চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট ডলার কেনার পরিমাণ পাঁচ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। সর্বশেষ বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীল অবস্থা ধরে রাখতে ৮টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে আরও ১২ কোটির বেশি মার্কিন ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতি ডলারের কাট-অব দর ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা।
খাত সংশ্লিষ্টতা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে প্রবাসী আয় বেড়েছে, ফলে ব্যাংকগুলোতে ডলারের উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হয়েছে। সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় ডলারের মূল্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান-চাহিদার ভারসাম্য ঠিক রাখতে এবং মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা আনতে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের বাজারভিত্তিক হস্তক্ষেপ একদিকে বিনিময় হারে অস্থিরতা কমায়, অন্যদিকে রিজার্ভ শক্তিশালী করতেও ভূমিকা রাখে। ফলে সামগ্রিকভাবে বৈদেশিক খাতের স্থিতি ও আস্থার পরিবেশ জোরদার হয়।
রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) ৮ ব্যাংক থেকে ১২ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মাল্টিপল প্রাইস অকশন (এমপিএ) পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত এ ক্রয়ে ডলারের এক্সচেঞ্জ রেট ও কাট-অব রেট উভয়ই ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা।
সব মিলিয়ে চলতি ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার এবং চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) এখন পর্যন্ত বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৫৩৮ কোটি মার্কিন ডলার (৫.৩৮ বিলিয়ন ডলার) কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
জানা যায়, ২০২২ সালে দেশের ডলার বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। তখন প্রতি ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছায়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা পদক্ষেপ নিলেও ডলার বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। এক পর্যায়ে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি শুরু করতে হয়। এরপরও বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, গত তিন অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করে। এর মধ্যে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়। অথচ এ সময়ে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কেনা হয়েছে মাত্র ১ বিলিয়ন ডলারের মতো। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অর্থ পাচার বন্ধে বর্তমান সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেয়। এতে রফতানি ও প্রবাসী আয়-উভয়ই বেড়েছে। ফলে ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। সরবরাহ বাড়লেও সে অনুযায়ী চাহিদা না থাকায় স্বাভাবিকভাবে ডলারের দাম কমে যাওয়ার কথা। তবে ডলার বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশে ব্যাংক নিজ উদ্যোগে বাজার থেকে ডলার কিনছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, বাজারে ডলারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি। এমন অবস্থায় ডলারের দাম যেন অস্বাভাবিকভাবে কমে না যায়, সেজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনে বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখছে। ডলারের দর কমে গেলে প্রবাসী আয় ও রফতানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ডলার কেনার ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে বলে জানান তিনি।
এ দিকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রবাসীরা দেশে ৩১৭ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। রেমিট্যান্স বৃদ্ধি ও ডলার ক্রয়ের ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি শেষে মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। আর বিপিএম-৬ অনুযায়ী তা রয়েছে ৩০ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। দেশের ইতিহাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছিল ২০২১ সালের আগস্টে। সেখান থেকে ধারাবাহিকভাবে কমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সময় রিজার্ভ নেমে আসে ২০ বিলিয়ন ডলারে।
সময়ের আলো/আরবিএন