গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সরকার গঠন করেছে বিএনপি। এই নতুন সরকারের আমলের প্রথম বাজেট আসবে আগামী জুন মাসে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেট সামনে রেখে বাজেট প্রস্তুতি শুরু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
এ লক্ষ্যে জাতীয় বাজেটে আয়কর-সম্পর্কিত বিভিন্ন আইন ও বিধি সংশোধন, সংযোজন বা পরিবর্তনের জন্য দেশের বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রস্তাব ও সুপারিশ আহ্বান করা হয়েছে এনবিআরের পক্ষ থেকে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, বিভিন্ন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনের কাছে ইতিমধ্যে তাদের প্রস্তাব ও সুপারিশ চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে এনবিআর। কর ব্যবস্থাকে আরও যুগোপযোগী ও অংশীদারত্বমূলক করার লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ ইতিমধ্যে শুরু করেছে এনবিআর। এটি নতুন সরকারের প্রথম বাজেট।
বিভিন্ন ব্যবসায়ী সমিতি, চেম্বার ও প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো চিঠিতে নতুন প্রস্তাবের পক্ষে যৌক্তিক মতামত দিতে বলা হয়েছে। আয়কর, শুল্ক ও ভ্যাট বিষয়ে প্রস্তাব ও সুপারিশ করার জন্য চিঠিতে ছক তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।
১৫ মার্চের মধ্যে সুপারিশ ও প্রস্তাব পাঠাতে অনুরোধ করা হয়েছে। পেনড্রাইভেও প্রস্তাব দেওয়া যাবে। এ ছাড়া সরাসরি ই-মেইলের মাধ্যমেও প্রস্তাব-সুপারিশ পাঠানো যাবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রথম বাজেট। এখানে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন থাকবে। এ ছাড়া রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বড় চ্যালেঞ্জ আছে। আছে রাজস্ব খাতে সংস্কারের চ্যালেঞ্জ।
নতুন অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনা
এদিকে আগামী জাতীয় বাজেটে সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলোর প্রতিফলন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন নতুন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর মাধ্যমে প্রথম অর্থবছর থেকেই প্রশাসনের নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ইচ্ছার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী নীতিনির্ধারকদের এমনভাবে বাজেট প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলোর অগ্রগতির বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে মন্ত্রী এই নির্দেশনা দেন।
বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, আমীর খসরু জোর দিয়ে বলেন, আগামী জুনে পেশ হতে যাওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে যেন বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের সুস্পষ্ট প্রতিফলন থাকে।
সভায় উপস্থিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, সরকার নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, আগামী বাজেটে যাতে তার প্রতিফলন থাকে, সে অনুসারে বাজেট প্রণয়নের কাজ এগিয়ে নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
বিএনপি অর্থনৈতিক খাতে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়ানো, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার।
এ ছাড়া স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশের বেশি করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দলটি। এসব খাতে জিডিপির বিবেচনায় ব্যয় বাড়াতে গেলে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে।
আগামী জুনে প্রথম বাজেট দিতে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। সেই হিসেবে নতুন সরকারের জন্য বাজেটের আগে সময় আছে তিন থেকে সাড়ে তিন মাস। কর্মকর্তারা বলছেন, এক অর্থবছরেই যে সরকারের সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে, তা নয়। তবে অর্থমন্ত্রী চান, বাজেটের মাধ্যমে সরকারের নীতিগত দিকনির্দেশনা ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সদিচ্ছার সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া হোক।
এদিকে এক বছরেই জিডিপিতে রাজস্বের অবদান বা কর-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশে উন্নীত করার যে লক্ষ্যমাত্রা নতুন অর্থমন্ত্রী নিয়েছেন, তাকে উচ্চাকাক্সক্ষী মনে করছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা।
এনবিআরের তথ্যানুসারে, সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। গত দুই দশকে রাজস্ব আদায়ে প্রতি বছর গড়ে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এত প্রবৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও কর-জিডিপি অনুপাত না বেড়ে উল্টো কমেছে বা স্থির থেকেছে। ফলে রাজস্ব কর্তৃপক্ষকে জিডিপির সঠিক হিসাব করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
চলতি বছরের বাজেট কেমন ছিল
গত বছরের ২ জুন বাংলাদেশ টেলিভিশনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেন বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। এ বাজেটের মোট ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এটি জিডিপির ১২ দশমিক ৭ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় টাকার অঙ্কে বাজেটের আকার কমছে ৭ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। অবশ্য সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। মূল বাজেটে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে ২ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়।
প্রস্তাবিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। এটি জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। এটি ছিল জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
সময়ের আলো/আরবিএন