প্রকাশ: সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪:১৪ এএম
সংগৃহীত ছবিদ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন গর্বের সঙ্গে ঘোষণা দিয়েছে, ‘অবৈধ’ অভিবাসী তাড়ানোর ক্ষেত্রে তারা নাকি এক বছরের মধ্যেই ‘ঐতিহাসিক রেকর্ড’ গড়েছে। কিন্তু এখনও বাইডেন কিংবা ওবামার চেয়ে পিছিয়ে আছেন তিনি। ২০ জানুয়ারি প্রকাশিত হোমল্যান্ড সিকিউরিটির বিবৃতি অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রায় ৩০ লাখ অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্র ছেড়েছেন।
এর মধ্যে প্রায় ২২ লাখ মানুষ ‘স্বেচ্ছায়’ ফিরে গেছেন এবং ৬ লাখ ৭৫ হাজার জনকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এই পরিসংখ্যানের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। প্রশাসন কীভাবে এই সংখ্যা হিসাব করেছে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি। স্বাধীন কোনো সংস্থার পক্ষেও এগুলো যাচাই করার সুযোগ নেই। ফলে ট্রাম্পের দাবি সত্যিই ‘ঐতিহাসিক’ কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। এল পাইস।
ওবামা ও বাইডেন আমলের সঙ্গে তুলনা করলে চিত্রটি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ডেমোক্র্যাট প্রশাসনগুলো সাধারণত অপরাধে জড়িত বা সদ্য সীমান্ত পেরিয়ে আসা অভিবাসীদের অগ্রাধিকার দিয়ে ধরত। যারা দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন, পরিবার গড়ে তুলেছিলেন বা সমাজে কিছুটা স্থায়ী হয়ে উঠেছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা দেখা যেত। ট্রাম্প প্রশাসন সেই পার্থক্য রাখছে না। কাগজপত্র নেই এই একটাই পরিচয় এখন যথেষ্ট, কাউকে ‘অপরাধী’ হিসেবে ধরে নেওয়ার জন্য।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটির হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ নথিবিহীন অবস্থায় আছেন এবং কার্যত সবাইকে সম্ভাব্য অপরাধী হিসেবে দেখা হচ্ছে। আশ্রয়ের আবেদন ঝুলে থাকা, এমনকি বৈধ ওয়ার্ক পারমিট থাকা মানুষও ধরপাকড়ের বাইরে নন। বড় শহরগুলোর রাস্তায় এখন মুখোশধারী ইমিগ্রেশন এজেন্টদের দেখা মিলছে, যারা গাড়ির কাচ ভেঙে বা দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে লোক ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
হাসপাতাল, স্কুল বা উপাসনালয়ের মতো ‘সংবেদনশীল’ এলাকাগুলোতে অভিযান না চালানোর পুরোনো নীতিও বাতিল হয়েছে। এমনকি আদালতে হাজিরা দিতে আসা অভিবাসীদের সেখান থেকেই আটক করা হচ্ছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, ট্রাম্পের আমলে ফেরত পাঠানো অভিবাসীদের মধ্যে মাত্র ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের রেকর্ড রয়েছে। অর্থাৎ সংখ্যার বিচারে বহিষ্কৃতদের বড় অংশই সাধারণ মানুষ, যাদের একমাত্র ‘দোষ’ তারা বৈধ কাগজপত্র ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন।
ট্রাম্প নিজে বছরে ১০ লাখ মানুষকে বের করে দেওয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করেছিলেন। বাস্তবে সেই সংখ্যা এখন ৬ লাখ ৭৫ হাজারের কাছাকাছি, যা লক্ষ্যের তুলনায় বেশ কম। বরং বাইডেন প্রশাসনের শেষ বছরে (২০২৪) প্রায় ৬ লাখ ৮৫ হাজার মানুষকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল, যা ট্রাম্পের বর্তমান সংখ্যার চেয়েও বেশি। মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, সীমান্ত বা বিমানবন্দর থেকেই যাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদেরও ‘ডিপোর্টেশন’-এর হিসাবে যোগ করে সংখ্যাটি ফুলিয়ে দেখানো হতে পারে। কাকে কোন ক্যাটাগরিতে গণনা করা হচ্ছে, সেটাই এখনও পরিষ্কার নয়।
জো বাইডেন তার প্রথম দিকে নমনীয়তার জন্য সমালোচিত হলেও শেষ দুই বছরে অভিবাসন আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করেছিলেন। মোট হিসাবে তার সময়ে প্রায় ২০ লাখ মানুষকে ফেরত পাঠানো হয়। এর বাইরে করোনা মহামারির সময় ‘টাইটেল ৪২’ নীতির আওতায় সীমান্তে আটকে দেওয়া হয়েছিল ৩০ লাখের বেশি মানুষকে, যা এই পরিসংখ্যানের মধ্যেই পড়ে না। অভিবাসী তাড়ানোর রেকর্ডে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম বারাক ওবামা।
দুই মেয়াদে ৩০ লাখের বেশি মানুষকে ফেরত পাঠানোর কারণে তাকে একসময় ‘ডিপোর্টার-ইন-চিফ’ বলা হতো। ২০১৩ সালে এক বছরেই তার প্রশাসন ৪ লাখ ৩৩ হাজার মানুষকে আদালতের আদেশের মাধ্যমে ফেরত পাঠায়, যা এখনও সর্বোচ্চ। তবে তার অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল অপরাধে জড়িত বন্দিরা।
ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি আইনি প্রক্রিয়ায়। এখন আদালতের আদেশ ছাড়াই ‘এক্সপেডিটেড রিমুভাল’ বা দ্রুত ফেরত পাঠানোর পদ্ধতি ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে। আগে এই নিয়ম সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন দেশের ভেতরেও একইভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এই কঠোরতার বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় হুয়ানের গল্পে।
ভেনেজুয়েলা থেকে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন তিনি। বাইডেন প্রশাসনের চালু করা ‘সিবিপি ওয়ান’ অ্যাপের মাধ্যমে নিয়ম মেনেই আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই এই কর্মসূচি বাতিল করেন। গত ১২ অক্টোবর হুয়ানকে ডোমিনিকান রিপাবলিকে ফেরত পাঠানো হয়। তার দেড় মাস আগে পেনসিলভানিয়ায় কর্মস্থলে সকাল ৬টায় অভিযান চালিয়ে হুয়ানসহ ৩৩ জন শ্রমিককে আটক করে ইমিগ্রেশন এজেন্টরা।
ইউসি বার্কলের আইন অধ্যাপক ডেভিড হাউস ম্যান জানান, বর্তমানে রাস্তায় অভিবাসীদের ধরপাকড় আগের তুলনায় ১১ গুণ বেড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, যাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই, তাদের আটক করার হার বেড়েছে ৭ গুণ।
এই অভ্যন্তরীণ অভিযান বাড়ার পেছনে বড় একটি কারণ সীমান্ত পরিস্থিতির পরিবর্তন। ২০২৫ সালে প্রতি মাসে গড়ে মাত্র ৭ হাজার মানুষ সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করেছেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৮৮ হাজার। আর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তা পৌঁছেছিল আড়াই লাখে। সীমান্তে চাপ কমে যাওয়ায় বর্ডার প্যাট্রোলের কাজও কমেছে, ফলে তাদের এখন দেশের ভেতর অভিযানে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ডেভিড হাউস ম্যানের মতে, ‘২০২৫ সালে সীমান্তে ফেরত পাঠানোর হার কমেছে ঠিকই, কিন্তু দেশের ভেতর থেকে অভিবাসী বের করে দেওয়ার হার কয়েক গুণ বেড়েছে। কঠোর আইন প্রয়োগের ফলেই এমনটা হচ্ছে। তাই শুধু মোট সংখ্যা দেখলে পরিস্থিতির আসল ভয়াবহতা বোঝা যায় না।’
সময়ের আলো/এআর