একসময় মানুষের সম্পর্ক গড়ে উঠত মুখোমুখি আলাপ, চিঠি বা দীর্ঘ কথোপকথনের মাধ্যমে। আবেগ, অনুভূতি আর সময় দেওয়া সবকিছুর মধ্য দিয়েই সম্পর্ক তৈরি হতো। কিন্তু এখন সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে ছোট ছোট নোটিফিকেশন, স্ক্রলিং আর কনটেন্ট। মানুষের আবেগ-অনুভূতিও যেন ধীরে ধীরে কনটেন্টে রূপ নিচ্ছে, আর সম্পর্কগুলোও হয়ে উঠছে এক ধরনের ডিজিটাল অভ্যাস মাত্র। অনেকে বলেন, স্মার্টফোন যেমন সম্পর্ক রক্ষার সহজ মাধ্যম, তেমনি নীরবে সম্পর্ক ভাঙারও বড় হাতিয়ার। কারণ এখন আমাদের জীবনের বড় একটি অংশ ফোনের ভেতরে চলে গেছে। সেখানে তৈরি হয়েছে আলাদা এক দুনিয়া, যেখানে মুখোমুখি বসে কথা বলার সুযোগ নেই। গেমস, ভিডিও, রিলস, গান, শপিং, খবর সব মিলিয়ে এত কিছু আছে যে প্রিয় মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো আর কনটেন্ট দেখা এই দুটির মধ্যে পার্থক্যটাই মুছে যাচ্ছে।
এই ভার্চুয়াল দুনিয়া এত রঙিন আর আকর্ষণীয় যে অনেক সময় কাছের মানুষের কথার চেয়ে অচেনা কারও ভিডিও, বিজ্ঞাপন বা রিলস বেশি মন টানে। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমও ঠিক সেভাবেই তৈরি যাতে ব্যবহারকারী যতবেশি সময় স্ক্রিনে থাকে, ততবেশি একই ধরনের কনটেন্ট দেখানো হয়। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে এই জগতে আটকে পড়ে, আর বাস্তব সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যায়। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ও সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ মুশফিকুর রহমান চৌধুরীর মতে, ফেসবুক খুব সহজেই বুঝে ফেলে ব্যবহারকারী কোন ধরনের কনটেন্টে কত সময় দিচ্ছে। যে কনটেন্টে বেশি সময় যায়, সেটাই বারবার সামনে আসে। বয়স, আগ্রহ, সার্চ সবকিছু বিশ্লেষণ করেই ফেসবুক মানুষের মনোযোগ ধরে রাখে। এতে মানুষ অজান্তেই আসক্ত হয়ে পড়ে এবং প্রয়োজন ছাড়া সময় নষ্ট করতেই থাকে।
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ড. ইসমত জাহান বলেন, এখন মানুষ মুখোমুখি কথা বলার চেয়ে অনলাইনে কানেক্টেড থাকাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। কিন্তু এই সংযোগে প্রকৃত যোগাযোগ নেই। মানুষ এত ব্যস্ত আর ক্লান্ত যে নিজের অনুভূতিগুলোও কাউকে বলতে চায় না। তাই সরাসরি যোগাযোগ এড়িয়ে চলার প্রবণতা বাড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তৈরি হয়েছে নির্ভরশীলতা, কিন্তু সেখানে কোনো বাস্তব উৎপাদনশীলতা নেই শুধু সময় পার করা। এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে পরিবারেও। বাসায় গেটটুগেদার হলেও সবার চোখ থাকে ফোনে। দু-একটা কথা ছাড়া আর তেমন আলাপ হয় না। মানুষ মনে করে, ফেসবুকে একটা রি-অ্যাক্ট দিলেই দায়িত্ব শেষ। সম্পর্কগুলো হয়ে উঠছে দায়সারা আর হিসেবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাইসা খানম বলেন, তিনি প্রায়ই এক পোস্ট থেকে আরেক পোস্টে, এক ভিডিও থেকে আরেক ভিডিওতে চলে যান নিজের অজান্তেই। কত ঘণ্টা কেটে যায়, বোঝাই যায় না। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া সেই সাজানো দুনিয়া থেকে বের হওয়াই কঠিন। একই অভিজ্ঞতার কথা বলেন আরেক শিক্ষার্থী ফাহাদ হোসেন। তার মতে, ফোন হাতে একা সময় কাটানোতেই এখন স্বাচ্ছন্দ্য। বাস্তব যোগাযোগের বদলে চ্যাট, ভয়েস মেসেজ আর সিন করে রাখাই হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক অভ্যাস।
ড. ইসমত মনে করেন, এই পরিবর্তনের পেছনে দীর্ঘ সামাজিক রূপান্তর আছে। ছোট পরিবার, ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবন, আলাদা আলাদা স্ক্রির সব মিলিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের জগতে বন্দি হয়ে পড়ছে। আগে একসঙ্গে বসে টিভি দেখা, কথা বলা, সময় কাটানো ছিল। এখন সবাই আলাদা আলাদা ফোনে ব্যস্ত। এর ফলে মানুষ ফোন করেও খোঁজ নেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। ফেসবুক পোস্ট দেখেই অনেকেই ধরে নিচ্ছে সব ঠিক আছে। আগে মানুষ চিঠি লিখত, কবিতা লিখত, কথা বলত। এখন ভিডিও কলেই সব সারা, তাও বেশিরভাগ সময় অভিযোগ আর অপ্রাসঙ্গিক কথায় ভরা।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে গ্রহণযোগ্যতার জায়গায়। আগে সম্পর্কে ভুল হলে মানুষ মেনে নিত। এখন সবাই নিজের পারফেক্ট রূপ দেখাতে ব্যস্ত। বাস্তব আচরণের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার ইমেজ। ফলে সম্পর্কগুলো হয়ে উঠছে ঠুনকো, দ্রুত ভাঙার মতো। একসময় সম্পর্কই ছিল মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। কিন্তু আজ ছোট একটি স্ক্রিনের ভিড়ে সেই সম্পর্কগুলোই ধীরে ধীরে ঢেকে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল আলাপ আর ইনস্ট্যান্ট যোগাযোগের যুগে কাছের মানুষগুলোই হয়ে উঠছে সবচেয়ে দূরের।