পুরান ঢাকার ইফতার মানেই বাহারি পদের খাবারের সমাহার। প্রতি বছরের মতো এবারও রমজানের শুরু থেকেই ঐতিহ্যের এ আদি ঢাকায় দেখা মিলছে মুখরোচক সব ইফতারি ও হরেক রকমের শরবতের।
পুরান ঢাকার অলিগলিতে সারি সারি অস্থায়ী দোকানে এ রোজায় এখন বিক্রেতাদের ব্যস্ত সময় কাটে। বিশেষ করে রমজান মাস উপলক্ষে অনেকেই নিজেদের মূল পেশা বদলে হয়ে উঠেছেন মৌসুমি ইফতার বিক্রেতা। চাহিদাও যথেষ্ট, ফলে বিকাল থেকেই মোড়ে মোড়ে বেচা-বিক্রির ধুম পড়ে যায়। পিছিয়ে নেই নামি-দামি হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোও। ভোজনরসিকদের টানতে তারা সাজিয়েছে স্পেশাল ইফতার প্যাকেজ। সব মিলিয়ে ইফতারের এই জমজমাট আয়োজন পুরান ঢাকার এক অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) পুরান ঢাকার বাংলাবাজার, লক্ষ্মীবাজার, কলতাবাজার, রায়সাহেব বাজার, নবাবপুর, নারিন্দা, ধূপখোলা, সূত্রাপুর, ইসলামপুর ও পাটুয়াটুলী এলাকা ঘুরে ছোট-বড় অসংখ্য ভাসমান ইফতারির দোকান দেখা গেছে। বিক্রেতারা এসব দোকানে ছোলা, আলুর চপ, বেগুনি, পিঁয়াজু, জিলাপি, বুন্দিয়া, ঘুগনি, পাকোড়া, মুড়ি, চিড়া-মুড়ি, দই-চিড়া, নুডলস, চিকেন ফ্রাই, চিকেন ঝালফ্রাই, চিকেন তন্দুরি, চিকেন টিক্কা, চিকেন কাবাব, চিকেন বল, চিকেন পরোটা, চিকেন গ্রিল, শাহী হালিম, বিরিয়ানিসহ অসংখ্য ইফতারসামগ্রী পসরা সাজিয়ে বসেছেন। এ ছাড়া মোড়ে মোড়ে রয়েছে ফলমুলের অনেক দোকান। এর মধ্যে কিছু স্থায়ী দোকান থাকলেও অধিকাংশই অস্থায়ী ভাসমান দোকান।
এসব দোকানে বিক্রি হচ্ছে- আপেল, আঙুর, কমলা, বেদানা, আনারস, পেয়ারা, খেজুর, পেঁপে, কলা, বাঙ্গি, বেল। এবার রোজার শুরুর দিকে ফলমুলের দাম একটু বেশি থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন রোজাদাররা।
প্রতি বছরই রমজান মাসজুড়ে পুরান ঢাকায় শরবত ও অন্য পানীয়ের বিশেষ পসরা বসে। এসব শরবত ও পানীয় বিক্রি হয় পুরান ঢাকার অলিগলিতে। এর মধ্যে রয়েছে- আনারস, পেঁপে, পেস্তাবাদাম, কাজুবাদামের শরবত, লাবাং, মাঠা, বোরহানি, লাচ্ছি, ফালুদা ইত্যাদি। এসব শরবত বানাতে ব্যবহার করা হয় নানা উপাদেয় উপকরণ।
সরকারি কবি নজরুল কলেজের একটু পাশে ইফতারি বিক্রি করছিলেন হাসান আলি। রমজানের আগে তিনি বিক্রি করতেন সবজি। রমজানে শুরু করেছেন ইফতারসামগ্রী বিক্রির ব্যবসা।
বেচাবিক্রির ফাঁকে তিনি জানান, অন্য সময়ের তুলনায় রোজায় ভাজা-পোড়াজাতীয় খাবারের বিক্রিবাট্টা বেশি। আর রোজাদারদের জন্য ইফতার তৈরি করলে সওয়াবও হয়। লাভও বেশ।
এদিন বাহাদুর শাহ মসজিদের পাশে ইফতারি বিক্রি করছিলেন জাফর আহমেদ। আসরের নামাজের আগে থেকে তার ভাসমান দোকানে শুরু হয় ক্রেতাদের ভিড়। ইফতারি বিক্রির ভিড়ের মধ্যেই তিনি বলেন, আমার দোকানে বেশ ভালো বিক্রি হচ্ছে। ছোলা, বেগুনি, আলুর চপ, পিঁয়াজু, জিলাপিসহ বিভিন্ন ধরনের আইটেম বিক্রি করছি আমি। লাভও মোটামুটি ভালো হচ্ছে। কাঁচামালের দাম আরেকটু কম হলে বেশি লাভ করতে পারতাম।
বাসার জন্য ইফতারসামগ্রী কিনতে এসেছেন হামিদুর রহমান। বেশ কয়েক পদের ইফতারি কিনেছেন তিনি। হামিদুর রহমান বলেন, আমার বাসার ইফতারির মেন্যুতে ঘরে তৈরি ইফতারির আইটেমই বেশি। তবে দোকান থেকে ভাজা-পোড়াজাতীয় খাবার সংগ্রহ করি। বেগুনি, পিয়াজু, জিলাপি দোকান থেকে কিনি। বাইরের খাবার অস্বাস্থ্যকর, তারপরও উপায় নেই। বাসায় সব খাবার তৈরি সম্ভব না।
রায় সাহেব বাজারে ফল কিনতে এসেছেন মারিয়া আনজুম। ফলের দাম নিয়ে বলেন, রোজার শুরুর দিকে ফলের দাম অনেক বেশি। ফলের দাম কমা উচিত। দাম না কমলে আমরা মধ্য আয়ের মানুষ রোজার মাসে চরম ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যাব। এখন ইফতারের মেন্যুতে চাহিদামাফিক ফল রাখতে পারছি না।
সময়ের আলো/এনএ