আমানতে ভালো প্রবৃদ্ধি ব্যাংকমুখী হচ্ছেন গ্রাহক

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

অনিশ্চয়তা এবং লুটপাটের কারণে ব্যাংক খাতের ওপর আস্থা উঠেগিয়েছিল গ্রাহকের। বলা যায় ব্যাংক খাত থেকে মানুষ একরকম মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।

2026-02-14T23:29:33+00:00
2026-02-14T23:29:33+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
জাতীয়
আমানতে ভালো প্রবৃদ্ধি ব্যাংকমুখী হচ্ছেন গ্রাহক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১১:২৯ পিএম   (ভিজিট : ৮৮)
সংগৃহীত ছবি
অনিশ্চয়তা এবং লুটপাটের কারণে ব্যাংক খাতের ওপর আস্থা উঠেগিয়েছিল গ্রাহকের। বলা যায় ব্যাংক খাত থেকে মানুষ একরকম মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। এ জন্য ব্যাংকে আমানত একেবারে তলানিতে নেমেছিল। অবশেষে বাংকের আমানত পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি গত ৫০ মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস শেষে ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ১০ শতাংশ। মূলত শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ ও আমানতের সুদের হার বৃদ্ধির কারণেই তা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক আমানতের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। আর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এর পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস শেষে রেমিট্যান্স এসেছে ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ। আর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এসেছিল ২ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়তে শুরু করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় ৯-৬ সুদের নীতি থেকে সরে আসে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর থেকে ব্যাংক আমানত ও ঋণের সুদের হার বাড়তে থাকে। আগের নীতিতে ব্যাংকে আমানত রাখলে আমানতকারীরা তার বিপরীতে সুদ কম পেতেন। তবে সেই নীতি থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরে আসায় ব্যাংকে আমানত রাখা আরও আকর্ষণীয় হয়েছে।

বেসরকারি একটি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধান বলেন, বর্তমানে ৯ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশ পর্যন্ত আমানতের সুদের হার দিচ্ছে ব্যাংকগুলো, যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি রয়েছে। একই সময়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার আগের চেয়ে কমেছে। এ জন্য ব্যক্তি থেকে শুরু করে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যাংকে আমানত রাখছে। 

২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ। এরপর ক্রমাগতভাবেই ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি কমেছিল। এর মধ্যে টানা ১৭ মাস ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের ঘর থেকে ২০২৫ সালের আগস্টে দুই অঙ্কে দাঁড়ায়।  

কয়েকটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা বলেছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়া, কাক্সিক্ষত রফতানি আয় না আসা, বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি শ্লথ থাকা সত্ত্বেও মূলত রেমিট্যান্স প্রবাহ বেশি থাকার কারণে ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে।

একটি ব্যাংকের এমডি বলেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার কারণে ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। কারণ বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়া ও মানুষের আয় না বাড়ার পরেও আমানতের পরিমাণ বাড়ছে।

আরেক ব্যাংকের এমডি বলেন,  বিনিয়োগের নিরাপদ জায়গা হিসেবে ব্যাংকে আস্থা রয়েছে সাধারণ মানুষের। তা ছাড়া রেমিট্যান্স ব্যাংকিং চ্যানেলে আসলে তা টাকাতে কনভার্ট হয়। তখন ব্যাংক আমানতের পরিমাণও বাড়ে। তা ছাড়া ব্যাংক আমানতের সুদের হারও আগের চেয়ে বেড়েছে।

এদিকে ব্যাংকে আমানত বাড়লেও কোনোভাবেই খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। দেশের ব্যাংকগুলো যত টাকা ঋণ দিয়েছে, তার এক-তৃতীয়াংশের বেশিই এখন খেলাপি। মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতের বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। যার ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ এখন খেলাপি। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

ব্যাংকাররা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কম করে দেখানোর যে প্রবণতা ছিল, তা এখন হচ্ছে না। ফলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে। কিছু দিন পর বরং খেলাপি ঋণের হার আরও বাড়বে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠিত হওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের হিসাব করে থাকে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে অর্থাৎ তিন মাস পরপর। গত জুন মাসে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৮ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৩৬ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা।

শেখ হাসিনার টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর একটা অপপ্রয়াস ছিল। তথ্য বিকৃত করে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা আমরা দেখেছি। সঠিকভাবে হিসাব করায় সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি হার প্রায় ৩৬ শতাংশ হয়েছে। এটা অবিশ্বাস্য হলেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিছু দিনের মধ্যে এ হার বরং ৪০ শতাংশও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ব্যাংকাররা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও দুর্নীতি এত বেশি মাত্রায় হয়েছে যে খেলাপি ঋণের এ উচ্চ হার সেই চিত্রেরই প্রমাণ দিচ্ছে। এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, হল-মার্ক গ্রুপসহ আরও গ্রুপ এবং বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির কারণে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪১ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১১ সালে খেলাপি ঋণের হার ৬ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এলেও বড় বড় কেলেঙ্কারির পরে তা বাড়তে থাকে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার নির্ধারণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকাররা বলছেন, এ কারণেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার বেড়েছে।

ব্যাংকাররা বলছেন, এ কারণেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার বেড়েছে। খেলাপি ঋণ নীতিমালা অনুযায়ী, ঋণের কিস্তি পরিশোধের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরদিন থেকে সেই ঋণ বকেয়া হিসেবে বিবেচিত হবে। গত এপ্রিলের আগপর্যন্ত কিস্তি পরিশোধের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯ মাস পর্যন্ত খেলাপি হিসেবে গণ্য করা হতো না। অর্থাৎ ৯ মাস শেষে গিয়ে খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হতো। এখন বকেয়া হওয়ার তিন মাস পরেই খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। তিন মাস আগে যা ছিল ৩ লাখ ১৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রভিশন ঘাটতিও ব্যাপক বাড়ছে। খেলাপি ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে ব্যাংক তাদের আয় থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সঞ্চিতি হিসেবে রাখে। কোনো কারণে ঋণ আদায় না হলেও গ্রাহকদের আমানতকে সুরক্ষা দেওয়াই হচ্ছে এর অন্যতম কারণ। প্রভিশন ঘাটতি হচ্ছে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে না পারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। তিন মাস আগে যা ছিল ৩ লাখ ১৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ২৪ হাজার ৫১১ কোটি টাকা।

কম-বেশি সব ব্যাংকেই খেলাপি গ্রাহক আছে। তবে বিদেশি ব্যাংকে কম ও রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে বেশি। জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংকে খেলাপির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। তবে মোট খেলাপি বৃদ্ধিতে একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংকের দায় কম নয়। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক একীভূত হতে যাচ্ছে। এ পাঁচ ব্যাংকের প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে দেড় লাখ কোটি টাকা খেলাপি।

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   আমানত  ভালো  প্রবৃদ্ধি  ব্যাংক  গ্রাহক 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: