রমজানের রাত। সিলেট নগরজুড়ে নীরবতা নেমে এলে হঠাৎ হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণ থেকে ভেসে আসে গম্ভীর এক ধ্বনি। ভারী, গভীর, ধাতব প্রতিধ্বনির মতো সেই শব্দ সিলেটবাসীর কাছে পরিচিত ‘ডমকা’ নামে। এটি শুধু একটি বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ নয়, বরং সাত শতাব্দী ধরে বহমান এক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।
ডমকা মূলত বড় আকারের একটি নকড়া বা নাকাড়া। তামা বা পিতলের তৈরি বিশাল পাত্রের ওপর শক্ত চামড়া টানিয়ে বানানো হয় এটি। বিশেষ কাঠের মুগুর দিয়ে আঘাত করলে সৃষ্টি হয় গভীর গম্ভীর শব্দ, যা দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
ইতিহাস বলছে, হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর আগমনের পর থেকেই মাজারকেন্দ্রিক নানা আচার-অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় সময় জানানোর মাধ্যম হিসেবে চালু হয় ডমকা বাজানোর প্রথা। তখন না ছিল ঘড়ি, না ছিল মাইক। মানুষের নির্ভরতা ছিল শ্রুতিসংকেতের ওপর।
আর রমজান মাসে ডমকার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। সেহরির আগে গভীর রাতে এক দফা বাজানো হয়, যাতে মানুষ ঘুম থেকে জেগে প্রস্তুতি নিতে পারেন। সেহরির শেষ মুহূর্তে আরেকবার বাজিয়ে শেষ সময়ের সংকেত দেওয়া হয়।
রমজান ছাড়াও দুই ঈদ এবং বার্ষিক ওরস শরীফে এই ডমকা বাজানো হয়। ফলে এটি কেবল রোজার মাসের ঐতিহ্য নয়, বরং মাজারকেন্দ্রিক সামগ্রিক ধর্মীয় জীবনের অংশ।
একসময় ডমকার শব্দ দালানবিহীন পুরো শহর অতিক্রম করে আশপাশের গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছাত। এখন মোবাইল ফোন, ডিজিটাল ঘড়ি ও মসজিদের লাউডস্পিকার সময় জানিয়ে দেয় মুহূর্তেই। তবু ডমকা বন্ধ হয়নি।
মাজারের খাদেম সামুন মাহমুদ খান জানান, এটি কেবল সময় জানানোর বিষয় নয়। এটি আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করে। বহু মানুষ রমজানের শুরু থেকেই ডমকার শব্দ শুনে আলাদা এক অনুভূতি পান, যা তাদের কাছে ঐতিহ্যের স্মারক।
ডমকার ধ্বনি সিলেটবাসীর কাছে নস্টালজিয়ারও অংশ। বয়োজ্যেষ্ঠরা বলেন, শৈশবে তারা ডমকার শব্দে সেহরির জন্য জেগে উঠতেন। তখন শহরে এত আলো ছিল না, প্রযুক্তির ছোঁয়াও ছিল সীমিত। সেই সময়ের স্মৃতি এখনও জড়িয়ে আছে এই গম্ভীর আওয়াজে।
আজও রমজানের রাতে মাজার প্রাঙ্গণে দাঁড়ালে ডমকার প্রতিটি আঘাতে যেন ইতিহাসের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। এটি মনে করিয়ে দেয়, সময় বদলায়, মাধ্যম বদলায়, কিন্তু ঐতিহ্য যদি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়, তবে তা হারায় না।
সিলেট তার আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের জন্য সুপরিচিত। ডমকার এই প্রথা সেই পরিচয়েরই অংশ। রমজানের পবিত্র মাসে তাই ডমকার ধ্বনি শুধু সেহরি বা ইফতারের সংকেত নয়। এটি সিলেটের ইতিহাস, বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক চেতনার ‘জীবন্ত প্রতীক’।
এফআর