দেশের ৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ শ্রমিক সবুজ জ্বালানি সম্পর্কে পরিচিত নন এবং মাত্র ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ শ্রমিক এ সম্পর্কে জানেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলসের জরিপ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
ক্লাইমেট লিমিটেডের সহযোগিতায় সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর একটি স্থানীয় হোটেল এশিয়ায় ‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও চাতাল শিল্পে জলবায়ু পরিবর্তন এবং সবুজ ও ন্যায্য পরিবর্তনের বাস্তব অবস্থা এবং এর সাথে সম্পর্কিত প্রভাবসমূহ বিশ্লেষণ’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশের চাতাল মিলগুলোতে সবুজ জ্বালানির কোনো ব্যবহার নেই। অটো রাইস মিলের মালিক পক্ষও এ বিষয়টি স্বীকার করেছে। অন্যদিকে তৈরি পোশাক খাতের উত্তরদাতারা উল্লেখ করেন যে, কিছু সবুজ কারখানা সীমিত পরিসরে সৌরশক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। ন্যায্য রূপান্তর সম্পর্কে এ খাতের ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ শ্রমিক সম্পূর্ণ অপরিচিত এবং মাত্র ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ শ্রমিক এ সম্পর্কে জানেন।
ন্যায্য রূপান্তর শব্দটি তুলনামূলকভাবে নতুন। এ ছাড়া ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীরাও এ বিষয়ে যথাযথভাবে অবগত নন এবং শ্রমিকরা প্রায় সম্পূর্ণভাবে এই ধারণা সম্পর্কে অজ্ঞ। জলবায়ু/পরিবেশ অধিকার সুরক্ষায় ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের দক্ষতা ও সক্ষমতা সম্পর্কে জানেন না, ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ মনে করেন ট্রেড ইউনিয়নের ভালো সক্ষমতা রয়েছে এবং প্রায় ১০ শতাংশ মনে করেন ট্রেড ইউনিয়নের সক্ষমতা দুর্বল।
ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেন যে, চাতাল শিল্পে কার্যকর কোনো ট্রেড ইউনিয়ন নেই।
সভায় দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, শ্রমিক নেতা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা তৈরি পোশাক ও চাতাল শিল্পের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেন। সভায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি, কর্মসংস্থান হারানো এবং প্রযুক্তির বিবর্তনে ন্যায্য রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পায়।
বিলস উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য মেসবাহউদ্দীন আহমেদের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সভার আলোচনায় অংশ নেন বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ, তারা ক্লাইমেট ফাউন্ডেশনের পরিচালক ড. শওকত আরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ড. এম আবু ইউসুফ, আইএলওর জাস্ট ট্রানজিশন বিষয়ক টেকনিক্যাল অফিসার এলিসা বেনিস্টান্ত ফ্রেমিগাচি, সলিডারিটি সেন্টারের কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর একেএম নাসিম, সিপিডির রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট মো. তাকরিম হোসাইন, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের আইন কর্মকর্তা মো. মাসুম বিল্লাহ, আইবিসি সভাপতি কুতুব উদ্দিন আহমেদ, স্কপের যুগ্ম সমন্বয়কারী আহসান হাবীব বুলবুল, বাংলাদেশ অ্যামপ্লয়ার্স ফেডারেশনের মাহবুবুর রহমান, বিলস নির্বাহী পরিষদের সম্পাদক সাকিল আখতার চৌধুরী, পরিচালক কোহিনুর মাহমুদ প্রমুখ।
গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিলস উপপরিচালক (গবেষণা) মো. মনিরুল ইসলাম।
গ্রিন ফ্যাক্টরি ও শ্রমিক অধিকারের দ্বন্দ্ব নিয়ে ড. এম আবু ইউসুফ উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশে বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক ‘লিড সার্টিফাইড’ গ্রিন ফ্যাক্টরি রয়েছে। তবে এই সবুজ রূপান্তর শ্রমিকদের জন্য কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক এ বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা এবং সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
চাতাল শিল্পের বিলুপ্তি ও অটোমেশনের প্রভাব নিয়ে একেএম নাসিম ও মাসুম বিল্লাহ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে, সনাতনী চাতাল শিল্প এখন আধুনিক অটো রাইস মিলের দাপটে মৃতপ্রায়। ৯৫ শতাংশ চাতাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে রিকশা চালানো বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিযুক্ত হচ্ছেন। তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও কারিগরি প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়।
আইএলওর পক্ষ থেকে এলিসা বেনিস্টান্ত ফ্রেমিগাচি জানান, বাংলাদেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একটি ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ তৈরি করছে।
তিনি বলেন, রূপান্তর যেন শুধু সবুজে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা যেন সবার জন্য ন্যায্য বা জাস্ট ট্রানজিশন হয়, যেখানে শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত থাকবে।
নারী শ্রমিকদের দ্বিগুণ ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে টিইউসি নেত্রী সাহিদা পারভীন শিখা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নারী শ্রমিকদের ওপর সবচেয়ে বেশি। পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকি ছাড়াও কর্মক্ষেত্রে ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে নারীরাই প্রথম শিকার হন। তাদের জন্য বিশেষ সুরক্ষানীতি প্রয়োজন।
বাংলাদেশ অ্যামপ্লয়ার্স ফেডারেশনের মাহবুবুর রহমান বলেন, শিল্পের স্থায়িত্বের জন্য শ্রমিক ও মালিকের সুসম্পর্ক প্রয়োজন। জি-স্কপ নেতা কাজী রুহুল আমিন অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত গ্রিন ফ্যাক্টরিগুলোতেও শ্রমিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণ হয় না। বিশেষ করে যাতায়াত ব্যবস্থার দুরাবস্থার কারণে শ্রমিকরা নিয়মিত হাজিরা বোনাস হারান, যা তাদের আর্থিক সংকটে ফেলে।
সিনিয়র ট্রেড ইউনিয়ন নেতা আব্দুল কাদের হাওলাদার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশ, মানুষ, শ্রমিক এবং কৃষকদের কী অবস্থা হতে পারে তা নিয়ে আমরা সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছি। এই গবেষণাটি আমাদের কাছে একটি দলিল হিসেবে থাকবে। আমরা ট্রেড ইউনিয়নগুলো একসঙ্গে মিলে এই সমস্যাগুলো মোকাবিলায় কাজ করতে চাই।
সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ সমাপনী বক্তব্যে বলেন, সরকার ২০৫০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। এই বড় পরিবর্তনে শ্রমিকরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে।
সেমিনারে বক্তারা একমত হন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সংকট কেবল পরিবেশগত নয়, এটি একটি বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। সরকার, মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনের ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমেই একটি ‘ন্যায্য রূপান্তর’ সম্ভব।
সময়ের আলো/আরবিএন