বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি : সংগৃহীত১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করেছে। এই প্রথমবারের মতো বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং এটিই তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রথম নির্বাচন। সব ঠিক থাকলে দীর্ঘ দুই দশক পর আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে দলটি।
তারেক রহমানের বাবা জিয়াউর রহমান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম প্রধান নেতা। তিনি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেন এবং প্রায় চার দশক একটানা দলটির নেতৃত্ব দেন।
গত জোট সরকারের সময় মায়ের শাসনামলে ‘স্বজনপ্রীতির সুবিধা নেওয়ায়’ তারেক রহমান দুর্নীতির অভিযোগের মুখে পড়েন এবং মা মারা যাওয়ার পাঁচ দিন আগে লন্ডন থেকে ১৭ বছরের স্বেচ্ছা-নির্বাসন কাটিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
ঢাকায় ফিরে প্রথম জনসভায় তারেক রহমান দেশ পরিবর্তনে পরিকল্পনার কথা জানান। তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ে বড় রকমের প্রভাব রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
খালেদা জিয়া যখন কারাগারে ছিলেন এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন, তখন ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে বড় একটি অংশের কাছে তিনি এখনও একজন পরীক্ষিত নেতা নন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নাভিন মুর্শিদ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে জানান, তার (তারেকের) পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকাটা সম্ভবত তার জন্য ইতিবাচক হিসেবে কাজ করছে, কারণ মানুষ পরিবর্তনকে একটি সুযোগ দিতে চায়। তারা ভাবতে চায় যে নতুন এবং ভালো কিছু হওয়া আসলে সম্ভব। তাই অনেক আশা তৈরি হয়েছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা।
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরপরই বিএনপির সিনিয়র নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিবিসিকে বলেন, গত এক দশকে যে সমস্ত গণতান্ত্রিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, আমাদের প্রথমে সেগুলোকে সুশৃঙ্খল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে।
বাংলাদেশে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং পরে তা ভঙ্গ করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। দেশটিতে দলগুলো ক্ষমতায় আসার পর ক্রমশ স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে।
তবে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর এই বাস্তবতায় পরিবর্তন এসেছে। দেশের তরুণ সমাজ আগের মতো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি মেনে নেওয়ার বিষয়ে অনেক কম সহনশীল বলে মনে হচ্ছে।
অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ১৯ বছর বয়সী তাজিন আহমেদ বলেন, “আমরা আর লড়াই করতে চাই না। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগই মূল বিজয় ছিল না। যখন আমাদের দেশ কোনো দুর্নীতি ছাড়াই সচল হবে এবং অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, সেটিই হবে আমাদের আসল বিজয়।”
তার ২১ বছর বয়সী বোন তাহমিনা তাসনিম বলেন, “আমরা সবার আগে জনগণের মধ্যে ঐক্য চাই। একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র এবং স্থিতিশীল অর্থনীতির ওপর আমাদের অধিকার আছে। আমরা একটি অভ্যুত্থানের অংশ ছিলাম এবং আমরা জানি কীভাবে পাল্টা লড়াই করতে হয়। তাই যদি একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি শুরু হয়, তবে আমাদের আবারও তা করার অধিকার থাকবে।”
হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী প্রশাসনের প্রধান মোহাম্মদ ইউনূসের শাসনামল সংঘাত ও সহিংসতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা নতুন সরকারের একটি প্রধান অগ্রাধিকার হতে হবে। এছাড়া অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, খাবারের দাম কমানো এবং বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা অন্যান্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সমাজবিজ্ঞানী সামিনা লুৎফা মনে করেন, সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতার অভাব সব দলের ওপরই প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম ইসলামপন্থি জামায়াতে ইসলামী উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে জয়লাভ করে বিরোধী দলের ভূমিকায় আসতে যাচ্ছে। তাদের জোটসঙ্গী অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী কিছু শিক্ষার্থী দ্বারা গঠিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রথম নির্বাচনেই ছয়টি আসনে জয়ী হয়েছে।
লুৎফা বলেন, আমরা সংসদে এমন সব নেতাদের দেখতে যাচ্ছি, যারা এর আগে কখনো সংসদে যাননি। এনসিপির তরুণদের অনেক কিছু শেখার আছে। অন্যরা অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হলেও তাদের দেশ চালানোর অভিজ্ঞতা নেই। তাই এটি একটি অত্যন্ত কঠিন কাজ হতে যাচ্ছে।
নাভিন মুর্শিদ বলেন, এই নির্বাচনে জামায়াতের ফলাফল বিস্ময়কর নয়। তার মতে, জামায়াত একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল। গত কয়েক দশক ধরে তারা তৃণমূল পর্যায়ে নিরলসভাবে কাজ করেছে।
যদিও এই নির্বাচন হাসিনার অধীনে গত কয়েকটি নির্বাচনের তুলনায় একদম আলাদা ছিল। এতে প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল এবং ভোট শুরু হওয়ার আগে ফলাফল জানা ছিল না। তবুও আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ করা এর গ্রহণযোগ্যতার ওপর একটি ছায়া ফেলেছে।
আওয়ামী লীগকে পুনরায় রাজনৈতিক ধারায় ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সমর্থন দেবে কি না জানতে চাইলে বিএনপি নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এটি আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় নয়। বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের ফিরে আসতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে, কারণ তাদের গ্রহণযোগ্যতা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। যখন আপনি আপনার নিজের দেশের মানুষকে হত্যা, নৃশংসতা এবং নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন, তখন বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যতে তাদের স্থান কোথায় হবে তা জনগণই নির্ধারণ করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে তার দলের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ অত্যন্ত তীব্র, তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিবেচনা করলে আওয়ামী লীগকে চিরতরে বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়াটা হবে সময়ের আগে নেওয়া এক অপরিপক্ক সিদ্ধান্ত।
/এমএইচআর