখা দিয়েছে তার প্রাদুর্ভাব যেন দ্রুত শেষ হয়ে যায় সে জন্য এই রমজানে দোয়া করতে হবে। করোনায় যারা আক্রান্ত তাদের সুস্থতার জন্য দোয়া করতে হবে।

শেষ দশক এ মাসের শ্রেষ্ঠাংশ। এতে রয়েছে এমন রাত যে রাতের ইবাদত হাজার মাস ইবাদত অপেক্ষা উত্তম। আল্লাহ তায়ালার কাছে এ রাতের সম্মানের কারণেই ফেরেশতার আগমন বেশি ঘটে। আর ফেরেশতারা বরকত আর রহমত নিয়েই অবতরণ করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘লাইলাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম’ (সুরা কদর : ৩)। অতএব, যে বেশি পুণ্য অর্জন করতে চায় তাকে এই দশকে অধিক আমল করতে হবে। শেষ দশককে আরও ফলপ্রসূ করার জন্য এই দশকে এক বিশেষ আমল হচ্ছে ইতিকাফ। ইতিকাফ স্রষ্টার সান্নিধ্য অর্জনের এক মহান সময়। রাসুল (সা.) কখনো ইতিকাফ বাদ দিতেন না। হাদিসে এসেছে, ‘নবী (সা.) আমৃত্যু রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করেছেন’ (বুখারি ও মুসলিম)। ইবনে বাত্ত্বাল (রহ.) বলেন, এতে বোঝা যায়, ইতিকাফ সুন্নাতে মুয়াক্কাদা, কেননা রাসুল (সা.) এ আমলটি সর্বদা করেছেন। অতএব, মুমিনদের উচিত এ ক্ষেত্রে তাদের নবীর অনুসরণ করা। এবারের প্রেক্ষাপট যেহেতু ভিন্ন তাই সবদিক বিবেচনায় রেখে এই আমলটিকে জীবিত রাখতে সচেষ্ট হতে হবে।

আত্মার পরিচর্যা, আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র গঠনের মাসব্যাপী পাঠশালা এই রমজান মাস যেন সব ধরনের মিথ্যা, অপরাধ এবং অসংযত কাজ থেকে বেঁচে থাকা যায়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন তোমাদের কেউ রোজা রাখে তখন যেন পাপাচার এবং শোরগোল না করে। যদি তাকে কেউ গালমন্দ করে বা ঝগড়ায় জড়ায়, তা হলে সে যেন বলে আমি রোজাদার।’ অন্য হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ এবং মূর্খতা পরিত্যাগ করে না, তার পানাহার ত্যাগ করায় আল্লাহ তায়ালার কোনো প্রয়োজন নেই।’ অতএব, এই মাসে পাপাচার ও ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকতে হবে। এর শিক্ষা নিয়ে সারা বছর সব পাপাচার থেকে বেঁচে থাকতে হবে। 

এই মাসের কল্যাণের সার্বিক দিক বিবেচনায় বলা যায় মাহে রমজান আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য ও নৈকট্য অর্জনের এক সুবর্ণ সুযোগ। পুরো মাসেই রয়েছে অফুরন্ত কল্যাণ। সেই কল্যাণ গ্রহণে আমাদের সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে। আল্লাহ তায়ালা তওফিক দান করুন।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, মারকাযুল লুগাতিল 
      আরাবিয়্যাহ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা

Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: