উন্নত মানবজাতি তৈরির অশুভ ছক কষেছিলেন এপস্টেইন

সময়ের আলো ডেস্ক

জেফরি এপস্টেইন ২০১৯ সালে মারা গেলেও তার কেলেঙ্কারির রেশ এখনও কাটেনি। নতুন করে প্রকাশিত নথিপত্র দেখাচ্ছে, তিনি শুধু যৌন অপরাধের

2026-02-08T03:40:22+00:00
2026-02-08T03:40:22+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
উন্নত মানবজাতি তৈরির অশুভ ছক কষেছিলেন এপস্টেইন
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৩:৪০ এএম 
জেফরি এপস্টেইন। সংগৃহীত ছবি
জেফরি এপস্টেইন ২০১৯ সালে মারা গেলেও তার কেলেঙ্কারির রেশ এখনও কাটেনি। নতুন করে প্রকাশিত নথিপত্র দেখাচ্ছে, তিনি শুধু যৌন অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, বরং যৌনতা, অর্থ, ক্ষমতা এবং বিকৃত বৈজ্ঞানিক কল্পনার এক ভয়ংকর জালের কেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন। এই জালে জড়িয়ে ছিলেন বিশ্বের বহু ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস প্রায় ৩০ লাখ নথি প্রকাশ করেছে।

সেসব নথিতে উঠে এসেছে এপস্টেনের আরেকটি দিক। তিনি মানবজাতিকে তথাকথিত ‘উন্নত’ করার চিন্তায় আচ্ছন্ন ছিলেন। জিনতত্ত্ব, জিন সম্পাদনা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে একত্র করে তিনি এমন এক ভবিষ্যতের কল্পনা করতেন, যেখানে মানুষকে ইচ্ছেমতো বদলে ফেলা যাবে। তিনি নিজেকে ট্রান্সহিউম্যানিজমের অনুসারী ভাবতেন, যা মূলত ইউজেনিক্স ও আধুনিক প্রযুক্তিকে মিলিয়ে মানুষের ‘উন্নত সংস্করণ’ তৈরির দর্শন।

নথিতে দেখা যায়, এপস্টেইন বর্ণবাদী ও লিঙ্গ বৈষম্যমূলক চিন্তায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি মনে করতেন, জিনগত কারণে কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় কম বুদ্ধিমান। ২০১৬ সালে নোয়াম চমস্কিকে লেখা এক ই-মেইলে তিনি দাবি করেন, আফ্রিকান আমেরিকানদের পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়া ‘প্রমাণিত সত্য’। তার মতে, সমাজকে উন্নত করতে হলে এসব ‘অস্বস্তিকর সত্য’ মেনে নিতে হবে। জার্মান কগনিটিভ বিজ্ঞানী জোশা বাখের সঙ্গে তার ই-মেইল চালাচালিতে আরও ভয়াবহ চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়। বাখ তখন এমআইটিতে কাজ করতেন এবং এপস্টেইনের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অনুদান নিয়েছিলেন।

তাদের কথোপকথনে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, এপস্টেইন কৃষ্ণাঙ্গদের জিন পরিবর্তন করে তাদের বেশি বুদ্ধিমান বানানোর সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছিলেন। বাখ যুক্তি দিয়েছিলেন, কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের শারীরিক বিকাশ দ্রুত হওয়ায় মানসিক বিকাশ পিছিয়ে যায়, আর ইউরোপীয়রা কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রার কারণে মানসিকভাবে বেশি উন্নত। এই বিতর্কিত ও অবৈজ্ঞানিক তত্ত্বে এপস্টেইন কোনো আপত্তি জানাননি।

এই আলোচনার এক পর্যায়ে বাখ এমনটাও বলেন যে, মানুষের সংখ্যা বেশি হয়ে যাওয়ায় বয়স্ক ও দুর্বলদের গণহারে মারা যাওয়াই যুক্তিসংগত হতে পারে। এপস্টেইন সেখানেও প্রতিবাদ করেননি। যদিও পরে বাখ নিজেই স্বীকার করেন, এসব ধারণা ভুল ছিল এবং জাতিগত পরিচয়ের সঙ্গে বুদ্ধিমত্তার কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই।

বিজ্ঞানের জগতে এপস্টেনের প্রবেশ ঘটে জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখকদের এজেন্ট জন ব্রকম্যানের মাধ্যমে। ২০০৪ সালে তাদের পরিচয়ের পর থেকেই এপস্টেইন বিভিন্ন বিজ্ঞানী ও গবেষণায় অর্থায়ন করতে থাকেন। তিনি গর্ব করে বলতেন, বহু বিখ্যাত বিজ্ঞানী তার পৃষ্ঠপোষকতায় কাজ করেছেন। স্টিফেন হকিংসহ অনেক নামি গবেষকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। ২০০৬ সালে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে আয়োজিত এক সম্মেলনে এপস্টেইন প্রকাশ্যে মানব জিনোম নিখুঁত করা এবং বংশগতভাবে ‘উন্নত মানুষ’ তৈরির আগ্রহ প্রকাশ করেন। হার্ভার্ডের এক গবেষণা কর্মসূচিতেও তিনি মিলিয়ন ডলার অনুদান দেন, পাশাপাশি ট্রান্সহিউম্যানিস্ট সংগঠনেও অর্থ ঢালেন।

নতুন নথিতে দেখা যায়, এপস্টেইন নীল চোখের প্রতি বিশেষ মোহে ভুগতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, নীল চোখ বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ। যৌনতার জন্য আনা নারীদের মধ্যেও তিনি নীল চোখ খুঁজতেন। এমনকি এক বিজ্ঞান সম্মেলনের অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় তাদের চোখের রং পর্যন্ত লিখে রাখা হয়েছিল। 

বিনিয়োগকারী হিসেবেও তিনি ‘ডিজাইনার বেবি’ এবং মানব ক্লোনিং নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। এক ই-মেইলে তিনি প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সঙ্গে ক্লোনিং নিয়ে কথোপকথনের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে তিনি মজা করে বলেন, মানুষ ক্লোন করলে তাদের মাথা ছাড়াই বানানো যায় কি না। এসব কথাবার্তা তার বিকৃত মানসিকতারই প্রতিফলন। ২০১৮ সালে ক্রিপ্টো উদ্যোক্তা ব্রায়ান বিশপের সঙ্গে তিনি ডিজাইনার বেবি প্রকল্পে বিনিয়োগের কথা বলেন, তবে শর্ত ছিল সবকিছু গোপনে করতে হবে। বিশপের ভাষায়, শিশুদের পরিচয় প্রকাশ পেলে মিডিয়া তাদের আজীবন ‘অদ্ভুত জীব’ হিসেবে দেখাবে। লক্ষ্য ছিল কয়েক বছরের মধ্যে প্রথম ‘মানব ক্লোন’ তৈরি করা। 

এর আগেই নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছিল, এপস্টেইন নিউ মেক্সিকোর খামারে নিজের ডিএনএ ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। সেখানে নারীদের তার শুক্রাণু দিয়ে গর্ভবতী করে বহু সন্তান জন্ম দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তিনি একসঙ্গে ২০ জন নারীকে গর্ভবতী করতে চেয়েছিলেন বলে জানা যায়। এপস্টেইন ক্রায়োনিক্সেও আগ্রহী ছিলেন। নিজের মাথা ও শরীরের কিছু অংশ হিমায়িত করে ভবিষ্যতে জীবিত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতেন তিনি।

বিশ্লেষকরা বলেন, এসব পরিকল্পনার অনেকটাই বাস্তবে রূপ নেয়নি। কিন্তু নথিপত্র প্রমাণ করে এপস্টেইন কেবল একজন যৌন অপরাধী ছিলেন না। তিনি ছিলেন এমন এক ব্যক্তি, যার মাথায় জাতি, লিঙ্গ এবং জিনগত শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে গভীরভাবে বিকৃত ও বিপজ্জনক চিন্তা বাস করত। মানবজাতিকে ‘উন্নত’ করার নামে তিনি আসলে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করেছিলেন, যা ইতিহাসে বারবার ভয়াবহ পরিণতি ডেকে এনেছে। এপস্টেইন তাই শুধু ব্যক্তিগত অপরাধের প্রতীক নন, তিনি আধুনিক যুগের এক অন্ধকার মানসিকতারও প্রতিচ্ছবি।

সময়ের আলো/এআর

  বিষয়:   উন্নত  মানবজাতি  এপস্টেইন 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: